kalerkantho


ভিন্নমত

ব্যবসায় নেতৃত্ব এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা

আবু আহমেদ

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ব্যবসায় নেতৃত্ব এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা

কম্পানি কী ব্যবসা করছে তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কে ব্যবসা করছে তা জানা। একই ব্যবসা অনেকেই করছেন, কিন্তু কেউ সফল হচ্ছেন, অন্যরা ব্যর্থ হচ্ছেন। সফলদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছেন যাঁরা সফলতাকে শুধু নিজের কাজে লাগান। তাঁদের অন্য শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের কথা চিন্তাই করেন না। আমি বলছি এমন সফল ব্যবসায়ীদের থেকে বিনিয়োগকারীদের সাবধান হতে। তাঁরা পাবলিক ইস্যুর মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থটা নেওয়াই শিখেছেন, বাজারের সেসব লোক যাদের মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডারস বলা হয়, তাদের কিছু দেওয়ার কথা চিন্তা করেন না। ব্যবসায় যে লাভ হচ্ছে তার পুরোটাই বিভিন্ন কৌশলে নিজের হিসাবে নিতে তাঁরা অভ্যস্ত। তাঁদের স্বার্থের পক্ষে গেলে তাঁরা ভালো আয় দেখান এবং ভালো বণ্টনও করেন। আর তাঁদের স্বার্থের পক্ষে না গেলে আয়ও শুকিয়ে যায়। বলেন, বণ্টন করার জন্য আয় নেই ব্যবসার। এমন অনেক ব্যবসা ও ব্যবসায়ী আছেন যাঁরা বছরের পর বছর কম্পানি তথা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার বছরের পর বছর বলে চলেছেন, ব্যবসা থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। তাহলে সেসব ব্যবসা কেমন করে চলছে? তাহলে কি তাঁরা সত্যি লাভ করছেন, কিন্তু মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডারদের কিছু দেওয়ার ভয়ে এবং ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত দেওয়ার ভয়ে স্থিতিপত্রকে ম্যানিপুলেট করে বলছেন ব্যবসায় কোনো আয় হয়নি।

তাঁরা ব্যবসার আয় দেখান না অন্য কারণেও, আয় দেখালে যে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হবে। তাই আয় না দেখালে তাঁদের চারদিকেই সুবিধা, ব্যাংকঋণ মাপ, নো ট্যাক্স, নো ডিভিডেন্ড। এমন ব্যবসার সুযোগ কে ছাড়ে। এমন ব্যবসা করে অনেক উদ্যোক্তা বেশ শান-শওকতে আছেন। বেশ বড় বাড়িতে থাকেন, কয়েক কোটি টাকার গাড়ি হাঁকান, বিদেশেও অনেক অর্থ আছে। ছেলে-মেয়েরা পূর্ণ খরচে বিদেশে পড়ে। ব্যবসা কাগজে-কলমে সিক বা রুগ্ণ। কিন্তু উদ্যোক্তা মহাশয় খেয়েদেয়ে বেশ ভালোই আছেন। এমন ব্যবসা করা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। কারণ হলো এইখানে তো কেউ জিজ্ঞেস করছে না, আচ্ছা আপনি তো আপনার আসল ব্যবসা থেকে কোনো মুনাফা শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের দিচ্ছেন না। দিচ্ছেন না সেই অনেক দিন থেকে। তাহলে আপনি কিভাবে ভালো আছেন। আপনার সম্পদের উৎস কী? আপনার সম্পদ আছে অথচ ব্যাংক তার ঋণ ফেরত পাচ্ছে না। ব্যাংকের খাতায় আপনি ঋণখেলাপি। অথচ আপনি হর্ন বাজিয়ে অতি দামি গাড়িতে ভ্রমণ করেন। এটা কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? তাহলে কি ব্যাংকঋণ আদায়ে মোটেই তৎপর নয়? আসলে অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ অনাদায়ী থাকার জন্য ব্যাংকই দায়ী। স্যুট-টাই পরা লোকগুলোকে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংক যেন অতি ব্যাকুল হয়ে পড়ে। আবার আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের ধারেকাছেও যায় না, শুধুই বলে কিস্তি খেলাপি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে এত দিনের পুরনো খেলাপি হলে সেটা কুঋণে (Bad loan) শ্রেণীকৃত করতে হবে। শ্রেণীকৃত ঋণের ব্যাপারে প্রভিশনিং রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক অন্যত্র যা লাভ করছে, সেই লাভকে এসব ভদ্রলোকের দেয় ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং করা হয়। এতে ব্যাংকেরও লাভ কমে যাচ্ছে। ব্যাংকের খুদে শেয়ারহোল্ডাররা ভালো ডিভিডেন্ড বা মুনাফা পায় না। ব্যাংকের লাভ কম হয় বলে সরকারও কম ট্যাক্স পায়। এই হলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমানের মোটামুটি হালচাল। সরকারি ব্যাংক হলে তো কথাই নেই। এগুলোর ঋণ খেলাপ করা আরো সহজ। এগুলোর কর্মকর্তারা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সমানুপাতিক হারে নিরুৎসাহী। তাই তো সরকারি ব্যাংকগুলোতে কুঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং করার জন্যও কোনো অর্থ থাকে না। হায় হায়, এটাও ব্যাকিং! কিন্তু চলছে তো। কারণ হলো আংকেল সাম (Uncle sam) তো আছেই। প্রয়োজন হলে ওই আংকেল অর্থ দেবে।

