kalerkantho


বিশুদ্ধ অক্সিজেন ও বহু মেরুর বিশ্ব প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ

জয়া ফারহানা

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গেল বছর বা গত কয়েক বছর বা কয়েক দশক যেসব সমস্যা নিয়ে বিশ্ব ক্রমাগত টাল খাচ্ছে ২০১৭ সালের শেষেও তার কোনোটিরই সমাধান হয়নি। বরং নতুন বছরে আমরা প্রবেশ করেছি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাম্ভিক সিদ্ধান্ত সঙ্গে নিয়ে। নতুন বছরে বিশ্ব প্রবেশ করেছে তৃতীয় ইন্তিফাদার জোর সম্ভাবনা নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘোলাটেতর হয়েছে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬০ ডলারে উন্নীত হওয়ার আতঙ্কজনক আশঙ্কা নিয়ে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ বছরই ডিজিটাল মুদ্রা বা বিট কয়েনে ধস নামবে। উত্তর কোরিয়া কয়েক দিন অন্তর অন্তর নতুন নতুন স্যাটেলাইট উেক্ষপণের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাসীকে কম্পমান রাখছে। শুধু উত্তর কোরিয়ার কথাই বা বলি কেন, যুদ্ধমনস্ক কোন দেশই বা যুদ্ধপ্রবণতা থেকে বেরিয়ে এলো? ব্রেক্সিটের কারণে বিচ্ছিন্ন যুক্তরাজ্য। ২০১৮ সালেই ব্রেক্সিটের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বকে। সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বায়ন ন্যায্যত কার্যকর না হলে তা যে অধিকাংশ দেশেরই কাজে লাগে না এবং তা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে লাভবান না করে বরং ক্ষতিগ্রস্ত করে—তা আরো পরিষ্কার হয়েছে গেল বছর। ফলে আরো অনুদার, আরো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছে দেশে দেশে। পরামর্শ এসেছে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ শুল্ক ও অশুল্কজনিত ন্যায্য আইন প্রতিষ্ঠার, যা বিশ্বায়নের জমানায় অকার্যকর দেখেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। এসব আশঙ্কা নিয়ে এসেছে নতুন বছর। প্রতিবছরের শুরুতে ঘড়ির কাঁটা ১২টার ঘর স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেমন আতশবাজির ঝলকানিতে ঝলকে ওঠে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আকাশ, এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি আতশবাজির বর্ণিল-ছটায় ঝলকে উঠেছিল অকল্যান্ডের আকাশ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রান্তিক পদ্মাপারের আকাশও। এভাবে যাঁরা আকাশকে রঙিন করে তোলার চেষ্টা করেন হয়তো অবচেতনে তাঁদের প্রত্যাশা থাকে নতুন বছরে জীবনও যেন আকাশের মতো এমন রঙের ছটায় রঙিন থাকে। প্রতিবছরই কোটি কাটি মানুষ অপেক্ষা করে বিশ্বনেতাদের বোধোদয়ের। কেননা একমাত্র তাঁদের বোধোদয়ের মাধ্যমেই ধরা মাঝে শান্তির বারি বর্ষিত হবে। কিন্তু তা আর হয় কই? আশা শুধু অভিধানের শব্দ হয়েই থেকে যায়। জিরো আওয়ারে আকাশে আতশবাজির আলো ছড়িয়ে আলোকের ঝরনাধারা তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাবলিক স্কয়ারে শান্তির জন্য যে প্রত্যাশার বীজ বপন করা হলো, আসুন দেখি তার ফল কী হলো। আতশবাজির ঝলকানিতে বিশ্ব-আকাশ রাঙিয়ে ওঠার পরপরই নতুন বছর উপলক্ষে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে উত্তর কোরিয়াার নেতা কিম জং উন বলেছেন, তাঁর টেবিলে পারমাণবিক বোমা উেক্ষপণের সুইচ রয়েছে। না, শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি। সঙ্গে এ বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে পুরো যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে এবং বিশ্ববাসী যেন এটাকে শুধু কথার কথা মনে করে স্বস্তিতে থাকতে না পারে তার জন্য এ-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এটা কোনো হুমকি নয়, এটাই বাস্তব। বিশ্ববাসীর মনের প্রশান্তির জন্য কিম জং উনের এই আশ্বাসবাণীই যথেষ্ট নয় বিবেচনা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো বড় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরমাণু অস্ত্রের সুইচ সব সময়ের জন্য তাঁর টেবিলে এবং সেই সুইচ বা বোতাম আরো বড়, আরো শক্তিশালী ও কার্যকর। বিশ্বের যেকোনো স্থানে হামলার সক্ষমতা বিশ্বের যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। যেকোনো মুহূর্তে পারমাণবিক বোমার বোতাম চেপে ধরতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—এই শুভেচ্ছা বাণী নিয়ে বছর শুরু হলো বিশ্ববাসীর। নতুন কিছু নয় অবশ্য। গেল বছর পুরোটা জুড়েই ট্রাম্প এভাবেই শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। গাজার ছোট সংকীর্ণ একটুখানি জায়গায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে, যার কিছু জমি আবার নেওয়া হবে মিসরের সিনাই মরুভূমি থেকে এবং ফিলিস্তিন সরকারকে দেওয়া হবে এক হাজার কোটি ডলার ঘুষ। আর এটাই নাকি ফিলিস্তিনের জন্য শতাব্দীর সেরা বন্দোবস্ত। এটা ছিল বছর শেষে ফিলিস্তিনকে দেওয়া ট্রাম্পের প্রস্তাব। এই প্রস্তাব মেনে না নেওয়ায় ফিলিস্তিনি অর্থ সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়ে বছরের দ্বিতীয় টুইট লিখেছেন ট্রাম্প। শুধু তাই নয়, যারাই তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে তাদেরই তিনি অর্থ সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন বছরের এক সপ্তাহ পার হয়নি, এরই মধ্যে ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থ সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পুঁজি ফুরাচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাকে গোটা বিশ্বের সামগ্রিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে যখন বিশ্বের সব শক্তিশালী দেশকে সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ করার জন্য মতৈক্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানাচ্ছেন তখনো ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঙ্গরাজ্যের তাপমাত্রা মাইনাস ২৩ বা ৩০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেছে সেই তাপমাত্রার প্রতি ইঙ্গিত করে টুইট করেছেন এত দিন নাকি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে সংকট ভেবে বৃথাই যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। কোনো মানেই নাকি ছিল না এর। ট্রাম্প টুইট করেছেন তাপমাত্রা তো এমনিতেই কমে গেছে। অকারণে জলবায়ু তহবিলে তবে আর কেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে? অভিবাসননীতি সংকুুচিত করা শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমিত রাখেননি। কাজেও করে দেখাচ্ছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ইউনেসকোর মতো সর্বজনগ্রহণীয় সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছাও শুধু কথার কথা থাকেনি। যে বিশ্বকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে সেই বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভেবে শঙ্কিত না হয়ে উপায় কি! ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদকে দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পরামর্শ এসেছে নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি সিদ্ধান্ত নিক যেন সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দিলে নিরাপত্তা পরিষদে কেউ যেন তাতে ভেটো দিতে না পারে। ভেটো দেওয়ার এই ক্ষমতা বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের একক মেরুর আধিপত্যের অবসান হবে এবং একাধিক মেরুর একাধিক ব্লকের নতুন এক পৃথিবী গড়ে ওঠার সুযোগ হবে। পুরো বিষয়টি কি এত সোজা? সারা বিশ্বে ৮০ শতাংশের বেশি আর্থিক লেনদেন হয় ডলারে। ডলারের বিপরীতে এখনো তেমন কোনো দাপুটে মুদ্রা বাজারে আসেনি, যা ডলারকে হটিয়ে ডলারের জায়গা নিতে পারে। এখনো যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দেশে দেশে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেয়। বিশ্বের সব দেশ কোনো না কোনোভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন কৌশলগত কারণে এত দিন এই সাহায্য দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এসব সাহায্য বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। যেসব দেশকে এসব হুমকি দেওয়া হয়েছে, তারাও পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, নানা তথ্য দিয়ে এত দিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারাও যে সাহায্য করে আসছিল তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। মুশকিল হলো সাহায্য ব্যাপারটি যে পারস্পরিক, ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ভুলে যান। তিনি ভুলে যান, যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশ থেকে বহু কিছু আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রও আমদানি নির্ভরশীল দেশ। তিনি সংকোচন অভিবাসননীতির কথা বলেন, কিন্তু ভুলে যান, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বহুজাতিক করপোরেশনগুলো দাঁড়িয়ে আছে এশীয় শ্রমিকদের শ্রমের ওপর।   

