kalerkantho


স্মৃতিতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট

ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতিতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট

দিনটি ছিল শুক্রবার। ১৫ আগস্ট।

খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে দেখলাম কাকার বিষণ্ন মুখ, প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বিমর্ষ, তিনি কাঁদছেন আর রেডিওর সংবাদ শুনছেন। রেডিওতে ততক্ষণে মেজর ডালিমের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে : ‘আমি মেজর ডালিম বলছি—শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে!’ বলে কী? এ-ও হতে পারে? পাকিস্তানি জালেমরা অনেক ষড়যন্ত্র করে, বিচারের নামে প্রহসন করে যাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতে চেয়ে সফল হতে পারেনি, তাঁরই স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে—এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আমাদের স্বাধীনতার বিজয়ের মূলে আঘাত করা হয়েছিল। একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে এ মৃত্যুকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। মানসিকভাবে আরেকটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলাম। কোথাও কোথাও বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ হলেও তা আর বেশি দূর যেতে পারেনি। শেষ ভরসা ছিল সাভার রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প। কিন্তু বিদ্রোহীদের অনুগতরা সাভার ক্যান্টনমেন্ট থেকে গিয়ে রক্ষী বাহিনীর সেনাদের অবরোধ করে ফেলেছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে কেউ মেরে ফেলতে পারে, সেটা যেমন ছিল ভাবনার বাইরে, তেমনি তাঁকে হত্যা করলে কী করণীয় সেটাও যেন কারো ভাবনার মধ্যেই নেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মাত্র তিন-চার দিন পর দেখেছি সর্বত্র নামকরা রাজাকারদের উত্থান, দেখেছি তাদের আক্রমণে কী করে নির্যাতিত হয়েছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেরা। মনে আছে এখনো, হোমনা থানার আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ ইউনিয়নের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ও নিলখী ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান রুক্কু মিয়াকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা  শুধু একটি এলাকার কথা তুলে ধরলাম, এভাবে সারা দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করার জন্য খুনিরা মেতে উঠেছিল।

১৫ আগস্টের সেই ভোর আমার বিবেককে দংশিত করেছিল। আমার যৌবনের দুঃসহ স্মৃতি আমার মনে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল তা-ই আমাকে ধাবিত করেছিল ক্রমান্বয়ে সত্যিকারের বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক হয়ে ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষক রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়তে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন। এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক মেজর জিয়া। সেদিন জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছিলেন তিন মাসের মধ্যে ব্যারাকে ফিরে যাবেন, কিন্তু এটি বাস্তবে হয়নি। তিনি হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন, যা ছিল একটি প্রহসনের নির্বাচন। ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ ও ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেন। এভাবেই মোশতাক-জিয়া-খালেদা গং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করার ষোলোকলা পূর্ণ করেন।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর নিম্ন আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় ঘোষণা করে ১৫ জন সাবেক সেনা সদস্যের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল উচ্চ আদালত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছরেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের আপিল শুনানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা আদালতে ওঠে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে সেই চূড়ান্ত বিচারের কাজটি শুরু হয়। বিচার শেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে আটক পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আর যাদের এখনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি তাদের দেশে ফেরত এনে অবিলম্বে রায় কার্যকর এই সরকারকেই করতে হবে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কেবল শেখ মুজিবের দেহকেই বুলেটবিদ্ধ করা হয়নি, আঘাত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করাই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশটিকেই ধ্বংস করে দেওয়া। তাই তো ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর চার জাতীয় নেতাকেও। ১৫ আগস্টের খুনিদের দোসররা আজও সক্রিয়। আজ ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ও তাঁর পুরো পরিবার এখনো সেই ১৫ আগস্টের দোসরদের কাছ থেকে নিয়মিত হত্যার হুমকি পাচ্ছে। শুধু একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলাই নয়, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কখনো নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায় আবার কখনো তাঁর গাড়ির বহরে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত ও জনগণের আশীর্বাদে এখনো তিনি বহাল তবিয়তে দেশ ও জনগণের সেবা করে চলেছেন।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন, তা থেকে এ দেশের মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতেই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড। সেই লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে জাতির জনককে যারা হত্যা করেছিল, আজকের এই দিনে জাতি তাদের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ করছে।

 

লেখক : উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য