kalerkantho

আশাবাদের হিড়িক

আবুল কাসেম ফজলুল হক

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আশাবাদের হিড়িক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পুরনো কথার কাসুন্দি ঘাঁটতে কেউ ক্লান্তি বোধ করছে না। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন, সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন ইত্যাদি কথা রাজনৈতিক মহল থেকে এবং সিএসও মহলের বিশিষ্ট নাগরিকদের থেকে ক্রমাগত নানাভাবে প্রচারিত হচ্ছে।

আশির দশক থেকে ক্রমাগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশ থেকে পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিক আনয়ন, অরাজনৈতিক, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তিন মাসমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন, জরুরি অবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি কত কী করা হয়েছে! ফল শূন্য। ১৯৮৮ সালে, ১৯৯৬ সালে ও ২০১৪ সালে তিনটি ভোটারবিহীন এবং অত্যন্ত অস্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোকে নির্বাচন বলা মুশকিল। এসব অভিজ্ঞতার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে নিয়ে বছরখানেক ধরে রাজনীতিবিদরা, সিএসওর বিশিষ্ট নাগরিকরা ও সাংবাদিকরা নানা কথার ফাঁকে ফাঁকে একেবারে প্রথম পুরুষে বলছেন, ‘আমি আশাবাদী।’ ‘আমি সব সময় আশাবাদী।’ এই আশাবাদ কি বাস্তবভিত্তিক? তথ্যাদি কী বলে?

ষাটের দশকে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র আমলে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রভৃতি দলের জন্য রাজনীতি ছিল অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক। সরাসরি দমননীতি ছিল ভয়াবহ। সে অবস্থায় শেখ মুজিব (ও আওয়ামী লীগ) ছয় দফা কর্মসূচি প্রচার করে আশা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। তা ছাড়া রাজনীতির ক্ষেত্রে আশা সৃষ্টিও হয়েছিল। কিন্তু ছয় দফা প্রচারের বিরুদ্ধে আইয়ুব সরকার মরিয়া হয়ে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় বিরোধী দলগুলো ও কিছু লেখক ছিলেন বাস্তববাদী ও স্পষ্টবাদী। সরকারের দালালদের কথা ভিন্ন। এই সময়ে, ষাটের দশকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রফিক আজাদ চরম নৈরাশ্যই প্রচার করছিলেন তাঁদের লেখার মাধ্যমে। এখনকার মতো তাঁরা যদি আশাবাদ প্রচার করতেন, তাহলে তা কি সুফলপ্রদ হতো? নৈরাশ্যের কথা বরং বাস্তব প্রতিফলিত হয়েছে এবং জনমনে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের জাতীয় অভ্যুত্থান, স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সম্ভব হয়েছে সত্যনিষ্ঠার কারণে, কবি আল মাহমুদের একটি ছোট্ট কবিতা :