আচ্ছা ব্যবসা যদি কয়েক বছর লাভ না করতে পারে এবং উদ্যোক্তা যদি দেখে ওই ব্যবসায় ভবিষ্যৎও অন্ধকার, তাহলে অর্থনীতিশাস্ত্র বলে ওই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে। কিন্তু আমাদের এখানে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। মানা হচ্ছে না এ জন্যই যে ব্যবসা হলো অর্থ হাতানোর একটা সাইনবোর্ড। ওই সাইনবোর্ডকে অনেকে সফলভাবে ব্যবহার করে কোনো রকমের প্রকৃত ব্যবসা না করেও সমাজে অতি তাড়াতাড়ি সুপাররিচ হয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতিশাস্ত্র বলে, ব্যবসা থেকে কমপক্ষে যদি চলতি ব্যয় (Variable cost) না উঠানো যায়, তাহলে সেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু যারা ব্যালান্স শিটে কোনো আয় দেখান না, তাঁদের সেই চলতি ব্যয় উঠার কথা নয়। তাহলে ওই সব ব্যবসা বছরের পর বছর চলছে কিভাবে।

একসময় বলা হতো দেশের কিছু লোককে ধনী হতে দাও, যাতে তারা উদ্যোক্তা হয়ে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। সেই তো সময় দেওয়া হলো অনেক বছরই, প্রায় তিন যুগ। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁদের অনেকেই এমন রিচ হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে অর্থপাচার করছেন।

অর্থনীতিবিদরা তাঁদের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় রেখেছেন অর্থনীতি ও নৈতিকতা। এখন অর্থনীতির পরিসংখ্যানগত অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু নৈতিকতার ধস নেমেছে যেন চারদিকে। সবাই আপনা থেকে নৈতিক হয়ে যাবে, এটা আশাও করা যায় না। আইন ও পরীক্ষা এই দুটির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যান্য দেশের বাজার অর্থনীতিতে নৈতিকতার একটা মান ধরে রাখা হয়েছে। আমরা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি।

সমাজে অনেক ভালো উদ্যোক্তা আছেন এবং তাঁরা যদি অনেক ধনীও হন, তাহলে সমাজের সেটাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। খুদে শেয়ারহোল্ডারদের দিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে, সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে এঁরা সফল ব্যবসায়ী হয়েছেন। তাঁদের সবাইকে অভিনন্দন, তাঁদের কারো কারো শেয়ার কিনে বিনিয়োগকারীরা কল্পনার বাইরে উপকৃত হয়েছেন। এঁরা বিনিয়োগকারীদের ঠকাননি। সরকারকেও অনেক ট্যাক্স দিয়েছেন। কোনো পুরস্কার, ট্যাক্স-রিবেট পেলে তাঁদেরই পাওয়া উচিত। বরং তাঁদের হাতে বিনা মূল্যে মূলধন তুলে দেওয়া উচিত। লোকে তাঁদের বিশ্বাস করে। তাঁরা বাজার থেকে যত অর্থ যত মূল্যে নিতে চান নিতে পারেন।

অন্য একটি বিষয় হলো, অনেক সময় আসল উদ্যোক্তা প্রয়াত হলে বা মঞ্চ ছেড়ে দিলে ওই ব্যবসার হাল কে ধরবে সেটাও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় রাখা উচিত। উপযুক্ত বাপ যদি উপযুক্ত পুত্র রেখে যান বা ব্যবসায় যদি বাপ-বেটা একসঙ্গে হাল ধরেন, তাহলে ওই ব্যবসায় আস্থা রাখা যায়। অনেক পরিবারভিত্তিক কম্পানি বা ব্যবসা বসে যায় আসল উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠাতা যদি প্রয়াত হয়ে যান। একটা করপোরেট সংস্কৃতি চালু হলে পাবলিক লিমিটেড কম্পানিগুলোতে, যেগুলো শেয়ারবাজার থেকে অর্থ নিয়েছে, সেই অবস্থা ঘটার কথা নয়। তবু বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ করব ব্যবসার পেছনের লোকগুলোকে চিনে নেওয়ার জন্য। বাবার পর ছেলে উপযুক্ত কি না ব্যবসা চালানোর জন্য। যদি উপযুক্তই না হয়, তাহলে অবস্থাটা এমন হওয়া উচিত  যে আদি উদ্যোক্তারা শেয়ারগুলো বেচে দিলে বাজার থেকে অন্যরা সেসব শেয়ার কিনে নিয়ে ব্যবসার হাল ধরতে পারবেন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমন ঘটনা কিছু ঘটেছে। তবে স্বচ্ছতার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে শেয়ার কিনে কম্পানির ব্যবস্থাপনায় গেলে সেটাকে ওয়েলকাম জানানো উচিত।

আমাদের দেখতে হবে কম্পানি ভালোভাবে ম্যানেজ হচ্ছে কি না, কম্পানি কে চালাচ্ছে সেটা বড় কথা নয়। যত দিন একটা কম্পানির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে তত দিনই বুঝতে হবে কম্পানি ভালোভাবে ম্যানেজ হচ্ছে। এই জেনারেশনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত লোক আছেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বড়। তাঁরা বড় কিছু করতে চান। তাদের সুযোগ করে দেওয়া উচিত, কম্পানি বোর্ড গঠন নিয়ে রেগুলেটর বিএসইসি অনেক বড় গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। ডিভিডেন্ড বণ্টননীতিও এতে আছে। আশা করি, সামনে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর করপোরেট গভর্নেন্স অনেক উন্নত হবে। সামনে এফআরসি (Financial Reporting Cuncil) কাজ করা শুরু হলে জবাবদিহি আরো বাড়বে।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য