কিন্তু শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি শান্তি ও স্বস্তির বিশ্বের জন্য হুমকি? শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, গেল বছর বিশ্বের দেশে দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো না হলেও তাঁর কাছাকাছি মানের উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান দেখা যাচ্ছে। চীনের একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবাদী নেতা হিসেবে নিজের ক্ষমতা আরো সুসংহত করেছেন শি চিনপিং। তাঁর সিদ্ধান্তে সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চীনা সাম্রাজ্যবাদ। আফ্রিকার দেশে দেশে হাজার হাজার একর জমি কিনে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছে চীনা উপনিবেশ। এশিয়ার দেশে দেশে লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে চীন পরিণত হতে যাচ্ছে এশিয়ার মোড়লে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ডারউইন গভীর সমুদ্রবন্দর ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নিয়ে সেখানেও নির্মাণ করেছে শক্ত ঘাঁটি। দেখা যাচ্ছে জলে-স্থলে, এমনকি অন্তরীক্ষেও প্রতিষ্ঠা হয়েছে চীনা সাম্রাজ্যবাদ। শুধু সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণের মধ্যেই চীনের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা প্রকাশিত হচ্ছে না, দেশে দেশে চীনের ঋণ সাহায্যের পরিবর্তে এখন পরিণত হচ্ছে শোষণে। একসময়ের সমাজতান্ত্রিক চীন এখন যেকোনো দেশকে ঋণ দেয় তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ জামানতের বিপরীতে। আফ্রিকা থেকে এশিয়া, ইউরোপ হয়ে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত কখনো প্রযুক্তির প্রভাব দিয়ে, কখনো কূটনীতির কৌশল দিয়ে, কখনো অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ আয়ত্তে এনে, কখনো মুদ্রাবাজারে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে চীন পরিণত হতে চাচ্ছে বিশ্ব মোড়লে।

২০১৭ সালের হিসাব বলছে, অর্থনৈতিক সাফল্যের বেশির ভাগ ধনীর পকেটে গেছে। গরিব গরিবই থেকে গেছে। বিশ্বের ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত রেখেছে ২০ শতাংশ ধনী। কিভাবে এই আধিপত্যবাদ থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো যায়, কিভাবে একক মেরুর বিশ্ব থেকে বহু মেরুর বিশ্বে পরিণত করা যায় এবং কিভাবে একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন ফুসফুসে ভরা যায় তার জন্য বিশ্বের সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে আরো ভাবতে হবে। এটাই এখন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জ।   

লেখক : কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য