kalerkantho


স্মরণ

এক মুক্তবিবেক মানুষ

শামসুজ্জামান খান

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক মুক্তবিবেক মানুষ

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের জীবন কিছু অভিনিবেশ সহকারে দেখলে প্রথমে যে জিনিসটি লক্ষ করা যায় তা মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকেই তিনি পূর্ব বাংলার ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যেমন আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তেমনি প্রায় সারা জীবন ভাষাপ্রীতি এবং মাতৃভাষাসংক্রান্ত নানা উদ্ভাবনামূলক ও গবেষণাপ্রবণ চিন্তা-চেতনায় প্রাণিত ছিলেন। তাঁর লেখালেখির প্রায় অর্ধেকটাজুড়েই আছে মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা বিষয়। ১৯৭৪ সালে তিনি ‘যথাশব্দ’ নামে যে থেসোরাস গ্রন্থটি রচনা করেন ওই বিষয়ে অমন গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অতটা পরিপূর্ণভাবে আর ছিল না। কতটা অনুসন্ধিৎসা, নিমগ্ন শ্রম এবং অসাধারণ ধৈর্য এর পেছনে ব্যয় করতে হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। বইটি প্রকাশের পর পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশে এটি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়। সূচনাপর্বেই এমন বিরল মেধা ও অসামান্য শ্রমের পরিচয়বাহী একখানি গ্রন্থ রচনা হাবিবুর রহমানকে রাতারাতি বাঙালির বিদ্বৎসভার একটি অনন্য আসন তৈরি করে দিয়েছিল।

এরপর হাবিবুর রহমান যখন ‘মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৮৩) এবং ‘বচন ও প্রবচন’ (১৯৮৫) রচনা করলেন তখন বোঝা গেল মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদাকে তিনি নানা মাত্রায় এবং নানা ক্ষেত্রে উপলব্ধি করার জন্য অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন। আরো কিছু পরে এ বিষয়ে তাঁর আরেকখানি গ্রন্থ ‘আমি কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে’ (১৯৯৬)। এর পরের বইয়ে বোঝা গেল তিনি মাতৃভাষার প্রতি এই যে অঙ্গীকারদীপ্ত প্রত্যয়ে কাজ করছেন তার উৎস একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল। এ ক্ষেত্রে তাঁর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা বলে’ (১৯৯৬) এবং ‘Twenty-first February Speaks for All Languages’ (1996). ‘বাংলাদেশের সংবিধানের শব্দ ও খণ্ডবাক্য’ (১৯৯৭) বইখানিকেও আমরা এ পর্যায়েই বিবেচনা করব। মাতৃভাষায় আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যাও যে সম্ভব তা-ও এ বইটি রচনার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন। এ বিষয়ে বোধ হয় তাঁর সর্বশেষ বই ‘প্রথমে মাতৃভাষা, পরভাষা পরে’ (২০০৪)।

দুই.

বড় মাপের যেকোনো মাতৃভাষাপ্রেমী বাঙালি চিন্তকের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা অনুরাগ ও রবীন্দ্রচর্চা পরস্পর সংলগ্ন। মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই হাবিবুর রহমান তাঁর চিন্তাজগতে রবীন্দ্রবীক্ষাকেও অপরিহার্য বলে মনে করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের এলাকা ছিল কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ও বহুমাত্রিক। হাবিবুর রহমানের রবীন্দ্রবিচার আমাদের রবীন্দ্রচর্চাকে যেমন নতুন পরিসর দিয়েছে তেমনি দিয়েছে হার্দিক বিস্তার।

তিন.

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছাত্র ছিলেন ইতিহাসের। ইতিহাস-চিন্তার ক্ষেত্রেও তিনি বাংলা, বাঙালি এবং বাংলাদেশকেই গভীর অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। প্রথমে মাতৃভাষা পরে রবীন্দ্র অনুসন্ধান এবং শেষে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা—এ নিয়েই বিশিষ্ট বাঙালি হাবিবুর রহমানের বাঙালিত্বের জগৎ। তিনি বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস রচনায়ও মনোনিবেশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ (১৯৮৫)। বাঙালির ইতিহাসকে সহজ, স্বচ্ছন্দ ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা এই বইখানি শুধু উপাদেয়ই নয়, সব শিক্ষিত বাঙালির জন্য সব সময় হাতে রাখার উপযোগীও। ‘বাংলাদেশের তারিখ’ (১৯৯৮) গ্রন্থখানিও প্রয়োজনীয় একখানি গ্রন্থ বটে।

চার.

ব্যক্তিজীবনে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রগাঢ় ধার্মিক। রোজা-নামাজ নিয়মিতভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রেও তাঁর অনুসন্ধান ছিল ভেতরসন্ধানী। ধর্মকে তিনি ব্যক্তিগত বিষয় এবং গভীরতর উপলব্ধির ব্যাপার বলে মনে করতেন। রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনীতি বা তাঁর বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে ধর্মের কোনো অসংগতি বা বিরোধ তিনি লক্ষ করেননি। সে জন্যই তাঁর পক্ষে যেমন একই সঙ্গে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বাঙালি হওয়া সম্ভব হয়েছিল, তেমনি ব্যক্তিজীবনে নিষ্ঠাবান ধার্মিক হওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা হয়নি। ধর্মচিন্তায়ও তিনি গভীরতাশ্রয়ী চিন্তক এবং ধর্মের মর্মমূল অনুসন্ধানে রত ছিলেন। এই নিরন্তর ধর্ম সাধনার ফলেই তাঁর পক্ষে লেখা সম্ভব হয়েছিল ‘কোরানসূত্র’ (১৯৮৪)-এর মতো একখানি অসামান্য গ্রন্থ। তাঁর আরেকখানি বিরল কীর্তি ‘কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ’ (২০০০)।

পাঁচ.

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে যে রেনেসাঁ মানব বলা হয় তা এ কারণেই যে তাঁর মানবিক অনুসন্ধান ছিল বিচিত্র, বহুমুখী ও বহুকেন্দ্রিক। মানুষ, মানবিক বিবেচনা এবং ইতিহাসবোধের গভীরতা তাঁকে বহু বিষয়ে মৌলিক সত্য অনুধাবন করার এক অনন্য শক্তি দিয়েছিল। সে কারণেই তিনি একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান বাঙালি, মুক্তচিন্তার সাধক, প্রগাঢ় ধার্মিক এবং সর্বোপরি এক বিচার-বিশ্লেষণপ্রবণ অসামান্য মানুষ। একজন আইনব্যাখ্যাতা, প্রশাসক এবং জাতির দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি যে নির্ভীকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই নির্বাচনটি পরিচালনা করেছিলেন তাতে মানুষটির শালপ্রাংশু দৈহিক অবয়বের মতোই ফুটে উঠেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের খরতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে জাতিকে বিপদমুক্ত করার বিরল দক্ষতা। এ সময়ের অসাধারণ সাহসিকতা, দৃঢ়চিত্ততা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গমতার জন্যই মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান হয়ে ওঠেন জাতির এক অভিভাবকপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। এর পরে যত দিন বেঁচেছিলেন তত দিন তিনি নিষ্ঠাবান ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচক এবং জাতির পথনির্দেশক হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা দিয়ে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং সুশাসনে স্থিত অবস্থায় উন্নীত করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

 

লেখক : মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি


মন্তব্য