kalerkantho


টিলারসনের মিয়ানমার সফর প্রসঙ্গে কিছু কথা

নেগিনপাও কিপগেন

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টিলারসনের মিয়ানমার সফর প্রসঙ্গে কিছু কথা

এশিয়ার ছয়টি দেশ সফরের অংশ হিসেবে ১৫ নভেম্বর (আজ) মিয়ানমারে পৌঁছবেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। দেশটির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি।

নিশ্চিতভাবেই তাঁদের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাদি নিয়ে আলোচনা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের পদ গ্রহণের ১০ মাস পর মিয়ানমারে যাচ্ছেন টিলারসন। আট বছর হোয়াইট হাউসে থাকার সময় বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করেন দুবার। মূলত সেই সময়ই যুক্তরাষ্ট্র-মিয়ানমার সম্পর্কের ধরন পাল্টায়।

সম্পর্ক নবায়নের প্রক্রিয়ার দিক থেকে দেখলে ১০ মাস বেশ দীর্ঘ সময়। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচিত রোহিঙ্গা ইস্যু। কিন্তু এ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত খুব একটা উচ্চকিত নয়।

নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা

টিলারসন এমন একসময় সফর করতে যাচ্ছেন যখন ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান নৃশংসতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিগত নিধন অভিযান ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা ঘাঁটির ওপর আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) হামলার পর সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু করেছে তাকে জাতিগত নিধন অভিযান বিবেচনা করে শীর্ষ কূটনীতিকের জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই এআরএসএর হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনীর নির্মূল অভিযানের বিষয়ে। তাদের দৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর এই অন্যায় অভিযানের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ছয় লাখের বেশি মুসলমান তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের আইনপ্রণেতারা মিয়ানমারের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব তুলেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘ ও প্রথম এশিয়া সফর শুরুর আগেই এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন তাঁরা। গত বছর ওবামা প্রশাসন মিয়ানমারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে বাণিজ্য, ভিসা ও মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের ওপর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপের প্রসঙ্গ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ রাখবে।

টিলারসনের সফর থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বিষয়টি হলো, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিগত নিধন অভিযান ঘোষণা করবে কি না। যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ মিয়ানমার সরকারকে দেবেন টিলারসন। একই সঙ্গে তিনি দেশে ফেরা রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর আহ্বান জানাবেন নেপিডো সরকারের প্রতি।

মিয়ানমারের গণতন্ত্রে ফেরা

টিলারসনের এই সফরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারের পূর্ণমাত্রায় গণতন্ত্রে ফেরা। তিনি মিয়ানমারের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের প্রতি গণতন্ত্র পুনর্বহালের প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার করার আহ্বান জানাবেন। দেশটির প্রশাসনিক কাজের নিয়ন্ত্রণ ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারের হাতে। পার্লামেন্টে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। এগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে।

নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান, যেমন স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদ সেনাবাহিনীর হাতে। পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসনও তাদের জন্য নির্ধারিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাখাইনে নিধন অভিযান চালানোর সময় পুরো বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। ওই অভিযান চালানোর সময় পাইকারি হারে হত্যা, গ্রামের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া ও ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সফরে মিয়ানমারের সামনে মুলা ঝোলানোর পাশাপাশি শাস্তির ভয়ও দেখাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি মিয়ানমার সরকারকে বলবেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে ও গণতন্ত্রে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তাঁর কথায় এ ইঙ্গিতও থাকবে যে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের বিবেচনা নাকচ করে দেওয়া হয়নি। নিষেধাজ্ঞা আবার আরোপ করা হলে তা ওয়াশিংটন আর নেপিডোর সম্পর্কে শুধু টানাপড়েনই সৃষ্টি করবে না, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যেও উত্তেজনা বাড়াবে।

 

উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গ

টিলারসনের আলোচনায় তৃতীয় বিষয় হিসেবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কসংক্রান্ত অভিযোগ উঠে আসতে পারে। তিনি হয়তো মিয়ানমারের কাছে, বিশেষ করে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের কাছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা চাইবেন। থেইন সেইন সরকার এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছিল যে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে তাদের কোনো সামরিক সম্পর্ক নেই। প্রসঙ্গত, থান শুয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের যোগাযোগ ছিল বলে মনে করা হয়। মিয়ানমারের কাছ থেকে সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া ওয়াশিংটন সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে।

টিলারসনের সফরের মূল বিষয় অবশ্য রোহিঙ্গা সংকট। এ বিষয়ে আলোচনায় ইতিবাচক বা নেতিবাচক—দুই ধরনের ফলই পাওয়া সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র-মিয়ানমার সম্পর্ক যেন অবনতির দিকে না যায় তা নিশ্চিত করতে স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত অং সান সু চি হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন। তাঁর এনএলডি সরকার কী ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছে তা-ও জানাবেন হয়তো। এখন দেখার বিষয় ট্রাম্প প্রশাসন সু চির কথা শোনে কি না। মার্কিন কংগ্রেসের প্রধান দুই দলের মধ্যেই সু চির সমর্থন এখনো কম নয়।

২০০৮ সালের সংবিধান মোতাবেক স্টেট কাউন্সেলরের সীমাবদ্ধতাও কম নয়। এ বিষয়টিও বুঝতে হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বিবেচনা করা হয়। দেশের সামরিক নেতৃত্ব ও সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের আঘাত করে সু চি কোনো ব্যবস্থা নেবেন এমন সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

আরেকটি বিষয় বুঝতে হবে, অং সান সু চি আজ আর গণতন্ত্রের প্রতীক বা রাজনৈতিক কর্মী নন, যা তিনি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সময় বা গৃহবন্দি থাকার সময়। তিনি এখন সরকার পরিচালনাকারী রাজনীতিক। তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান, ভবিষ্যৎ দেখতে চান।

 লেখক : ভারতের ও পি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের

সহযোগী অধ্যাপক

সূত্র : এশিয়া-প্যাসিফিক

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ


মন্তব্য