kalerkantho


সু চির নাকের ডগায় গণহত্যা

পিটার অসবর্ন

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সু চির নাকের ডগায় গণহত্যা

গণহত্যা এমন একটি শব্দ, যা সব সময় সতর্কতার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া উচিত। এলোপাতাড়ি নৃশংসতা ভয়াবহ বিষয়, তবে নিশ্চিতভাবেই তা গণহত্যা নয়।

গণহত্যা সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ‘একটি জাতি বা জাতিগোষ্ঠী, বর্ণ বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই গণহত্যা চালানো হয়। ’ এ কারণেই সত্তরের দশকে কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক পলপট ইচ্ছাকৃতভাবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে। স্রেব্রেনিচায় ১৯৯৫ সালে সুশৃঙ্খলভাবে হত্যা করা হয় সাত হাজার বসনীয় মুসলমানকে। তিন বছর আগে একই রকম নিষ্ঠুরতায় ইসলামিক স্টেট ইরাকে হাজারো ইয়াজিদিকে হত্যা করে। হলোকাস্টের ক্ষেত্রেও অবশ্যই একই অভিধা প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নািসরা ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করে। আজ মিয়ানমার আর বাংলাদেশের রক্তাক্ত সীমান্তে বিশ্ব আবারও গণহত্যা প্রত্যক্ষ করছে। লজ্জাজনকভাবে অক্সফোর্ড শিক্ষিত এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির তত্ত্বাবধানে এই গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে।

সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হলো, এই গণহত্যা থামাতে বিশ্বনেতারা কিছুই করছেন না।

মিয়ানমারের বৌদ্ধ সেনাবাহিনী দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম জনগণের ওপর যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তা থেকে বেঁচে আসা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমি গত কয়েক দিনে কথা বলেছি। গত ১০ সপ্তাহে ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মুসলমান সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে চলে আসে। প্রতিদিন হাজারো রোহিঙ্গা আসছে। এই যন্ত্রণায় দীর্ণ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে, কী করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ, গণকবরের বয়ান দিচ্ছে তারা। সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যোগসাজশের কথাও শোনা যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা নিধন চলছে দুই দশক থেকেই। সর্বশেষ গণহত্যা শুরু হয়েছে ২৫ আগস্ট থেকে। ওই দিন রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবিদার সন্ত্রাসীরা মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালায়। ওই হামলা হয়েছে সত্যি, তবে খুব সহজেই হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই প্রতিরোধহীন হাজারো রোহিঙ্গা গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণ হতে পারে না।

সাংবাদিক হিসেবে আমি দারফুরের প্রতিবেদন তৈরি করেছি। পশ্চিম সুদানের ২০০৩ সালের যুদ্ধের সময় সরকার আরবদের স্বার্থ রক্ষায় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে অভিযোগ তুলে বিদ্রোহীরা নারী-পুরুষ-শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে। তবে মিয়ানমারে যে নিয়মতান্ত্রিক ও বিস্তৃত হত্যাকাণ্ড চলছে, তার সঙ্গে এর কোনোটারই তুলনা চলে না।

২০১৫ সালে সু চি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাঁর দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ১০ লাখের কিছু বেশি। এখন সম্ভবত তিন লাখ রোহিঙ্গা আছে। বাকিরা হয় মারা পড়েছে, নয়তো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়েছে। যারা পালিয়ে আসতে পেরেছে তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না, বাকি বিশ্ব কেন এতে হস্তক্ষেপ করছে না? কেন তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছে না? মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে কয়েক মাইল দূরের বালুখালী ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর ভয়াবহ নির্যাতনের কাহিনি শুনতে পাই আমি। পশ্চিম মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের একটি গ্রাম তুলাতলি থেকে প্রাণ নিয়ে পালানো কিছু মানুষ বলছিল তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ৩০ আগস্ট সকালে দেড় শ সেনা এবং ১০০ বৌদ্ধ পায়ে হেঁটে গ্রামটিতে ঢুকে পড়ে। শুরুতেই রকেট লঞ্চার দিয়ে বাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভীত গ্রামবাসী ছুটতে শুরু করলে সেনারা সেমি অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে গুলি চালায়। একপাশে জঙ্গল আর একপাশে খরস্রোতা নদীর মাঝে তুলাতলির অবস্থান। প্রথমে গ্রামবাসী ছুটতে শুরু করেছিল জঙ্গলের দিকে। সেখানে তলোয়ার হাতে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল বৌদ্ধরা। ওদিক থেকে এবার তারা নদীর দিকে পা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো গ্রাম এসে জড়ো হয় নদীর তীরে। ওই গ্রামের আবদুল্লাহ নামে এক মোল্লা বলছিলেন, ওই দিন অন্তত হাজার দেড়েক মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানও রয়েছে (এক মেয়ের পাশের গ্রামে বিয়ে হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়)।

