kalerkantho


পাকিস্তান এক অন্তহীন সংকটের সঙ্গী

অনলাইন থেকে

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাকিস্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই সংকটে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র। হালে সেটি ক্রমেই প্রকট হয়েছে। আঞ্চলিক চরমপন্থা দমনে পাকিস্তানের সম্ভাবনার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত রাখা উচিত, নাকি ওই সব গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সহায়তা ও সম্পর্ক দুই-ই সীমাবদ্ধ বা ছিন্ন করলে ভালো হবে?

ট্রাম্প প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানকে দেওয়া প্রায় সব সামরিক সহায়তা বন্ধ করেছে। এই সহায়তার পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ১৩০ কোটি ডলার। ১৬ বছর ধরে পাকিস্তানকে এই তহবিল সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসলামাবাদ বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে সহায়তা করে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই ওয়াশিংটনের অসন্তোষ রয়েছে।

আফগানিস্তানে যাওয়া প্রায় সব কটি সামরিক বিমানই পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে। রসদ যায় পাকিস্তানের সড়ক ও রেলপথ ধরে। যেকোনো সময় পাকিস্তান তাদের এই পথগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের কিছু কর্মকর্তা এমন হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক হয়তো আরো গভীর হবে। চীন এরই মধ্যে পাকিস্তানের নতুন অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিলাষও তাদের আছে। আর আছে ভারতের সঙ্গে চরম বৈরী সম্পর্ক। দীর্ঘদিনের সহযোগী পাকিস্তানকে দূরে ঠেলে দেওয়ার মতো ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের সম্ভবত আবারও সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে চীন।

বছরের প্রথম দিনের টুইটেই ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বোকার মতো গত ১৫ বছরে পাকিস্তানকে তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলার দিয়েছে। তারা আমাদের মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। তারা মনে করে, আমাদের অতীত নেতারা বোকা ছিলেন। আফগানিস্তানে আমরা যে সন্ত্রাসীদের খুঁজেছি, তাদের জন্য নিরাপত্তার স্বর্গ গড়ে দিয়েছে পাকিস্তান।’

এর আগে পাকিস্তানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় কাঁচি পড়ে নব্বইয়ের দশকে। ওই সময় পাকিস্তান প্রথমে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এরপর দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক রাতারাতি পাল্টে যায়। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানায়, আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবানবিরোধী লড়াইয়ে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে পাকিস্তানকে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের গোলযোগপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় যেসব চরমপন্থী আশ্রয় নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

এর পর থেকেই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে চলেছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা তারা নিচ্ছে। তবে আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে নিজ স্বার্থরক্ষায় জঙ্গিতোষণও চলছে। ২০১৪ সালে এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাকিস্তানি তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। এই জঙ্গি সংগঠন পাকিস্তানের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। এই অভিযানে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এর পরও তালেবান-সংশ্লিষ্ট সংগঠন হাক্কানি নেটওয়ার্ককে সমর্থন জুুগিয়ে চলে। আফগানিস্তানে বহু মার্কিন সেনা হতাহত এবং শহরে শহরে বড় ধরনের হামলার জন্য এই হাক্কানি নেটওয়ার্ক দায়ী।

বিশ্বাস নষ্টের আরো কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ভারত ও কাশ্মীর লক্ষ্য করে হামলা পরিচালনাকারী লস্কর-ই-তৈয়বাকে সহায়তা করে। তারা ওসামা বিন লাদেনকেও খুঁজে বের করতে পারেনি। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের প্রধান সেনা ব্যারাকের পার্শ্ববর্তী এলাকায় মার্কিন বাহিনীর অভিযানে তিনি নিহত হন। 

বস্তুত পাকিস্তান হাক্কানি নেটওয়ার্ক ও তাদের সহযোগীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই ১৭ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানবিরোধী লড়াই চালানোর পরও সফল হতে পারেনি। সম্প্রতি আফগানিস্তানে আরো সেনা পাঠাতে রাজি হয়েছেন ট্রাম্প। আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

তবে ট্রাম্প এভাবে পাকিস্তানকে ছেড়ে দিতে পারেন না। দেশটি মাঝেমধ্যেই অতি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডারও তাদের। সাহায্য বন্ধের পরও পাকিস্তান সহযোগিতা করে কি না, তা দেখা হবে। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের কিছু কর্মকর্তা বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তবে গত শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দুটি দেশকেই পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে এগোতে হবে। কারণ দুই পক্ষই অভিন্ন হুমকির মোকাবেলা করছে। 

পাকিস্তানের কাছ থেকে গঠনমূলক সহযোগিতা পেতে কূটনীতির অন্য পথগুলোও খতিয়ে দেখতে পারেন ট্রাম্প। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরালো করতে পারেন তিনি; যাতে পারস্য উপসাগর এলাকা থেকে হাক্কানি নেটওয়ার্ক ও তালেবানের তহবিল জোগানের চেষ্টা বন্ধ হয়ে যায়। এর জন্য অবশ্য কোনো কিছু বন্ধ নয়, বরং আরো বেশি আলোচনার প্রয়োজন হবে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, নিউ ইয়র্ক টাইমস

অনুবাদ : তামান্না মিনহাজ


মন্তব্য