kalerkantho


সিডর-আইলায় জৈবঢাল ছিল সুন্দরবন

বিধান চন্দ্র দাস

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সিডর-আইলায় জৈবঢাল ছিল সুন্দরবন

এক দশক আগে ১৫ নভেম্বর ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৬০ কিমি বেগে বয়ে যাওয়া সেই সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ।

আহত হয়েছিল অর্ধ লাখেরও বেশি। দেশের সর্বমোট ৩০টি সিডর আক্রান্ত জেলার মধ্যে সেদিন নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চারটি জেলা। স্মরণকালের অন্যতম সেই ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়েছিল গণনাতীত বন্য ও গৃহপালিত পশুপাখি এবং গাছপালা। সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক বিনষ্ট সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ঘরবাড়ি সে সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল অসংখ্য রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেতু, পুকুর ও মাছের ঘের। বিনষ্ট হয়েছিল ১০ লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল।

সেই ক্ষতির রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দেড় বছরের মাথায় ২৫ মে ২০০৯ সালে বাংলাদেশে আবার ‘আইলা’ নামে আঘাত হানে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। সিডরের তুলনায় আইলায় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল কম। তবু অপেক্ষাকৃত সেই কম গতিবেগ, ঘণ্টায় ১২০ কিমি বেগে বয়ে যাওয়া ওই ঘূর্ণিঝড়ে দেশের ১১টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

মৃত্যুবরণ করেছিল প্রায় ২০০ মানুষ। মারা গিয়েছিল লক্ষাধিক গবাদি পশু। প্রায় ৭৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়াসহ আড়াই লাখ হেক্টর জমির ফসল হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত। সেই সঙ্গে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছিল আড়াই লাখ বাড়িঘর। মোট ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ছিল প্রায় পৌনে তিন লাখ।

বলা হয়ে থাকে যে উপকূলীয় অঞ্চলে পূর্ণ জোয়ারের সময় বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিডরের তুলনায় আইলায় জলোচ্ছ্বাসজনিত ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। সন্দেহ নেই যে সিডর-আইলা তাদের সর্বাত্মক ধ্বংসক্ষমতা ব্যবহার করতে পারলে এই দুটি ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের জীবন ও সম্পদহানির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে সুন্দরবন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে এই দুটি ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ও তার ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বাধা পেয়েছিল। সুন্দরবন জৈবঢাল হয়ে সিডর-আইলার প্রচণ্ড আঘাতের অনেকটাই আটকে দিয়েছিল।

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের প্রান্তে অনেকটা চোঙ আকৃতির উপকূলভাগ থাকার কারণে তীব্র ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এখানে অভিশাপের মতো প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। তবে সুন্দরবন এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে কাজ করে। সত্যি কথা বলতে কী, সুন্দরবন তার সৃষ্টির পর থেকেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় জৈবঢাল হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের জানা ইতিহাসের মধ্যে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে আছড়ে পড়া ছোট-বড় প্রায় ২৫৯টি ঘূর্ণিঝড়ের আক্রমণ সুন্দরবন জৈবঢাল হিসেবে অনেকটাই আটকে দিয়েছে।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, একসময় প্রাচীন ভারতবর্ষে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে সুন্দরবন ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত থেকে যে ধরনের শক্ত ও মজবুত জৈবঢাল হয়ে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত, আজ তার সেই শক্তির অনেকটাই কমে গেছে। ত্রয়োদশ শতকে সুলতানি আমলে সুন্দরবন ধ্বংস করে কৃষিকাজ শুরু করায় তখন থেকেই এর আয়তন দ্রুত কমতে শুরু করে। ১৭৯৩ সালে সুন্দরবনের আয়তন হয় ১৪ হাজার ৬২৭ বর্গকিলোমিটার। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ ভারতে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করার পর সুন্দরবন ধ্বংস করে কৃষিজমি বের করার প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পায়। তবে একেবারেই তা বন্ধ হয় না। জনসংখ্যার চাপে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে সুন্দরবনের আয়তন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় সুন্দরবনের মোট আয়তন ছিল ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি। এর মধ্য থেকে ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার পূর্ব পাকিস্তান অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা আজ বাংলাদেশ সুন্দরবন নামে পরিচিত। বাকি অংশ চার হাজার ২৩৯ বর্গকিলোমিটার ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

সময়ের ব্যবধানে হ্রাসকৃত আয়তনের সুন্দরবনে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ বিশেষ করে সুন্দরী, কেওড়া, ওড়া, বাইন, কাঁকড়া, গরান, গেওয়া, হরগোজা প্রভৃতি গাছের ঘনত্ব ও উচ্চতাও হ্রাস পেতে শুরু করে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপজনিত বনজ সম্পদ আহরণ ও ক্ষতিকর দূরত্বের মধ্যে গড়ে ওঠা শিল্প-কলকারখানা ও বনের মধ্যে চলাচলকারী ইঞ্জিনচালিত নৌযান সৃষ্ট দূষণপ্রক্রিয়া এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে জৈবঢাল হিসেবে সুন্দরবনের শক্তি বর্তমানে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

তবুও এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের যেটুকু টিকে আছে, তা যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায় তাহলে সেটুকু দিয়েই বাংলাদেশের উপকূলভাগে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস অনেকটাই মোকাবেলা করা সম্ভব। এর সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর ধার দিয়ে গাছের ঘন বেষ্টনী তৈরি করা এবং নদী বরাবর বেড়িবাঁধগুলোর যেখানে-সেখানে কেটে মাছ চাষের জন্য স্লুইস গেট নির্মাণ বন্ধ করতে পারলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসজনিত ক্ষতির পরিমাণ আরো হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য