kalerkantho


উদ্বেগ-উত্তেজনায় ট্রাম্পময় ২০১৭ সাল

মো. মাহমুদুর রহমান

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতের শুরুতে ঝরা পাতার মতো ২০১৭ সাল চলে গেল বিশ্ববাসীর জীবন থেকে। সময় চলে যায় ঠিকই, তবে ওই সময়ের কর্মকাণ্ডের ফলাফল নতুন বছরের পথ ধরে অনাগত সময়ের দিকে বহমান থাকে। বিদায়ী বছরের শুরুতে ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প; যদিও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে। এ নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ইলেকটোরাল কলেজ ভোট বেশি পেয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জটিল নির্বাচন পদ্ধতির মারপ্যাঁচে ট্রাম্প নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যেসব ওয়াদা করেছিলেন, তা বাস্তবায়নে প্রথম থেকেই তিনি কঠোর হন। মুসলিম অভিবাসীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মেক্সিকোর সঙ্গে প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসী নিয়ন্ত্রণে তাঁর চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না বিদায়ী বছরে।

ইরানের পরমাণু চুক্তি ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়েও ট্রাম্প ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। উত্তর কোরিয়ার প্রতি হুংকার ও পাল্টাহুংকারে মনে হয়েছিল, যেকোনো সময় পরমাণু যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সব সময়ই মার্কিন মুল্লুকে পরমাণু হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। জবাবে ট্রাম্পও এ রকম হুমকির করুণ পরিণতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট কিমকে বারবার সতর্ক করছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বক্তব্য-বিবৃতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও জেরুজালেম ঘোষণা ছিল এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ৬ ডিসেম্বর ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এ ঘোষণার পর সারা বিশ্ব এর নিন্দায় সোচ্চার হয়। যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একঘরে হয়ে পড়ে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৫ সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি ১৪টি দেশই ট্রাম্পের ঘোষণার বিপক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতার বলে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবটি পাস হতে দেয়নি। এরপর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ওআইসির সম্মেলন ডাকেন। ৫৭ দেশের এ সংস্থা ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থাটির ত্বরিত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া কারো কাছেই অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। তবে অবাক হওয়ার বিষয় ছিল সৌদি আরব ও মিসরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র, যারা ওআইসিতেও প্রভাবশালী ছিল তাদের প্রতিক্রিয়ায়। তারাও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে কঠোরভাবে। উল্লেখ্য যে ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল মিসর। এ ছাড়া বিশ্বে ইসরায়েলের পরে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সাহায্যও পেয়ে থাকে মিসর।

ওআইসির প্রতিক্রিয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর দিন ছিল ২১ ডিসেম্বর। জেরুজালেম ইস্যুতে ওই দিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১২৮টি দেশ। প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ট্রাম্পের ঘোষণার পক্ষে ভোট দেয় মাত্র ৯টি দেশ। দেশগুলো হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, মাইক্রোনেশিয়া, নাইরু, পালাউ ও টোগো। তবে ভোটদানে বিরত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিবেশী কানাডা, মেক্সিকোসহ ৩৫টি দেশ। নিকট-অতীতে বিশ্বদরবারে কোনো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এত প্রান্তিক অবস্থানে ছিল না। সাধারণ পরিষদে ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হ্যালি মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন এবং কারা কারা বিপক্ষে ভোট দেয় তাদের তালিকা পর্যবেক্ষণে থাকবে বলেও জানানো হয়। ভবিষ্যতে এসব দেশে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে না বা কমানো হবে বলে জানানো হয়। এসব হুঁশিয়ারি ও পরোক্ষ হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে জাতিসংঘ জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্পকে নাকচ করে দেয়। ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়ে মার্কিন প্রতিনিধি নিকি হ্যালি বলেন, আজকের দিনটি যুক্তরাষ্ট্র মনে রাখবে। ট্রাম্পও বলেন, ভালোই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় হবে।

ট্রাম্পের ঘোষণা ও বিশ্বদরবারে যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হওয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের বিল (এস-১৩২২) প্রতিনিধি পরিষদে ৩৭৪-৩৭ ভোটে এবং সিনেটে ৯৭-৫ ভোটে পাস হয়। এই আইনে ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের একটা সুযোগ ছিল, যদি তাঁরা মনে করেন এ রকম স্থানান্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর, তাহলে তাঁরা কংগ্রেসে প্রতিবেদন পেশের মাধ্যমে সময় নিতে পারেন। ১৯৯৫ সাল থেকে সব প্রেসিডেন্টই দূতাবাস স্থানান্তরের ওয়াদা করে নির্বাচিত হলেও পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তার অজুহাতে ওয়াদা পূরণ করেননি। ব্যতিক্রম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জনগণকে দেওয়া ওয়াদা প্রথম বছরেই পালন করেছেন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনপ্রিয় ইস্যুটির নিষ্পত্তি হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ারই কথা।

তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া যদি কার্যকর হয় এবং স্থায়িত্ব পায়, তাহলে ট্রাম্প বেকায়দায় পড়তে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিকের কোনো আপত্তি নেই ট্রাম্পের কাজে, যদি তাদের দৈনন্দিন জীবন নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের একজন হাই স্কুল ছাত্রীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায়, ট্রাম্প যখন ৬ ডিসেম্বর ঘোষণাটি দেন তখন তাদের ইতিহাসের ক্লাস চলছিল। ইতিহাসের শিক্ষক অনলাইনে ঘোষণাটি দেখে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ছাত্রদের মতামত চান। তারা আলোচনায় রাজি হলে শিক্ষক তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করতে বলেন। ক্লাসে সংখ্যালঘু ইহুদি ও মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসগত কারণে বিপরীত মতামত প্রকাশ করলেও বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী এ বিষয়ে ছিল ভাবলেশহীন। তবে তারা উদ্বিগ্ন ছিল ট্রাম্পের এ ঘোষণায়, যদি কোনো নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে, তাহলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। শিক্ষক তাদের স্মরণ করিয়ে দেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা, যখন বাধ্যতামূলকভাবে তরুণদের যুদ্ধে যেতে হতো। আজও এমন অবস্থা হলে হয়তো হাই স্কুল ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে যেতে হতে পারে।

মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে মার্কিন ঘোষণার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের মৃত্যুর মিছিল হয়তো আরো দীর্ঘায়িত হবে। রক্ত পিচ্ছিল পথ দিয়েই হয়তো ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে এ ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গিয়েছে বলেই অনেকের ধারণা। ট্রাম্পের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কথা ও কাজের মধ্যে মিলের একটি উদাহরণ। আবার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ ঘোষণা। জেরুজালেম ঘোষণা ইসরায়েলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলেও বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বের ভিতকে উপড়ে ফেলেছে।

কারো কারো মতে, ৬ ডিসেম্বরের জেরুজালেম ঘোষণার পথ ধরে ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিশ্বজনমত প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হয়েছে মার্কিন মোড়লিপনা অবসানের দিন। তবে মার্কিন জনগণের প্রকৃত মতামত জানা যাবে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। এই নির্বাচনে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে গ্রিন সিগন্যাল দিতে পারে আবার রাশ টেনে ধরতেও পারে। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে উত্তেজনা ও উদ্দীপনায় শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। আরো একটু অপেক্ষা করতে হবে।

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কলাম লেখক

mahmudpukra@gmail.com


মন্তব্য