এ কেমন অন্ধকার, বঙ্গদেশ উত্থান রহিত

নৈঃশব্দ্যের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না

নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায়

কেমন ব্যাঙের ছাতা, অন্য কোনো শ্যামলতা নেই।

বুঝি না রবীন্দ্রনাথ কি ভেবে যে বাংলাদেশে ফের

বৃক্ষ হয়ে জন্মাবার অসম্ভব বাসনা রাখতেন।

গাছ নেই, নদী নেই অপুষ্পক সময় বইছে

পুনর্জন্ম নেই আর জন্মের বিরুদ্ধে সবাই।

শুনুন রবীন্দ্রনাথ, আপনার সমস্ত কবিতা

আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি,

নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না।

আপনার বাংলাদেশ এ-রকম নিষ্ফলা ঠাকুর।

এই কবিতায় যে নৈরাশ্য, তাতে বাস্তবের যথার্থ প্রতিফলন আছে বলে মনে হয়। এর দ্বারা জনমনে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মনোভাব তৈরি হয়েছিল। কবিতাটি লোকের মুখে মুখে উঠেছিল, নানা জায়গায় বারবার উদ্ধৃত হয়েছিল। বাস্তবতা বোঝানোর জন্য বক্তাদের বক্তৃতায় পর্যন্ত স্থান পেয়েছিল।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল কবি জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতাটি নিয়েও। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত সভ্যতার সংকটের চরম রূপটি ফুটে উঠেছে ওই কবিতায়। সেটিও মুখে মুখে উঠছিল, বারবার উদ্ধৃত হতো, পোস্টার-ফেস্টুনে স্থান পেত, শেষ পর্যন্ত মানুষ প্রতিবাদে-প্রতিরোধে-বিক্ষোভে-অভ্যুত্থানে ফেটে পড়েছে।

নৈরাশ্যজনক বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লোকে উন্নততর নতুন বাস্তব সৃষ্টি করতে চেয়েছে। এখনকার আশাবাদ তো সম্পূর্ণ কায়েমি স্বার্থবাদীদের পক্ষে, হীন স্বার্থান্বেষীদের পক্ষে, অপশক্তির স্বার্থে। এই আশাবাদীরা কি Intellectual honesty-র পরিচয় দিচ্ছেন? পরিচয় দিচ্ছেন দৃঢ় Intellectual Character-এর? যে আশাবাদ সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তা প্রচার করার ফল কি ভালো হবে? ভালো কী? মন্দ কী? ন্যায়কামী কেউ তো মিথ্যা চাইতে পারেন না।

আমার মনে হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে খুব ভালো কিছু আশা করার কোনো কারণ ঘটেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে এমনটি আশা করার কোনো কারণই ঘটেনি যে আগামী নির্বাচন আগের ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে হঠাৎ খুব ভালো হবে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, বাসদ প্রভৃতি দল আত্মগঠনমূলক এমন কিছুই করেনি, যাতে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র আগের ধারাবাহিকতায়ই চলছে। উন্নতির কোনো চেষ্টা নেই। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার মামলার রায় হতে পারে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হত্যা মামলার রায় হতে পারে, আসাম থেকে বাঙালিরা বাংলাদেশে বিতাড়িত হতে পারে এবং এসবের দ্বারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় আছে। এমন কথাও শোনা যায় যে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত পরামর্শ করে একমত হয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশের জনগণের জন্য ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কোথায়? নির্বাচনকালে প্রশাসন যে পক্ষপাতমুক্ত হয়ে কাজ করবে সে ভরসা কম। নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টদের বাইরে সিএসওর লোকরা, এমনকি বিদেশি পর্যবেক্ষকরা জড়িয়ে পড়েন। পোলিং এজেন্টদের তো কোনো দামই দেওয়া হয় না। রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নানাভাবে নানা শক্তি বিবাদ লাগিয়ে দেয়। এখন মনে হচ্ছে যে সরকারি দল ছাড়া আর কোনো দলের কোনো শক্তিই নেই। কাজেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না, শান্তিপূর্ণভাবে যে দল প্রবল, সেটিই জিতে যাবে। দমননীতির ফলে, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদিতে বিনা বিচারে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের হত্যা করার ফলে, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি শক্তি শেষ হয়ে গেছে। ফলে অশান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই। যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার চলছে। বলা হয় যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আসলেই কি ভালো? গুম, খুন, আত্মহত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ, ড্রাগ, আইটির অপব্যবহার ইত্যাদি তো আছে!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হোক—এটা চাই। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের ও রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক চরিত্রের যে উন্নতি দরকার, তার কোনো উপলব্ধি, কোনো আগ্রহ কোনো দলের মধ্যেই নেই দেখে পাইকারিভাবে আশাবাদী হতে পারি না। পাইকারি আশাবাদ যাঁরা প্রচার করেন, তাঁদের বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। প্রচারমাধ্যম প্রগতি-অভিলাষী নতুন কোনো চিন্তাকেই সহায়তা করে না। কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রগতিবিরোধী চিন্তাধারা ও কর্মধারা নিয়ে রাজনীতি তো যেমন আছে, তেমনি থাকবে। আমি রাজনীতির উন্নতি চাই। মনে হয় আমার যে রাজনীতির উন্নতি ছাড়া কোনো উপায়েই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

