kalerkantho


ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপের ছাপ দেখা যাচ্ছে

স্টিফেন লেন্ডম্যান

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপের ছাপ দেখা যাচ্ছে

ইরানে চলমান বিক্ষোভ-সহিংসতায় বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেছেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তাঁর ভাষায়, ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শত্রুরা বেজায় ক্ষুব্ধ। এর কারণ ইরানি জাতির সাফল্য, অগ্রগতি ও গৌরবময় ভূমিকা। তারা আঞ্চলিক সমস্যা-সংকট ইরানে বিস্তৃত করতে দৃঢ়সংকল্প। ইরানের জনগণ ও সরকার তাদের সমুচিত জবাব দেবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রায় একই কথা বলেছে। তারা বলেছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলছে। এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইংরেজি নববর্ষের প্রাক্কালে সূচিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে গুলিবর্ষণে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে একজন পুলিশ সদস্যসহ প্রায় ২০ জন ইরানির মৃত্যুর ঘটনা বিদেশি হস্তক্ষেপের দিকেই ইঙ্গিত করে। ইরানে যা ঘটছে তার সঙ্গে ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার দারায় প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঘটনার সাদৃশ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর গুলি চালিয়েছিল। আর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হামলাকারী এবং বেসামরিক নাগরিক ও পুলিশ হত্যাকারী সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টাব্যবস্থা নিয়েছিল। এরই জেরে সিরিয়ায় সংঘাতের সূচনা। দারার সংঘাতের জের সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। সাংঘর্ষিক ঘটনাগুলোর সুযোগ নিয়েছিলেন ওবামা; ‘যুদ্ধ’ শুরু করেছিলেন তিনি। সাত বছর পরও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির অবসান ঘটেনি।

ইরানের ঘটনার সঙ্গে ২০১৩ সালের শেষে ও ২০১৪ সালের শুরুতে কিয়েভের (ইউক্রেনের রাজধানী) ইউরো-ময়দানে সংঘটিত সহিংস ঘটনাবলিরও মিল রয়েছে। ওবামা প্রশাসনের ইন্ধনে ওই ‘ক্যু’র সময় স্নাইপারদের গুলিতে পুলিশ ও সাধারণ মানুষসহ কয়েক শ জন নিহত বা আহত হয়। কিয়েভের ফিলহারমনিক হল থেকে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি ছোড়া হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্নাইপাররা সেনাদের ব্যবহার্য ব্যাগের অনুরূপ ব্যাগ বহন করছিল। এসব ব্যাগ অপটিক্যাল সাইটযুক্ত স্নাইপার রাইফেল ও অ্যাসল্ট রাইফেল বহনের জন্য ব্যবহার করা হয়।

ডবক্ষোভের আগের দিনগুলোতে ময়দান-নেতারা বলতে গেলে কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে অবস্থান করতেন। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ওই নেতারা ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করেন। এরপর একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতাসীন হয়। ১৯২২ সালে রোমে মুসোলিনির ‘ক্যু’র পর ইউরোপে এটাই সবচেয়ে বিব্রতকর ও অভব্য ঘটনা।

সিআইএর প্ররোচনা-প্রণোদনায় ভেনিজুয়েলার রাস্তায় রাস্তায় যেসব সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেসবের সঙ্গেও ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ঘটনাবলির মিল রয়েছে। ওই সময় অনেক লোক আহত বা নিহত হয়। বলিভারীয় সামাজিক-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হটিয়ে ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের উদ্দেশ্যে ‘কালার রেভল্যুশন’ ঘটানোর চেষ্টায় মদদ জুগিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

গুলিবর্ষণ, রাস্তার পাশে বোমা পেতে রাখা, অগ্নিসংযোগ ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক কাজ করে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্ট করা, আবর্জনা-জঞ্জালে আগুন লাগিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, খাদ্য মজুদখানা ধ্বংস করা, মাতৃসদন অবরোধ করা—কী করা হয়নি তখন! হেলিকপ্টারে করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্ট ভবনে হামলার ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল। হুগো শাভেজের শাসনামলের শুরুতেই ওয়াশিংটন সরকার হটানোর (রেজিম চেঞ্জ) নীতি গ্রহণ করেছিল। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন নিকোলাস মাদুরোকে গদিচ্যুত করার চেষ্টায় লিপ্ত। এ বছর নতুন কোনো ঘটনা দেখা যাবে হয়তো।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী শামখানি বলেছেন, রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় ইরানে ছায়াযুদ্ধের (প্রক্সি ওয়ার) পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এসবের জন্য ওয়াশিংটন, ব্রিটেন ও সৌদি আরব দায়ী। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হ্যাশট্যাগগুলোর ২৭ শতাংশের জন্মদাতা সৌদি সরকার।’

প্রেসিডেন্ট রুহানি মনে করেন, এসব ঘটনায় ইসরায়েলেরও হাত আছে। তারা তাদের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে চায়, ইরানে পাশ্চাত্যপন্থী পুতুল সরকার কায়েম করতে চায়। একটি ক্ষুদ্র ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য দায়ী।

গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিক্ষোভ চলছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাবলি অব্যাহত থাকলে সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবেলার জন্য মাঠে নামবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

পিপলস মুজাহিদিন অব ইরানের নেত্রী মারিয়াম রাজাভি এরই মধ্যে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি ইরানে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। সিআইএর মদদপুষ্ট দলটি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সহিংস উপায়ে উত্খাতের আহ্বান জানিয়েছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। খবর কানে আসছে, আইআরজিসির আল কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাশেম সোলায়মানিকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে। সিরিয়ায় ইরানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

ইরানের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। যুক্তরাষ্ট্র প্ররোচিত কালার রেভল্যুশনের বিভিন্ন উপসর্গ এতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য ইরান পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ও সতর্ক। দেশটির দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা বাহিনী ‘মেড-ইন-দি ইউএসএ’ ব্র্যান্ডের সহিংসতা ও স্থিতিবিনাশক কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করতে সক্ষম।

 

লেখক : গবেষক, লেখক ও সঞ্চালক-উপস্থাপক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক


মন্তব্য