kalerkantho


ডেটলাইন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ : পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে

সুভাষ সিংহ রায়

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ডেটলাইন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ : পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তান কারাগারে ছিলেন। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সোমবার পাকিস্তান থেকে তিনি মুক্ত হন। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন শত্রুমুক্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরাখবর দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।

বঙ্গবন্ধু মুক্তি : ডেটলাইন ৮ জানুয়ারি

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন। একটি পাকিস্তানি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই বিমানে আরো ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও তাঁর পরিবার। লন্ডনে সময় তখন ভোর ৮টা ৩০ মিনিট, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। পৃথিবীর কেউ জানে না এ খবরটি।

ডেটলাইন ৯ জানুয়ারি

টাইম ম্যাগাজিন ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২-এ লিখেছে, লন্ডনে বঙ্গবন্ধু উঠেছেন ক্লারিজ হোটেলে। প্রেসিডেন্ট মর্যাদায় একটি সুইটে রাখা হয়েছে তাঁকে। সারা দিনটাই তিনি বিশ্রাম নিলেন। দেখা করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে। বিকেলে একটি প্রেস কনফারেন্স করলেন।

ডেটলাইন ১০ জানুয়ারি

বঙ্গবন্ধুকে নেওয়ার জন্য একটি ভারতীয় ৭০৭ বোয়িং বিমান প্রস্তুত ছিল হিথরো বিমানবন্দরে। তিনি ভারতীয় বিমানে উঠলেন না। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, দুটি কারণে তিনি ভারতীয় বিমান এড়িয়ে গেলেন। প্রথমত, ভারতীয় বিমানে উন্মাদ পাকিস্তানিদের নাশকতার আশঙ্কা ছিল। দুই. শেখ মুজিব সবাইকে বোঝাতে চাইলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। ভারতের ওপর তারা নির্ভরশীল হতে চায় না। স্বদেশে ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু উঠে পড়লেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবহরের কমেট জেটে।

বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল দিল্লিতে। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।

টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, ৯ জানুয়ারি দিনটি ছিল রবিবার। বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে সারা দেশ আনন্দ-উল্লাসে উত্তাল। অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের। বিধ্বস্ত যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যেও লোকজন ছুটতে শুরু করেছে ঢাকার দিকে। ১০ জানুয়ারি বদলে গেছে বাংলাদেশ।

পত্রপত্রিকার শিরোনাম : ১০ জানুয়ারি

বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার শিরোনামে এসেছিল কবিতা ও কবিতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবি নজরুলের কবিতার পঙিক্ত দিয়ে সংবাদের শিরোনামে লেখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংবাদ।

আগের দিন দৈনিক পূর্বদেশ শিরোনাম দিয়েছিল নজরুলের গানের লাইন—তোরা সব জয়ধ্বনি কর। মূল প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, বাংলার মানুষ, তোরা সব জয়ধ্বনি কর। নেতা আসছেন বিজয়ীর বেশে, সোনার বাংলার আকাশে-বাতাসে ওই শোন তাঁর আগমনী বার্তা। আর ১০ জানুয়ারি পত্রিকাটি শিরোনাম করেছিল রবীন্দ্রনাথ থেকে—ভেঙেছে দুয়ার, এসেছে জ্যোতির্ময়।

১০ জানুয়ারি প্রধান শিরোনামটি নিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান থেকে, ঐ মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে। মূল প্রতিবেদনে লিখেছে, আজ বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভদিন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অন্তরের অন্তহীন আস্থা ও ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বর্ণসিঁড়িতে হাঁটিয়া স্বাধীন বাংলা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদীর্ঘ ৯ মাস পরে আবার জননী বাংলার কোলে ফিরিয়া আসিতেছেন। পাক সামরিক জল্লাদের কারাগার তাঁকে ধরিয়া রাখিতে পারে নাই।

দৈনিক সংবাদের শিরোনামটি ছিল—বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায় ঢাকা নগরী। দৈনিক আজাদের শিরোনামটি ছিল একটু বড়। তারা লিখেছিল—জাতির উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে আজ পূর্বাহ্ন সাড়ে ১১টায় মুজিবের ঢাকা আগমন।

প্রধান শিরোনামের পাশাপাশি অসংখ্য উপশিরোনামও ছিল পত্রপত্রিকায়। দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছেন—১. এসো বাংলার স্বাপ্নিক, স্বাগতম। ২. অভিনন্দন আসছে, পথের দুধারে অভ্যর্থনা। ৩. প্রতীক্ষাকুল শহরবাসী। ৪. আমি সর্বাগ্রে গৃহিণী। ৫. আজ ছুটি। ৬. ওকে চোখে দেখার আগে কিছুই বলিব না। ৭. আজ অপরাহ্ন আড়াইটায়।

