kalerkantho


ফিজিয়াট্রি দিবস ও বাংলাদেশ

ডা. মো. তছলিম উদ্দিন

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ফিজিয়াট্রি দিবস ও বাংলাদেশ

‘রানার! রানার!

এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?

...দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি—

এ-কে যে ভোরের আকাশে পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি। ’

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ে ১২ বছর বয়সের শিশু অমিতের কথা।

দেশসেরা আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, দারুণ মেধাবী। কয়েক দিনের জ্বর আর হাত-পা ব্যথা দিয়ে শুরু, হঠাৎ চার হাত-পা অবশ ভাব নিয়ে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয় সে। দুরারোগ্য ওয়াইল্ড পোলিও রোগে আক্রান্ত ছিল সে। ক্রমান্বয়ে অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়; কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এভাবে প্রায় দুই বছর পার হয়। একদিন ক্লিনিক্যাল সেমিনারে তার কেস উপস্থাপন করা হয়। সেখানে একজন ফিজিয়াট্রিস্ট (ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ) ব্রিদিং পেসমেকার প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব করেন। এগিয়ে আসে সারা দেশের মানুষ এই ব্যয়বহুল চিকিৎসাকে সহনীয় করতে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে সব পর্যায়ের সাড়ায় সেদিন এক অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছিল।

রামনাথ অমল পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন সরকারি চাকরিজীবী।

হঠাৎ একদিন অফিসে কর্মরত অবস্থায় ডান হাত-পা দুর্বল হয়ে গেল; সঙ্গে সঙ্গে মুখও বাঁকা হয়। দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান। প্রারম্ভিক চিকিৎসা দেওয়ার পর একপর্যায়ে তাঁকে জানানো হলো; সুস্থ হতে তাঁর প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ ও নিয়মিত পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। অবসরের আগেই অসুস্থতাজনিত অবসরের আশঙ্কা পেয়ে বসে রামনাথ বাবুকে। হাসপাতালের বিছানায় বসে, সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভেবে তিনি ডিপ্রেশনে পড়ে যান। কিন্তু এর মধ্যেও ধৈর্য রেখে হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগে ফিজিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তিনি বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থ না হলেও অফিসের নিয়মিত কর্মসম্পাদন করতে পারেন।

রানা প্লাজায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ডান পা হারান গার্মেন্টশ্রমিক তালেয়া (৪৫)। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র নারীটি মুহূর্তেই হয়ে পড়েন পরিবারের বোঝা। কিছুদিন পরেই আত্মসম্মান বোধে উজ্জীবিত নারী তালেয়া, সমাধান খুঁজতে থাকেন পাগলের মতো। পরে সন্ধান পান ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের। বিশেষজ্ঞ ফিজিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে তাঁকে সমন্বিত রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসার মাধ্যমে কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়। কিন্তু এর বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর তাঁর বাঁ হাঁটু নতুন করে বাতরোগে আক্রান্ত হয়। তিনি হতাশ না হয়ে আবার যোগাযোগ করেন তাঁর পূর্বতন চিকিৎসকের সঙ্গে। এবার তাঁকে কয়েক দফায় পর্যবেক্ষণ করে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি আর পিআরপি ইনজেকশন; এসবের মাধ্যমে সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেই দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে তালেয়া এখন আত্মনির্ভর, আনন্দিত। ওপরের উল্লিখিত কয়টি ঘটনা ফিজিয়াট্রি বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসা কার্যক্রম। এমন হাজারো আশাহত মানুষকে আবার কর্মক্ষম করে তোলার কথা লেখা আছে ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের দেয়ালে দেয়ালে।

মেডিসিন ফ্যাকাল্টির একটি অন্যতম বিশেষজ্ঞ শাখা ‘ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ’, যা বিশ্বব্যাপী ‘ফিজিয়াট্রি’ নামেই অধিক পরিচিত। ফিজিয়াট্রিস্টরা প্রতিনিয়ত একটি টিমের মাধ্যমে সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রদান করে থাকেন। রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য ছয়টি মূলনীতি অনুসরণ করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয় : ১. প্রাথমিক আঘাত বা অসুস্থতার ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট জটিলতা প্রতিরোধ অথবা নিরাময় করা; ২. শরীরের সুস্থ বা অনাক্রান্ত অংশের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা; ৩. শরীরের অসুস্থ বা আক্রান্ত অংশের ক্ষমতা বাড়ানো; ৪. অভিযোজিত উপকরণ ব্যবহার করে কাজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা; ৫. পারিবারিক ও পেশাগত পরিবেশ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন এবং ৬. মানসিক উন্নতি সাধন। এ মূলনীতিগুলো মাথায় রেখেই চলে রোগীকে তার আগের অবস্থায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। ১৩ অক্টোবর বিশ্ব ফিজিয়াট্রি দিবস। এবারের মূল প্রতিপাদ্য হলো : ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন রোগীর কর্মক্ষমতা ফেরাতে কাজ করে।

নিম্নবর্ণিত কিছু কিছু রোগ যেমন স্নায়ুরোগ যথা স্ট্রোক, পেশির রোগ; স্পাইনাল কর্ড আঘাতজনিত হাত-পা অবশ, মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে হাত-পা অবশ হওয়া; অর্থপেডিক অপারেশনের পর জড়তা, ফ্র্যাকচার, খেলাধুলাজনিত আঘাত, নানা ধরনের বাত বা আর্থ্রাইটিস, কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, মেরুদণ্ডের রোগ এবং হাত-পা এম্পুটেশন; হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যথা হার্ট অ্যাটাক বা তার অপারেশনের পর পুনর্বাসন, অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ; বৃদ্ধকালের রোগ যথা অস্টিওপোরোসিস, অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন, প্রস্রাব বা পায়খানা ধরে রাখার অসুবিধা; শিশুকালের রোগ যথা সেরেব্রাল পালসি, পোলিও জাতীয় রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন হয়। রোগীর কর্মক্ষমতা যথাসম্ভব স্বাভাবিকে ফিরিয়ে এনে তাকে স্বাভাবিক জীবন যাপনে সহায়তা করাই হলো পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসার মূল লক্ষ্য।

মনে রাখতে হবে, রোগীর চিকিৎসা কোনো স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নয়, বরং একটি ব্যবস্থাপনা। ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন এই ব্যবস্থাপনার কাজটি সুচারুভাবে করে থাকে। বাংলাদেশে এ বিভাগে এফসিপিএস ও এমডি সম্পন্ন করা দেড় শতাধিক ‘ফিজিয়াট্রিস্ট’ সারা দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সেবায় নিয়োজিত আছেন।

লেখক : অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


মন্তব্য