kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ একটি শুভ দৃষ্টান্ত

রেজানুর রহমান

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ একটি শুভ দৃষ্টান্ত

পত্রিকায় খবর পড়ে আমি যারপরনাই অভিভূত। এর চেয়ে ভালো খবর আর হয় না। আমরা বছরজুড়ে বিভিন্ন আয়োজন করি। বারো মাসে তেরো পার্বণ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত থাকি। আজ জন্মদিন, কাল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, পরশু বৈশাখী মেলা, পরের দিন বসন্ত উৎসব, পিঠা উৎসব...আরো কত কি! কিন্তু অনেকেই শিকড়কে মনে রাখি না। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, হঠাৎ শিকড়-বাকড় নিয়ে কথা বলছি কেন? শিকড় মানে কি মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছেন? ডিসেম্বরজুড়ে তো মুক্তিযুদ্ধের অনেক কথা বললাম। সামনে মার্চ মাস আসছে তখন না হয় আবার বলব! এই মানসিকতা যাঁরা পোষণ করেন, তাঁদের সঙ্গে আমি মোটেই একমত নই। ডিসেম্বর আর মার্চ মাসটাই কি শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলার মাস? বছরের অন্য ১০টি মাস কি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার মাস নয়? ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলা বসে। তার মানে শুধু ফেব্রুয়ারিই কি বই নিয়ে কথা বলা অথবা বই কেনার মাস? বছরের অন্য সময় কি আমরা বই নিয়ে কথা বলব না? বই কিনব না? তার মানে আমরা বোধ করি, অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিক হয়ে যাচ্ছি। আজ উৎসব পালন করলাম, কাল বেমালুম ভুলে গেলাম। সব কিছু ভুলে যান ক্ষতি নেই। কিন্তু এই জাতির শিকড় যেখানে প্রোথিত সেই মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত থাকতে পারে না। আমাদের এই বাংলাদেশে বছরের প্রতিটি দিনই হওয়া উচিত মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করার দিন। পাশাপাশি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য অবশ্য প্রথম প্রয়োজন আন্তরিকতা। পাশাপাশি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কথায় কথায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি। কিন্তু অনেকেই হয়তো বা যুদ্ধদিনের সেই ভয়াবহ দুঃসহ ঘটনা অনুভব করি না। কী যন্ত্রণাকাতর, নির্দয়, নিষ্ঠুর সময় ছিল সেটা। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা এখনো মর্মে মর্মে সেই যন্ত্রণাকাতর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। তাঁদের জন্য আমরা কে কতটুকু দায়িত্ব পালন করি বা করেছি? যদিও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের আমরা জানি-চিনি, তাঁদের ইচ্ছা করলেই প্রতিদিন নানাভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। কিভাবে তা সম্ভব? ১০ জানুয়ারি কালের কণ্ঠ’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এলেই তা বুঝতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার ১৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে কালের কণ্ঠ। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এর চেয়ে ভালো মহৎ উদ্যোগ আর হতে পারে না। ভাবুন তো একবার, দেশসেরা পত্রিকার জন্মদিনে আলো ঝলমল মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ১৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বেজে উঠল আমাদের অন্তরছোঁয়া প্রিয় জাতীয় সংগীত—আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...তখন কী যে আবেগ-অনুভূতি ছড়িয়ে যাবে...ভাবতেই আনন্দে মন ভরে উঠছে। যাঁরা পাবেন কালের কণ্ঠ’র সংবর্ধনা, তাঁদের মুখটা একবার ভাবুন তো! মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে-মুখে বিজয়ের আনন্দ। তাঁরা হাসছেন। হাসছে বাংলাদেশ। আহ! কী মায়াময় দৃশ্য।

সংখ্যাটা হয়তো কম। কিন্তু অন্তরের মায়াটা অনেক বিশাল। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কালের কণ্ঠ যদি মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে সম্মান জানানোর উদ্যোগ না নিত, তাহলে কারো কি কিছু বলার ছিল? এখানেই আসে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। দেশমাতৃকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকে কালের কণ্ঠ এই উদ্যোগ নিয়েছে। কালের কণ্ঠ’র পথ ধরে অন্যরাও যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে ১৫ থেকে ৩০ আবার ৩০ থেকে হয়তো ৬০ এভাবেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা সম্মান ও শ্রদ্ধা পেতে থাকবেন। দেশটা তখন সত্যি সত্যি অনেক আলোকিত হয়ে উঠবে।

আবারও বলি, এ জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা। দেশের প্রতিটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানও যদি সিদ্ধান্ত নেয় বছরে একবার নিজেদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে, তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাহলে শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই সম্মানিত হবেন না, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা বেড়ে যাবে সবার। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আরো বেশি আগ্রহী ও যত্নশীল হয়ে উঠবে। পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সামাজিকভাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর নানা উদ্যোগ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। ধরা যাক, কোথাও বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেখানে দর্শক সারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ আসন বরাদ্দ থাকা উচিত। বাস, রেল ও বিমান যাত্রায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। স্কুল, কলেজে বিভিন্ন সময়ে এলাকার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে যুদ্ধদিনের কাহিনি শোনানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যাতে আর্থিক দৈন্যে না ভোগেন, সে বিষয়টিও সবার নজরে থাকা জরুরি। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার টান বাড়বে।

আমাদের প্রিয় দৈনিক কালের কণ্ঠ’র জন্মদিন উপলক্ষে অফুরান  শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১৫ জন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে। শুভ জন্মদিন আমাদের কালের কণ্ঠ...

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার


মন্তব্য