kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশে আবার ‘ডাইনোসরের যুগ’ কি ফিরে আসবে?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশে আবার ‘ডাইনোসরের যুগ’ কি ফিরে আসবে?

ঢাকার কাগজে তিনটি রাজনৈতিক মন্তব্য আমার চোখে পড়েছে। একটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার; অন্য দুটি একটি রাজনৈতিক দলের দুই নেতার। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো চমকপ্রদ কথা নেই। তিনি সাদামাটা ভাষায় বলেছেন, ‘জনগণ ভোট না দিলে তাঁর সরকার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারত না।’ অন্যদিকে বিএনপির এক নেতা মির্জা ফখরুল এবং অন্য নেতা রিজভী বলেছেন দুটি মজার কথা। সম্ভবত দেশের সাধারণ মানুষকে মজা পাওয়ানোর জন্যই তাঁরা রোজই একটা না একটা মজার কথা বলেন। তা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তা ভাঁড়ামি।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘২০১৮ সাল বিএনপির বছর। খালেদা জিয়ার বছর।’ অর্থাৎ দেশের রাজনীতি আবার খালেদা জিয়া ও বিএনপির একচেটিয়া দখলে যাবে। তাঁরা নির্বাচনে জিতে বা অন্য কোনো পন্থায় ক্ষমতায় যাবেন। দেশে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দলের কোনো পাত্তা থাকবে না। সর্বত্র শুধু বিএনপি আর বিএনপি। বিএনপির অন্য নেতা রিজভী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ডাইনোসরের মতো। ডাইনোসরের যেমন বিলুপ্তি ঘটেছে, আওয়ামী লীগেরও শিগগিরই তেমনি বিলুপ্তি ঘটবে।’

সংবাদপত্রে এই বক্তব্য পাঠ করে নিশ্চয়ই অনেকে মজা পেয়েছে। আমিও পেয়েছি। তবু এই ভাঁড়ামি নিয়ে কথা বলার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্য নিয়ে একটু আলোচনা করি। প্রধানমন্ত্রী কোনো রঞ্জিত অথবা অতিরঞ্জিত কথা বলেননি। সাদামাটা কথায় বলেছেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে তাঁর দল জনগণের ভোট না পেলে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারত না।’ কথাটি কি অসত্য? মোটেই নয়। ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোট ছাড়াই এক নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় অবস্থান করেছিল। তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের মুখে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ একই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় থাকতে চাইত, তাহলে তাদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হতো। বিএনপির বিরুদ্ধে শুধু জনগণ নয়, দেশের সব পেশার মানুষ, এমনকি সরকারি কর্মচারীরাও বিদ্রোহী হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। বিএনপির ১৯৯৬ সালের নির্বাচন আর আওয়ামী লীগের ২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য এই যে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ শুধু বিরোধী দলগুলো নয়, সাধারণ ভোটদাতারাও নির্বাচন বর্জন করেছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন দ্বারা বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। ভোটদাতারা তা হতে দেয়নি।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি স্বেচ্ছায় আসেনি। কিন্তু ভোটদাতারা এসেছে। নইলে বর্তমান পার্লামেন্টে এরশাদের জাতীয় পার্টি এত আসন পায় কী করে? বিএনপি গোঁয়ার্তুমি করে নির্বাচনে আসেনি। সে জন্য কি একটি দেশের সাধারণ নির্বাচন বন্ধ থাকতে পারে? বিএনপি নির্বাচনে আসেনি; কিন্তু ভোটদাতারা ভোট দিতে এসেছে। তারাই এই নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে। সেই বৈধতা বিদেশের ছোট-বড় দেশগুলোও মেনে নিয়েছে। জনগণ বৈধতা না দিলে বিদ্রোহী হতো। বিএনপির আন্দোলনে সাড়া দিত। বিএনপি আন্দোলনের নামে নির্দোষ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাস চালিয়েও সফল হয়নি। জনগণ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করতে দিয়েছে। হয়তো আগামী নির্বাচনেও আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট দেবে। প্রমাণিত হবে ফখরুল ও রিজভী দিবাস্বপ্ন দেখছেন। দিবাস্বপ্নে সিংহাসনে বসার দৃশ্য বড়ই মধুর। বাস্তবে সেই স্বপ্নভঙ্গ তথা সিংহাসন থেকে পতনের আঘাত বড়ই করুণ।

২০১৪ সালের নির্বাচনে যোগদানে বিএনপির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তারা স্বেচ্ছায় নির্বাচনে আসেনি। সে জন্য কি নির্বাচন অবৈধ হয়ে যাবে? পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালে সারা দেশে এক ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়। তখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ন্যাপ (ভাসানী) দেশের দুই অংশেই একটি বিরাট শক্তিশালী দল। তারা ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ ধুয়া তুলে নির্বাচন বর্জন করেছিল। এতে নির্বাচন কি বন্ধ রাখা হয়েছিল, না তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের বৈধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেছিল? স্বয়ং মওলানা ভাসানীও তোলেননি। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।

এ জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাত্র একটি বাক্যে তাঁর চূড়ান্ত জবাব দিয়েছেন, ‘জনগণ ভোট না দিলে আমরা ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারতাম না।’ কথাটা সঠিক। এই পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা দেশকে অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্যে যে অবস্থানে উন্নীত করেছেন তার প্রশংসা এখন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোও করে। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সারা জীবন সামরিক শাসকদের পদসেবা করলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে ইংরেজিতে যে বই লিখেছেন, তাতে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে মুজিব-এরা (মুজিব-যুগ) আখ্যা দিয়ে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় বইতে যদি তিনি হাসিনা-এরার (হাসিনা-যুগ) কথা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন, তাহলে আমি বিস্মিত হব না।