দৈনিক সংবাদের উপশিরোনাম ছিল, আকাশবাণী ধারাবিবরণী প্রকাশ করিবে।

দৈনিক পূর্বদেশ প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি ছেপেছিল। নিচে লিখেছিল সম্পাদকীয়—মাগো, তোর মুজিব এলো ফিরে। আরো কয়েকটি উপশিরোনাম করেছিল পত্রিকাটি—১. জাতির পিতা আজ তাঁর নিজ লোকের কাছে ফিরছেন। ২. সাজো রেসকোর্স। ৩. এবার নতুন কথা শোনো।

দৈনিক আজাদের আরো সংবাদের শিরোনাম ছিল—১. রাজধানীতে আনন্দ-উল্লাস। ২. ঢাকায় বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন। ৩. হিথ-মুজিব ঘরোয়া বৈঠক।

বিদেশি পত্রিকার শিরোনাম

নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১১ জানুয়ারির প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—শেখ মুজিব হোম, ৫০০০০০ গিম হিম রাউজিং ওয়েলকাম। ১০ জানুয়ারি এই প্রতিবেদন ঢাকা থেকে লিখেছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের ফক্স কাটারফিল্ড। এটা ছিল পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদন। উপশিরোনামে প্রতিবেদক লিখেছিলেন—লক্ষ্য পূর্ণ করার আহ্বান। পাকিস্তানিরা বলেছিল তাদের সঙ্গে যেকোনো প্রকারে সম্পর্ক রাখতে। তিনি বলেছেন, ঐক্য শেষ হয়ে গেছে।

দি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা ১১ জানুয়ারি লিখেছিল, জুবিল্যান্ট বেঙ্গালিস ওয়েলকাম মুজিবুর। ছোট করে উপশিরোনামে দিয়েছিল—শেখ রিজেক্টেড হেট বাট হেট সেজ ওল্ড টাইস আর কাট ডাউন। প্রতিবেদনটি সরাসরি ঢাকা থেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁদের স্টাফ রাইটার লুইস সেমেনসভ।

লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনের নাম ছিল—মুজিব কাটস টাইস উইথ পাকিস্তান। লেখক ক্লেরে হলিংওয়ার্থ।

নয়াদিল্লির দি স্টেটসম্যান পত্রিকার ১১ জানুয়ারি শিরোনামে ছিল—ঢাকা গোস জেলিরিয়াস-মিলিয়ন আউট টু গ্রেট রমনা। সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিন ২৪ জানুয়ারি দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম—বাংলাদেশে হিরো রিটার্ন হোম।

সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে—ঠিক দুপুর দেড়টায় প্রখর রোদের মধ্যে ঢাকার আকাশে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি কমেট জেট দেখা গেল, ঠিক তখনই জেটটি নামল না। আকাশ থেকে শেখ মুজিব তাঁর সোনার বাংলাকে দেখার ইচ্ছে করেছেন। সে কারণে প্রায় ৪৫ মিনিট আকাশ চক্কর মেরে মেরে পাইলট তাঁকে সোনার বাংলাকে দেখালেন। সোনার বাংলা তখন শ্মশান। শেখ মুজিব অবশেষে স্বদেশে ফিরতে পারলেন।

তেজগাঁও বিমানবন্দরে

৯ মাসব্যাপী যুদ্ধে তেজগাঁও বিমানবন্দরটি বোমায় ক্ষতবিক্ষত। মাইলখানেক রানওয়ে কোনোক্রমে ঠিকঠাক করার চেষ্টা হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে কমেট জেটের মতো ধরনের বিমান এখানে নামেনি। নামার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ব্রিটিশ কমেট জেটটি প্রথম তেজগাঁও বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়েতে নেমে এলো। পাইলট খুব সাবধানে টারমাক জেটটি থামালেন। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, হাওয়ায় প্রচুর ধুলা উড়ল।

সেদিন তেজগাঁও বিমানবন্দরে মাত্র দুই হাজার মানুষকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আর দেয়ালের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল হাজার হাজার মানুষ। জেট বিমানটি মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের এক নেতা বলে উঠলেন, জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ। তখন উপস্থিত সবাই গগনবিদারী আওয়াজে আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলল জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ।

স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা হয়, জনতা স্লোগান দিচ্ছে—জাতির জনক দীর্ঘজীবী হোক। মুজিব ভাই দীর্ঘজীবী হোক। তখন এ ছাড়া আর কোনো কথা নেই।

