kalerkantho


জ্বলে উঠুক বাংলাদেশ দল

ইকরামউজ্জমান

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জ্বলে উঠুক বাংলাদেশ দল

আট বছর পর ঢাকায় রোমাঞ্চকর ত্রিদেশীয় ওয়ানডে ক্রিকেট মহোৎসব শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশকে নিয়ে। দেশজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের অপেক্ষা শেষ হতে যাচ্ছে আজ ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ খেলার মাধ্যমে। ত্রিদেশীয় ক্রিকেট সিরিজ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় (দুটি টেস্ট ও দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ) সিরিজ। অর্থাৎ আগামী এক মাসের বেশি সময় দেশের মানুষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উষ্ণ উত্তেজনায় ভুগবে। মেতে থাকবে ক্রিকেট নিয়ে। ক্রিকেট তো দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গা। জয়-পরাজয়ে মানুষ সব সময় দলের সঙ্গে আছে। খেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতির পরিচিতি।

ওয়ানডে ক্রিকেটে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। দিনের খেলা। এখানে লক্ষণীয় হলো, মাঠে কোন দল কিভাবে লড়ে। গেম প্ল্যান মাঠে কতটুকু কাজে লাগাতে পারে! এক দিনের ক্রিকেটে একা হাতে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেওয়ার নজির আছে। তবে বেশির ভাগ সময় দল জেতে দলীয় পারফরম্যান্সে একটি ইউনিট হিসেবে খেলে। ওয়ানডে ক্রিকেটে কোনো দলকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এক দিনের ক্রিকেটের সংজ্ঞাটা পুরোপুরি পাল্টে গেছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রচণ্ড প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে।

বর্তমানে দেশের ক্রিকেটের পটভূমিতে ত্রিদেশীয় ক্রিকেটের গুরুত্ব অত্যধিক। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অপ্রত্যাশিত বাজে পারফরম্যান্সের পরিপ্রেক্ষিতে দলের খেলোয়াড়দের মনোবলে ধাক্কা লেগেছে। খেলোয়াড়রা তাঁদের সামর্থ্যের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাঠের লড়াইয়ে খেলোয়াড়রা ছিলেন ম্রিয়মাণ।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পর দেশের মাটিতে এই প্রথম খেলতে নামবে বাংলাদেশ দল—ত্রিদেশীয় ক্রিকেটের মাধ্যমে। এটি একটি সুযোগ এবং পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও নিজস্ব কন্ডিশনে ভালো ক্রিকেট খেলে ঘুরে দাঁড়ানোর। খারাপ সময়টা পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ছন্দে ফিরে এসে ধারাবাহিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলা, আবার ওয়ানডে ক্রিকেটে ঝলসে ওঠা এবং চিড় ধরা আত্মবিশ্বাসকে জোড়া লাগানো এই সিরিজে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেটরসিকদের উৎসাহ এবার একদম অন্য রকম। তাঁরা ক্রিকেটারদের দিকে তাকিয়ে আছেন আশা ভরা মন নিয়ে। দেশের উইকেটে, পরিচিত দর্শকের সামনে নিজেদের দিনে যেকোনো দলকে পরাজিত করার সামর্থ্য আছে বাংলাদেশ দলের। বড় দলগুলোর বিপক্ষে সিরিজ বিজয় দেশের মাটিতে তার প্রমাণ। দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বাধীন ক্রিকেটে সব কিছুই সম্ভব।

বাংলাদেশ দল এবারই প্রথম খেলতে নামবে হেড কোচ ছাড়া। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদের তত্ত্বাবধানে। এটিও একটি নতুন অভিজ্ঞতা। হেড কোচ চন্দ্রিকা হাতুরাসিংহে তিন বছর দলের দায়িত্বে থাকার পর ইস্তফা দিয়ে চলে গেছেন তাঁর মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও! তিনি এখন প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার হেড কোচ। এদিকে জিম্বাবুয়ের হেড কোচ হলেন হিথ স্ট্রিক। তিনিও বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন কয়েক মাস আগেও। প্রতিপক্ষের উভয় কোচ বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের সবলতা, দুর্বলতা, সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। এদিকে খেলোয়াড়রাও কিন্তু এই দুই কোচের স্ট্র্যাটেজি প্ল্যান, তাদের মানসিকতা ও চাহিদা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তবে গেম প্ল্যান ও স্ট্র্যাটেজি—সব কিছুই নির্ভর করে পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রতিপক্ষের দলগত অবস্থানের ওপর। এটি স্বীকার করতেই হবে হাতুরাসিংহে একজন খুব ভালো স্ট্র্যাটেজিশিয়ান এবং খেলোয়াড়দের ভেতরের বারুদ জ্বালানোর ক্ষেত্রে ভালো মোটিভেটর।