তিনি এবং তাঁর মতো আরো ১৫ জন ‘শক্তিশালী মানুষ’ সাঁতরে কাছের এক গোরস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেন। ঘটনাস্থল থেকে এর দূরত্ব ৪০ গজ। আবদুল্লাহ বলছিলেন, গ্রামের লোকজনকে প্রথমেই সেনারা তিন ভাগ করে। এক ভাগে পুরুষ, আরেকটিতে বৃদ্ধা, শেষটি তরুণী বা কম বয়সী মেয়ে। এদের মধ্যে পাঁচ বছরের শিশুও রয়েছে। প্রথম দুই ভাগের লোকজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ হয়। মৃতদেহগুলোকে স্তূপ করে এর ওপর কম্বল চাপিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলে এর মধ্যে ছুড়ে ফেলা হয় শিশুদের। এরা তখনো জীবিত। কমান্ডার পাশেই বসে ছিল, চুপচাপ। অর্থাৎ সেনারা যা করেছে সে বিষয়টি আগেই নির্দেশ দেওয়া ছিল।

এরপর যা হলো তা আরো নৃশংস। শেষভাগে তরুণীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। এদের পাঁচ-ছয়জনের দলে ভাগ করে গ্রামের যেসব বাড়ি পুড়ে যায়নি সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর তিন ঘণ্টার নীরবতা। বাড়িগুলোতে সেনাদের ঢোকা, বের হওয়া দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে কী ঘটছে তা আবদুল্লাহ দেখতে না পেলেও বুঝতে পারছিলেন। ধর্ষণ। এই দলগুলোর কোনোটিতে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েরাও ছিল।

একসময় আবদুল্লাহ দেখলেন মেয়েগুলোকে ভেতরে রেখেই ওই বাড়িগুলোতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। মাত্র সাতটি মেয়ে মারধর আর পোড়ার ক্ষত নিয়ে ওই আগুন থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী বা মেয়েদের আর দেখা হয়নি। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আবদুল্লাহ বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রওনা হন। ১০ দিন পর বাংলাদেশের ক্যাম্পের পাশের গ্রামে বিয়ে হওয়া মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয় তাঁর।

তুলাতলিতে গিয়ে আবদুল্লাহর কথার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওই সব এলাকায় বিদেশি পর্যবেক্ষকদের যেতে দিচ্ছে না। ৭ তাদের ভাষায়, সেখানে ‘পরিচ্ছন্নতা’ অভিযান চলছে। তবে ক্যাম্পে থাকা বাকি শরণার্থীদের বয়ানও প্রায় একই। পান বিক্রেতা মোহাম্মদ বলছিলেন, তাঁর গ্রাম দার গি জারে শতাধিক মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। পরে সেনারা এগুলো জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। জঙ্গলে লুকিয়ে দেখেছেন তিনি।

কাজেই বিশ্বকে এক্ষুনি প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। সু চির সমর্থকরা বলছেন, সেনাবাহিনী তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। এ কথা সত্য। তবে শুধু এ কারণেই তিনি দায় এড়াতে পারেন না।

সেনা নেতৃত্বের ওপর অবশ্যই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। জাতিসংঘের উচিত সত্য জানতে মিয়ানমারে একটি মিশন পাঠানো। সর্বোপরি এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সু চিকে কথা বলতে হবে।

 

লেখক : লন্ডনের কিংস্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ব্রিটিশ জার্নাল রেডিক্যাল ফিলোসফির সম্পাদক

সূত্র : ডেইলি মেইল

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ


মন্তব্য