kalerkantho


মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হবে

মাহফুজুর রহমান

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হবে

‘অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সুন্দরী টিন এজার পাত্রীর জন্য সৎ, সুশ্রী, সুঠাম দেহের অধিকারী পাত্র চাই। নির্বাচিত পাত্রকে অবিলম্বে অস্ট্রেলিয়া চলে যেতে আগ্রহী হতে হবে।

পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে লাফিয়ে উঠল মফিজ (কাল্পনিক নাম)। বিজ্ঞাপনদাতার ফোন নম্বরে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল। জীবনবৃত্তান্ত ও রঙিন ছবি পাঠানো হলো বাংলাদেশে সংক্ষিপ্ত সফরে আসা পাত্রীর বাবার ঠিকানায়। তিন দিন পরই রাত সাড়ে ৯টায় টেলিফোন এলো। পাত্র পছন্দ হয়েছে। মফিজের সঙ্গে পাত্রী নিজেও কথা বলল। এবার অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার পালা। মফিজের মন লাফিয়ে উঠল। এবার সে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হবে।

পাত্রীর বাবা জানতে চাইলেন, পাসপোর্ট আছে কি না? মফিজের তো পাসপোর্ট নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট করার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পাঠানো হলো মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে। পাঁচ দিনের মাথায় পাসপোর্ট হয়ে গেল। এবার ভিসার জন্য সাড়ে ১১ হাজার। এই টাকা পাঠানোর পর পাত্রীর বাবার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এভাবে অনেকেই ঠকেছেন। পুলিশ পাত্রীর বাবাকে খুঁজে বের করেছে। অনেককেই ঠকিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, পাত্রীর বাবারূপী লোকটি আসলে পাত্রীর স্বামী। এদের কারোরই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে এলেও কিছু অপরাধীর অপতত্পরতায় এটি ঝুঁকি বয়ে এনেছে। গল্প মফিজের সঙ্গে নিজের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ায়ই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতারণা ও সন্ত্রাসী কাজ বহুভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গাড়ি চুরি করে, কাউকে অপহরণ করে মোবাইল ফোনে চাঁদা চাওয়ার কথা অনেকেই শুনেছেন। গাড়ি উদ্ধারের জন্য অনেকেই টাকা দিয়েও গাড়ি ফেরত পাননি। ভুয়া লটারিতে স্বর্ণালংকার, প্লট, ফ্ল্যাট, টেলিভিশন ইত্যাদি পাওয়ার কথা বলে রেজিস্ট্রেশন ফি সংগ্রহ করার খবরও গ্রাম বাংলায় পরিচিত হয়ে গেছে। কারণ অনেকেই লটারির এসব পুরস্কার পাওয়ার আশায় মোবাইলে টাকা পাঠিয়েছেন। পরে যখন বুঝতে পেরেছেন যে পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়টি একেবারেই ভুয়া, তখন নিজের বোকামির কথা আর কাউকে বলেননি। ফলে আশপাশের অনেকেই আবার প্রতারিত হয়েছেন। স্বপ্নে দেখা জিনের বাদশাহর রেখে যাওয়া গুপ্তধনপ্রাপ্তির ব্যবস্থার জন্য সাতঘাটের পানি, সাত শ্মশানের মাটি আর সাত খনির স্বর্ণের গুঁড়া জোগাড় করার জন্য ১২ হাজার ৭৪৬ টাকা অগ্রিম চাইলে অনেকেই দৌড়ে গিয়েছেন এজেন্টের কাছে টাকা পাঠানোর জন্য। মনে মনে ভেবেছেন, জিনের বাদশাহ বলে কথা! তার লুকিয়ে রেখে যাওয়া টাকা উদ্ধার করা গেলে চৌদ্দগুষ্টির আর কোনো ভাবনা থাকবে না। কিন্তু জিনের বাদশাহর সম্পদ টাকা প্রেরকের ঘরে না এসে জমা হয়েছে প্রতারকের ঘরে, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে।

আবার হঠাৎ করেই কারো ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে গম্ভীর কণ্ঠে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম বলে নিজের পরিচয় দিয়ে কেউ একজন বলছে যে তাদের গ্রুপের ছেলেরা পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছে; এখন চিকিৎসার জন্য কয়েক লাখ টাকা দরকার। এই টাকা, ফোন যিনি রিসিভ করেছেন তাকেই দিতে হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে নানা রকম ব্যবস্থা নেবে এই সন্ত্রাসী দল। তাদের দেওয়া হুমকিগুলো সাধারণত খুব মারাত্মক হয়। কারণ এরা ফোন করার আগে ফোনগ্রাহক এবং তার ছেলে-মেয়েদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়। আগে বেশির ভাগ টাকা হাতে নগদে লেনদেন হতো। এসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা প্রায়ই আড়ি পেতে থাকেন এবং সন্ত্রাসীদের প্রতিনিধিদের ধরে ফেলেন। পরে অবশ্য দেখা যায়, এরা পাড়ার নাপিতের ছেলে অথবা দুধওয়ালার নাতি। কিন্তু মানুষ ভয় পেয়ে টাকা দেয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অনেক সময় ভয়ে জানাতে চায় না। আজকাল অবশ্য নগদ লেনদেনের চেয়ে মোবাইলে টাকা পেতেই হুমকিদাতারা পছন্দ করে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি এলাকায় কর্মরত ছেলেকে নামমাত্র টাকায় সীমান্ত পার করে ইউরোপের সোনার দেশে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই সব দেশের পাহাড়ে নিয়ে আটকে রেখে মোবাইলে টাকা চাওয়ার কাহিনিও শোনা গেছে। সেলিব্রিটিদের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলে মোবাইলে টাকা নেওয়ার কাহিনিও শোনা গেছে এ দেশে।