চূড়ান্ত খেলায় নামার আগে ভালো প্রস্তুতিটিই আসল বিষয়। এটির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম দুটি ম্যাচের জন্য নির্বাচকরা ১৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন। স্কোয়াডে নেই সৌম্য সরকার, তাসকিন ও অন্যরা। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন স্কোয়াডের যাঁরা বাইরে ছিলেন। সীমাবদ্ধতার মধ্যে কিছু চিন্তাভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচকরা যে স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন, এর মধ্য থেকেই মাঠে নামবেন ১১ জন। ওপেনার তামিম ইকবালের সঙ্গে জুটিতে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি। ৩ নম্বরে ব্যাটিংয়ের বিষয়টি এখনো সেট হয়নি। ‘গেম প্ল্যানিং’ যে অধিনায়ক মাশরাফির সঙ্গে অন্যদের অবস্থান কতটুকু কার্যকর হবে বলা মুশকিল। মুস্তাফিজ যদি কার্যকর হন, তাহলে সমস্যার সমাধান সহজ হবে। গত তিন বছরে ব্যাটসম্যানরা যেভাবে উন্নতি করেছেন, পেস বোলাররা সেভাবে করতে পারেননি। এটি একটি বড় দুর্বলতা। সাকিবের নেতৃত্বে স্পিনাররাই বড় ভরসা। তবে এ ক্ষেত্রে উইকেটের আচরণ কেমন হবে সেটাই আসল বিষয়। বর্তমানে দেশে যে ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করছে, এতে উইকেটের অবস্থান নিয়ে চিন্তার কারণ আছে। ব্যাটিংয়ে ৭ নম্বর পর্যন্ত গভীরতা আছে। জুটি বেঁধে খেলতে পারলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এখন ৩০০ রান বা এর চেয়ে বেশি রান করা এবং চেজ করাটা ওয়ানডে ক্রিকেটে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পরিচিত কন্ডিশনে খেলা।

শ্রীলঙ্কা দলের গভীরতা কম। তবে খেলোয়াড়দের সম্ভাবনা আছে। শ্রীলঙ্কা দলটি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই চলছে। এখনো সেট হয়নি। ভারতের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারেনি। সিরিজ পরাজয় বড় কথা নয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ হেরেছে। হাতুরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্কোয়াডে পরিবর্তন এনেছেন। পুরনো খেলোয়াড় বাদ পড়েছেন আবার অন্তর্ভুক্তও করা হয়েছে। নতুন খেলোয়াড়ও নেওয়া হয়েছে। ওয়ানডে অধিনায়কের স্থানে পরিবর্তন এসেছে। বোঝা যাচ্ছে, চন্দ্রিকাকে কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ দল ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও এখন পর্যন্ত সিরিজ জিততে পারেনি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেশের মাটিতে ভালো খেলতে চায়, বিশ্বাস করে ‘ফেভারিট’ হিসেবে ত্রিদেশীয় সিরিজ জয় করা সম্ভব। সিরিজ জয় বড় একটি চ্যালেঞ্জ, তবে অসম্ভব কিছু নয়। সব কিছুই নির্ভর করছে ক্রিকেটের মধ্যে ডুবে থেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্বশীল খেলা।

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট অনেক সমস্যায় জর্জরিত। বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটারদের এক ধরনের অস্বস্তিকর লড়াই সব সময়ই চলছে। সম্প্রতি দলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নতুন সাতজন খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুরনো ক্লাব খেলোয়াড়দ্বয় জাতীয় দলে ফিরে আসায় দলের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। জিম্বাবুয়ের বোলিং ও ব্যাটিং শক্তি কাগজে-কলমে যথেষ্ট, তবে সব কিছুই নির্ভর করে মাঠের প্রতিফলনের ওপর। ত্রিদেশীয় সিরিজের খেলা গড়ানোর আগে এটি বলা যায়, সিরিজটি কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য