kalerkantho


বোধোদয়ের বাস্তবায়ন প্রয়োজন

গোলাম কবির

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বোধোদয়ের বাস্তবায়ন প্রয়োজন

ধর্মের বিষয় অনুধাবনের, শিক্ষার বিষয় অনুধ্যানের। দুয়ের মধ্যে অর্থের আপাতসাদৃশ্য থাকলেও একটি নিখাদ নিবিড় বিশ্বাসের, অপরটি নিরন্তর কঠোর অনুশীলনের। রবীন্দ্রনাথ দান করার এ দুটি বিষয়কে পণ্য হিসেবে গণ্য করার ভাবনা থেকে সন্তর্পণে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, গত শতকের প্রারম্ভে, ভুবনডাঙায় ব্রহ্মাশ্রম ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়। সে বোধ পেছনে ফেলে আমরা বিপরীত স্রোতে ভাসছি। উজাড় করে দান করার আনন্দবোধ আমাদের ভোঁতা হয়ে গেছে।

বেশ কিছুদিন থেকে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবসার মাধ্যমে সনদ বিক্রির যে কর্মকাণ্ড চলছে, তাতে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ শঙ্কিত। বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি এড়ায়নি। সম্প্রতি তিনি সিলেটের বিয়ানীবাজারে শিক্ষার মৌলিক আদর্শ সম্পর্কে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, শিক্ষা যেন সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। যথাসময়ে তাঁর এই বোধোদয়কে সংশ্লিষ্ট সবার সাধুবাদ জানানোর কথা। শিক্ষা কিভাবে প্রকৃত জ্ঞাননির্ভর হবে এবং পণ্যের আবহ থেকে মুক্তি পাবে, তা নিয়ে অবশ্যই মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে এ সত্য মানতেই হবে, শিক্ষাকে চিরকালের জ্ঞানের আধার, কল্যাণময় ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করতে হলে শিক্ষা সম্পর্কিত ব্রতী মানুষের প্রয়োজন। এ সত্য থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে। শিক্ষাবর্জিত অনেক মানুষের এখন শিক্ষাঙ্গনে আনাগোনা। এ অবস্থা কিন্তু এক দিনে হয়নি, দীর্ঘ সময়ের অধঃপতনের ফলে।

ইতিহাস সচেতন মানুষ জানেন, আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য অর্বাচীন নয়। একদা জাতির সেরা মেধাবীরা শিক্ষাক্ষেত্রে বিচরণ করতেন। এখন মেধাহীনদের আধিপত্য। আমরা পেছন ফিরলে দেখতে পাই, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে অবিভক্ত ভারতবর্ষের জ্ঞানভাণ্ডারের কিছু বিষয় অন্য দেশকে আলোকিত করেছে। দূরে না গিয়ে কাছেই আমরা দেখতে পাব জ্ঞানসাগরের উজানবাহী তাপস শিক্ষক অতীশ দীপঙ্করকে। এসব ঐতিহ্য স্বীয়করণে বাঙালির জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবহমান ছিল। গোটা উনিশ শতক ছিল আধুনিক জ্ঞান প্রজ্বালনের প্রস্তুতিকাল। একালের একাধিক বরেণ্য শিক্ষক স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশ শতকের শেষের দিক থেকে আমরা ভাঙনের কবলে পড়লাম; যার ধারাবাহিকতা ক্রমবর্ধমান এবং তার ফলে সনদ বিকিকিনি।

শিক্ষার বনিয়াদ সুদৃঢ় করার অভিপ্রায়ে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, শিক্ষকের আর্থিক দৈন্যদশা অপসারিত হলে শিক্ষা পূর্ণতা পাবে। অনেকটা সহজলভ্য অর্থসংস্থানের উপায় পেয়ে আমরা মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছি। শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ‘কোটা’ পদ্ধতির ফাঁদে প্রকৃত শিক্ষক হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। একটি সনদ জোগাড় করতে পারলেই কোটার ফজিলতে এবং অর্থকড়ির মাহাত্ম্যে চাকরি মিলে যায়, শিক্ষক মেলে না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত নড়বড়ে হতে হতে এখন প্রায় পতনোন্মুখ। ঘন ঘন বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফলের প্রতিযোগিতা, পরীক্ষা কক্ষে অবৈধ সুযোগ করে দেওয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়নে শৈথিল্য, অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্যতা ইত্যাদি কারণে শিক্ষা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা প্রায় অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলছি। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো ধরনের কোটা স্বজনপ্রীতি ও উেকাচের বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিন ফিরে আসবে হয়তো। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ দরকার যেখানে-সেখানে গজিয়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে উপার্জনের কারখানা। যথার্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ভার যাদের ওপর অর্পিত, তারা নিজেদের পকেট ভারী করা নিয়ে ব্যস্ত। আর যাদের ওপর এসব দেখাশোনার দায়িত্ব, তারা টাকা পেলে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে, বিবেকের দংশন আমলে না এনে আখের গোছানোয় অতিব্যস্ত।  স্কুল-কলেজ বাড়ছে। কোনো কাজ না পেয়ে নতুন নতুন স্কুল-কলেজ-মাদরাসা খুলে এমপিওভুক্তির জন্য পথ অবরোধ, শহীদ মিনারে অনশন করছে। একসময় এমপিওভুক্তিও হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সমর্থন বাড়ার তাগিদে সরকারি করে জনগণের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর খুব একটা অভাব হয় না। কিন্তু উচ্চপর্যায়ে? প্রকৃত শিক্ষার্থী পাবে কোথায়? শিক্ষা বোর্ডগুলো যেন অলিখিত ভার নিয়েছে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পাস করানোর জন্য। খতিয়ে দেখা হয় না তারা কতটুকু জ্ঞান লাভ করেছে। এই হাজার হাজার পাস করা শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার নামে সনদ সংগ্রহের সুযোগ করে দিচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা উচ্চশিক্ষার হার দেখে গদগদ হই, ভাবি না, সংখ্যার চেয়ে গুণীর মূল্য বেশি।

এই যে অশিক্ষকের শিক্ষকের আসন দখল করা, তার ফলে শিক্ষায় নৈরাজ্য বেড়ে চলেছে জ্যামিতিক হারে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের হোতা কিন্তু শিক্ষক নামধারী অনেক ব্যক্তি। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় কাগজসর্বস্ব সনদ সংগ্রহকে নিরুৎসাহ করতে চেয়েছেন। এটা যেন কথার কথা না হয়। এ লক্ষ্যে সনদ সংগ্রহের উৎস বন্ধ করার কৌশল কার্যকর করা দরকার।

প্রকৃতি অপ্রয়োজনীয় কিছুকে আবর্জনার স্তূপে নিক্ষেপ করে। একসময় সনদ সংগ্রহকারীরা কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হয়ে হয়তো সে মুখো হবে না। কিন্তু এত দিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কিছু সনদধারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেঁকে বসেছে। এবার রাশ টেনে না ধরলে জাতির সর্বনাশ রোধ কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টির গুরুত্ব এমনই অপরিসীম যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথাযথ শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন।

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ


মন্তব্য