যাঁরা সর্বজনীন কল্যাণে চিন্তা ও কাজ করবেন, তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী আবর্তের বাইরে থেকে, কায়েমি স্বার্থবাদী চক্রগুলোর বাইরে থেকে চিন্তা ও কাজের নতুন কেন্দ্র ও নতুন ধারা সৃষ্টি করতে হবে। রাজনীতির উন্নতির জন্য এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এ ধারার সৃষ্টি অপরিহার্য। রাজনীতি কী এবং কী নয় সে সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্যকে লিখিত রূপ দিয়ে পুস্তিকা আকারে ক্রমাগত প্রচার করতে হবে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁদের বিচার-বিবেচনা ও বক্তব্য একইভাবে পুস্তিকা আকারে প্রচার করতে হবে। ফরাসি বিপ্লব থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতি ও আমাদের রাজনীতি সম্পর্কে মোটামুটি একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা তাঁদের অর্জন করতে হবে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা দ্বারা নিজেদের জ্ঞানকে বিকাশশীল রাখতে হবে। জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে তাঁদের পরিচ্ছন্ন জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং এর চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। বিভিন্ন আদর্শ ও অভিজ্ঞতার সংযোজনের দ্বারা সর্বজনীন গণতন্ত্রের বা শতভাগ মানুষের গণতন্ত্রের অথবা যুগোপযোগী নতুন গণতন্ত্রের ধারাটা তাঁদের উদ্ভাবন করতে হবে। তাঁদের রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দ্বারা জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ গঠন ও সরকার গঠনের কর্মনীতি ও কর্মসূচি তাঁদের উদ্ভাবন ও কার্যকর করতে হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম দলগুলো এ ধারায় অগ্রসর হয়ে নিজেদের দলীয় কাঠামো ও দলের প্রবৃদ্ধি উন্নত করতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এবং রাজনীতির সার্বিক উন্নতির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। এই ধারাই সর্বজনীন কল্যাণে আশাবাদের অবলম্বন। প্রচলিত ধারার রাজনীতি ও জাতীয় সংস্কৃতি জনসাধারণকে চরম হতাশার দিকে এবং চরম বিক্ষোভের দিকে নিয়ে চলছে। আগের ধারাবাহিকতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো হয়ে যাবে। যদি হয়, তাহলে ওই নির্বাচন দ্বারা গঠিত সরকার সার্বিক বিশৃঙ্খলা ও অচল অবস্থার মধ্যে পড়ে যাবে। যারা প্রবল, আসন্ন নির্বাচনে যাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা, তাদের সমস্যাটিকে বুঝতে হবে। তারা চাইলে অবস্থার উন্নতির উপায় উদ্ভাবন করতে পারে। কিন্তু তা করার মনোভাব তো তাদের মধ্যে দেখা যায় না। অপক্রিয়াশীলরা নিজেরাই নিজেদের কবর রচনা করে—এ রকম একটি কথা ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ধারায় চালু আছে।

আশির দশকের শুরু থেকে বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অনুসারী হয়ে বাংলাদেশের একটির পর একটি সরকার যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালনা করে আসছে, তাতে বাংলাদেশ ক্রমে নিঃরাজনীতিকৃত হয়ে পড়েছে। এই নিঃরাজনৈতিকীকরণের প্রক্রিয়াটিকে গভীরভাবে পরিপূর্ণ সততার সঙ্গে বুঝতে হবে। এরপর সংকট কাটিয়ে উন্নত অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে। বিশ্বব্যাংক, এনজিও, সিএসও, জাতিসংঘ, ইউনেসকো, ইউনিসেফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থায় যে ভূমিকা গ্রহণ করছে, তা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও রাজনীতিকে স্বাধীন সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আপন সত্তায় থেকে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে হবে।

 

লেখক : চিন্তাবিদ, সাবেক অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য