সুবে বাংলায় মোগল আমলের নবাব শায়েস্তা খান কবে মারা গেছেন। কিন্তু মানুষ এখনো বলে, শায়েস্তা খানের শাসনামলে টাকায় পাঁচ মণ চাল পাওয়া যেত। অর্থাৎ শায়েস্তা খানের শাসনামলকে মানুষ এখনো স্বর্ণযুগ মনে করে। আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনার শাসনামলে যত ত্রুটিবিচ্যুতিই ঘটে থাকুক, ইতিহাস একদিন এই শাসনামলকে হাসিনা-যুগ আখ্যা দেবে। এবং এই যুগকে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বর্ণযুগ বলে চিহ্নিত করবে। কারণ এই যুগের অর্জন বিশাল।

এই সম্ভাবনার বাস্তবতা জানা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল বলেন, ২০১৮ সাল হবে বিএনপির বছর, খালেদা জিয়ার বছর। কেমন করে হবে, তা বলেননি। নির্বাচন এখনো বছরখানেক দূরে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, সে সম্পর্কে এখনো কিছু স্থির নিশ্চিত কথা বলছে না। তা ছাড়া জিয়া ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলা ও গ্রেনেড হামলায় মানুষ হত্যার মামলার খড়্গ যখন বিএনপি নেত্রী খালেদা ও তাঁর পুত্র বিদেশে পলাতক তারেক রহমানের মাথায় ঝুলছে তখন ২০১৮ সালটি কেমন করে তাঁদের বছর হবে, সে কথা দেশের ‘নব্য গণকঠাকুর’ মির্জা ফখরুলই শুধু বলতে পারেন।

দেশ শাসনে যুগ সৃষ্টি করার আগ্রহ ও যোগ্যতা থাকলে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর খালেদা জিয়া দলকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব দিয়ে সেই যুগ সৃষ্টি করতে পারতেন। তার বদলে হত্যা, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন ও দুর্নীতির পঙ্কে দেশটিকে নিক্ষেপ করে গেছেন। স্বাধীনতার শত্রু ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাদের ক্ষমতার অংশীদার করেছেন। দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটিয়েছেন। এটাকে যদি খালেদা-যুগ আখ্যা দিতে হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে, এটা সন্ত্রাসের যুগ, নব্য বর্গীদের উত্থানের যুগ। যে দেশের মানুষ লড়াই করে এই যুগের অবসান ঘটিয়েছে, তারা কি ২০১৮ সালে তার পুনরাগমন চাইবে? এ জন্যই বলেছি, মির্জা ফখরুল ও রিজভীর মন্তব্য দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ভাঁড়ামি ছাড়া আর কিছু নয়।

বাগ্মিতা ও বাকচাতুর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু অসার বাগাড়ম্বর নয়। বিএনপির নেতানেত্রীদের রাজনীতির একমাত্র মূলধন অসার বাগাড়ম্বর। সেই বাগাড়ম্বর অনেক সময় মিথ্যাচার বলেও প্রমাণিত হয়েছে। স্বয়ং দলের নেত্রী এই অভিযোগ থেকে মুক্ত নন। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বারবার বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আগামী ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসবে না।’ সেই আওয়ামী লীগ এখন তিন দফা ক্ষমতায়। তার নেত্রী শুধু একজন ক্ষমতাশালী নারী নন, বিশ্বের দুর্নীতিমুক্ত প্রধানমন্ত্রীদের একজন বলে স্বীকৃত। আর খালেদা জিয়া নানা গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান। দেশে দুর্নীতির আরেকটি যুগ শুরু করার সুযোগ কি তিনি আবার পাবেন? মির্জা ফখরুলদের দিবাস্বপ্ন কি সত্য হবে?

বিএনপির আরেক নেতা রিজভী আওয়ামী লীগকে প্রাচীন যুগের প্রাণী ডাইনোসরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্ষমতাহারা অবস্থায় দৃষ্টিবিভ্রম হওয়ায় তিনি নিজের দলের চেহারাকে আওয়ামী লীগের চেহারা বলে ভাবছেন। উপমহাদেশের রাজনীতিতে ডাইনোসরের আখ্যা পেয়েছিল মুসলিম লীগ নামে একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। তার প্রায় বিলুপ্তি ঘটেছে। মুসলিম লীগের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে জন্ম বাংলাদেশের বিএনপির। মুসলিম লীগের বাংলাদেশি প্রজন্ম। দেশের অসাম্প্রদায়িক গতিশীল রাজনীতিতে মুসলিম লীগের মতোই তার বিলুপ্তির কথা অনেকে ভাবছে। কল্পনায় সেই চিত্রই রিজভীরা দেখছেন আর ভাবছেন, চিত্রটি আওয়ামী লীগের। কল্পনার মাধুর্য আর বাস্তবতার কঠোর সত্য যে এক নয়, এ কথা জেনেও প্রাচীন যুগের গোপাল ভাঁড়ের মতো তাঁরা ভাঁড়ামি শুরু করেছেন। বিএনপির এই দিবাস্বপ্ন ভাঙতে খুব একটা দেরি নেই।

লন্ডন, রবিবার, ৭ জানুয়ারি ২০১৮


মন্তব্য