সেখানে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানালেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিপরিষদ। ভারত ও ভুটান তখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাদের হাইকমিশনারদ্বয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হাত মেলালেন। সেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার সেরে ব্রিটেন, রাশিয়ার কনসাল জেনারেল এবং অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা। চীন ও ইরানের কূটনীতিকরা ছিলেন অনুপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল হার্বার্ড ডি স্পিভাকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইম লিখেছে, স্পিভাক সামান্য ঝুঁকে এই বাঙালি নেতাকে স্বাগত জানালেন। হাত মেলালেন। বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, ঢাকায় ফিরে আসার জন্য স্বাগত। বঙ্গবন্ধু শুনে হাসলেন। উত্তরে বললেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

স্পিভাক নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিনিধিকে জানাচ্ছেন, তিনি এই অনুষ্ঠানে সরকারিভাবে আসেননি। ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত পেয়ে এসেছেন। বাঙালি-আমেরিকার সম্পর্কটা দুর্বল। ভালো নয়। এই উপস্থিতির কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। দি ওয়াশিংটন পোস্ট আরো জানাচ্ছে, স্পিভাক এসেছেন বাংলাদেশ সরকারের দাওয়াত পেয়ে। এ দেশটিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রত্যার্বতন অনুষ্ঠানের সাক্ষী হওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকে তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন কনসাল জেনারেল স্পিভাক স্পষ্ট করেই বলেছেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি হলেন দেশটির পিতা।

দি ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, তেজগাঁও বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা সকালে ভালোই ছিল। কিন্তু মুজিব যখন জেট থেকে নেমে এলেন তখন অধীর আগ্রহে থাকা বাঙালিদের আর আটকানো গেল না। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো সব শৃঙ্খলা ভেসে গেল। মুক্তিবাহিনীর টগবগে সদস্যরা সংবাদপত্রের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার ও অন্য কর্মকর্তাদের ঠেলেঠুলে শেখ মুজিবের কাছে চলে গেল। তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।

রাজপথে

টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, সোমবার দুপুরের মধ্যে শত শত হাজার হাজার উত্ফুল্ল বাঙালি রাস্তার দুধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। আর গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছে—শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।

তেজগাঁও থেকে ঢাকার কেন্দ্রস্থল রমনার রেসকোর্স ময়দানের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। এই রাজপথজুড়েই মানুষের ঢল। কেউ বাদ্য-বাজনা বাজাচ্ছে। কেউ কেউ নাচছে। কেউ কেউ গান গাইছে। আর ট্রাকের সামনে ফুলের পাপড়ি ছুড়ে দিচ্ছে। শেখ মুজিব ফুলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। চারদিকে গগনবিদারী স্লোগান উঠেছে—জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, উপস্থিত জনতার উদ্দেশে শেখ মুজিব বললেন, আমার আশা পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বলতে বলতে তাঁর গলা ভেঙে এলো।

তিনি বলেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী ৯ মাসে ৩০ লাখ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তবে আজ প্রতিশোধ গ্রহণের দিন নয়। তিনি রুমালে চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। স্তব্ধ রেসকোর্স। সবার চোখে জল।

পাকিস্তানের উদ্দেশে তিনি বললেন, তোমরা আমার দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছ। মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করেছ। ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছ। এক কোটি মানুষকে তাড়িয়ে ভারতে পাঠিয়েছ।

তোমাদের সঙ্গে আর কোনো ধরনের ঐক্য সম্ভব নয়। আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ। তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। আমাদের আমাদের মতো করে থাকতে দাও।

তিনি দেশবাসীকে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে বিশাল আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি এই জনসভায় দাবি করেন, পাকিস্তানি বাহিনী ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে। এই গণহত্যার জন্য দায়ী অপরাধীদের বিচার দাবি করলেন। তিনি বললেন, আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি মেনেই এই বিচার হবে। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, এই গণহত্যা তদন্তে জাতিসংঘকে একটি কমিশন তৈরি করতে অনুরোধ করলেন তিনি। তিনি সতর্ক করে বললেন, যদি জাতিসংঘ সেটা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা নিজেরাই সেটা করব।

ভারতের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে একটি গান গেয়েছিলেন। এইচএমভি গানটির একটি রেকর্ড বের করেছিল। গানটির কথাগুলো—

 

বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় তুমি আজ

ঘরে ঘরে এত খুশি তাই।

কী ভালো তোমাকে বাসি আমরা, বলো কী করে বোঝাই।

এ দেশকে বলো তুমি বলো কেন এত ভালোবাসলে,

সাত কোটি মানুষের হৃদয়ের এত কাছে কেন আসলে,

এমন আপন আজ বাংলায়—তুমি ছাড়া কেউ আর নাই

বলো, কী করে বোঝাই।

সারাটি জীবন তুমি নিজে শুধু জেলে জেলে থাকলে

আর তবু স্বপ্নের সুখী এক বাংলার ছবি শুধু আঁকলে

 তোমার নিজের সুখ-সম্ভার কিছু আর দেখলে না তাই

বলো কী করে বোঝাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক


মন্তব্য