kalerkantho


উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ কি সত্যিই বাধবে

নিকোলাস ক্রিস্টফ

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ কি সত্যিই বাধবে

নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া যে বার্তা দিয়েছে সেটি হলো, তাদের থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। যুদ্ধটা বোধ হয় ঘনিয়ে আসছে।

আমেরিকার জনগণ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে তাতে সমর্থনই জোগাবে বিপুল উদ্যমে। যুদ্ধ বাধলে সেটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনা। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিনই ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হতে পারে।

সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে থামাতে প্রয়োজন হলে তাঁরা যুদ্ধে নামবেন। খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে গুঁড়িয়ে দিতে তিনি প্রস্তুত। আর তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলার হুমকি মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট যেকোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি।

যখন একজন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর উপদেষ্টারা যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়ার কথা বলেন, তখন সেটাকে গুরুত্বের সঙ্গেই নিতে হবে—এটা ইতিহাসের শিক্ষা।

কয়েকজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাঁদের হিসাবে যুদ্ধের ঝুঁকি ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি।

এটা ভাবিত করার মতো বিষয়।

সমস্যাটি এখন দ্বিমুখী। প্রথমত, উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করা অকল্পনীয় বিষয়। দ্বিতীয়ত, একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আর্থিক অবরোধ আরোপ অকার্যকর বিষয়। মোদ্দা কথা, আমরা নিরাশার পেছনে অকেজো কৌশল নিয়ে ছুটছি।

যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাস্তাও খুঁজছে। সাইবার হামলা আর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার কথা ভাবছে। তবে এতেও উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র হস্তান্তরে বাধ্য করা সম্ভব হবে না। ফলে ট্রাম্পের কাছে সামরিক উপায়ই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

এখানে ট্রাম্পের দোষ নেই। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসন ও পরবর্তী সব প্রশাসনই উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে খুব বেশি কঠোর হয়নি। ফলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এ অবকাশে উত্তর কোরিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, তারা প্রায় আট হাজার মাইল দূরত্বে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সক্ষম। কাগজে-কলমে হলেও গোটা যুক্তরাষ্ট্র তাদের আওতার মধ্যে।

আমরা হয়তো এখনই ঝুঁকিতে নেই। ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে পরমাণু বোমা যুক্ত করে হামলা চালাতে উত্তর কোরিয়া হয়তো এখনো সক্ষম নয়। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের দিকে তারা খুব দ্রুত এগোচ্ছে। সেই পরীক্ষা চালানো থেকে তাদের বিরত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের কারো কারো বিশ্বাস, ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কার্যক্রমের শুরুতেই যদি প্রকল্পগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাত, তাহলে বোধ হয় কাজ হতো। কিন্তু সত্যিটা হলো, তখনো সিউলে ব্যাপক রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলা চালানোর সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার ছিল।

 

১৯৬৯ সালে উত্তর কোরিয়া আমেরিকান গোয়েন্দা বিমান ভূপাতিত করেছিল, ৩১ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছিলেন। তখন দেশটির ওপর হামলা চালাতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। সহযোগীরা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন, সামরিক হামলা পুরোদস্তুর যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। এরপর নিক্সন পিছু হটেন। এরপর আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা উত্তর কোরিয়ার ওপর হামলার হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত সংযত থেকেছেন।

সমালোচকদের মতে, এই সংযমের কারণে উত্তর কোরিয়ার ভেতর এ ধারণা জন্মেছে যে যুক্তরাষ্ট্র নখদন্তবিহীন এক বাঘ। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া সফরের সময় কর্মকর্তাদের কথাবার্তা শুনেছি। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের বাংকার আর সুড়ঙ্গ আছে, পাল্টা হামলা করার ক্ষমতা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু যুদ্ধে তারা শুধু টিকেই থাকবে না, পাল্টা হামলা চালিয়ে জয়ের পথেও যেতে পারবে।

ওয়াশিংটনেও একই বিভ্রান্তি দেখা যায়। এখনকার লোকজন মনে করে, আমেরিকান ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক দিনেই যুদ্ধের ইতি ঘটবে। স্মরণ করুন, ১৯৯৯ সালে কসোভো থেকে সরে যেতে রাজি হওয়ার আগে খুদে সার্বিয়া ন্যাটোর বোমাবর্ষণের মুখে দুই মাসের বেশি টিকে ছিল। উত্তর কোরিয়ার সহ্যক্ষমতা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি আরো অনেক বেশি।

কোরীয় উপদ্বীপের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হবে কোনো সমঝোতায় পৌঁছা। যার বদৌলতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবেন। উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে সম্ভবত এ ইঙ্গিতই দিতে চেয়েছে। পারমাণবিক হামলা-পাল্টাহামলার ঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে চলুন আমরা আলোচনার উদ্যোগ নিই।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (অনলাইন সংস্করণ)

ভাষান্তর : শামসুন নাহার


মন্তব্য