এসব তো গেল সন্ত্রাসী ধরনের অপকর্ম। এ ছাড়া সাম্প্রতিক ডিজিটাল হুন্ডি নামক উন্নয়নমুখী অর্থনীতিকে খুবলে খাওয়া রাক্ষসের নামও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস বলে শোনা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যখন দেশে টাকা পাঠাতে চান তখন ডিজিটাল হুন্ডির প্রতিনিধিরা সেখানে হাজির হয়। কেউ কেউ আবার ছোট ছোট দোকান খুলে বা অন্য দোকানের ছায়ায় বসে রীতিমতো সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে। বিদেশের এসব দালালের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রদান করার পর এরা তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিকে নির্ধারিত নম্বরে টাকা পাঠাতে বলে দেয়। আর তখন বাংলাদেশে বসে থাকা প্রতিনিধি নির্ধারিত মোবাইল নম্বরটিতে টাকা পাঠিয়ে দেয়। এই পদ্ধতিতে টাকা পাঠালে বৈদেশিক মুদ্রা কখনোই বাংলাদেশে আসে না। বাংলাদেশি নাগরিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যায়। এই অর্থের বিনিময়েই অনেক সময় দেশে মাদকদ্রব্য বা অস্ত্র প্রবেশ করতে পারে। দুই বছর থেকে বাংলাদেশে অন্তর্মুখী বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ অনেকটাই কমে গেছে। এই কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অনেকেই ডিজিটাল হুন্ডিকে দায়ী করছেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশেই বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সিস্টেমে টাকা পাঠানো যায় বলে ঘোষণা করে ব্যবসা চালাচ্ছে। মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পরিচালিত এসব অপতত্পরতা অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে যেসব ব্যাংক বা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কম্পানি মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস প্রদান করে থাকে, তাদের আরো অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিক তত্পর হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক গড় লেনদেন এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই লেনদেনের পরিমাণ দিনে দিনে আরো বাড়ছে। এ অবস্থায় অন্য একটি বিভাগের পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় না রেখে এর জন্য পৃথক বিভাগ স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে কর্মকর্তা কাজটি নিয়ন্ত্রণের প্রতি অধিক মনোযোগী হতে পারেন। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব অপতত্পরতা রোধকল্পে প্রতিরোধ ও নজরদারি জোরদার করতে হবে। হিসাব খোলার সময় গ্রাহকের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি দুই পরতে নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট করার সময় গ্রাহককে ব্যক্তিগতভাবে এজেন্টের সামনে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আবার এজেন্টের মনিটরে টেলিফোন নম্বর লেখার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের ছবি দেখা যাওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, এজেন্ট তার নিজের বা আত্মীয়স্বজনের নামে হিসাব খুলে হিসাববিহীন গ্রাহকদের লেনদেনের জন্য সেগুলো ব্যবহার করে থাকেন। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই কাজটি যাতে এজেন্টরা না করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এজেন্টদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান ও ঘন ঘন তাদের ব্যবসাকেন্দ্রে পরিচালিত কাজ পরিদর্শন করতে হবে।

ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকার, বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো এবং সেবাদাতা সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব দেশ থেকে অন্তর্মুখী বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাচ্ছে সেসব দেশের সরকার বা ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানাতে হবে। ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)-এর ৪০ সুপারিশমালার (যা সব দেশ মানতে বাধ্য) ৩০ নম্বর হচ্ছে অল্টারনেটিভ রেমিট্যান্স সিস্টেম বা হুন্ডি বন্ধ করা। আবার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো গ্রাহক বা এজেন্টের লেনদেনের ধরন গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করলে সেটি বিদেশি রেমিট্যান্স কি না তা সহজেই ধরতে পারবে। একজন গ্রাহক মাসিক ভিত্তিতে একজন এজেন্টের কাছ থেকে কেন টাকা পাচ্ছেন বা একজন এজেন্টই বা কেন মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন, এগুলো লক্ষ করে নমুনা হিসেবে খোঁজ নিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কিছুদিন আগে দেশে রাজনৈতিক উত্তাল অবস্থা বিরাজ করার সময় দুষ্কৃতকারীরা মোবাইলে টাকা পেয়ে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করত বলে জানা যায়। সে অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে যখন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারী ধরা পড়লে তার কাছে কে বা কারা টাকা পাঠিয়েছে তাদের পূর্ণ পরিচিতি না জানাতে পারলে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হবে, তখন এ বিষয়ে আর কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এর মানে হলো, আন্তরিক ও কার্যকরভাবে তত্ত্বাবধান করা হলে যেকোনো বিষয়ই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই দেশের অর্থনীতি এবং মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের অতি প্রয়োজনীয় সেবাকে বহাল ও জনপ্রিয় রাখার স্বার্থে ওই অপতত্পরতা জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে।

 

লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক


মন্তব্য