kalerkantho


একটি ভিডিও এবং এক শিশুর কান্না!

রেজানুর রহমান

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একটি ভিডিও এবং এক শিশুর কান্না!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অর্থাৎ ফেসবুকে একটি ছোট্ট মেয়ে তার মা-বাবার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ করেছে। মেয়েটির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক হাজার লোক ফেসবুকেই কমেন্ট করেছে। বেশির ভাগই মেয়েটির বক্তব্যের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে। আবার কেউ কেউ মেয়েটিকে ‘বেয়াদব’, ‘পাকনা মেয়ে’ বলেও গালাগাল করেছে। অথচ মেয়েটির বক্তব্য শুনে আমার একবারও তাকে ‘বেয়াদব’ অথবা ‘পাকনা’ মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, মেয়েটির বক্তব্য আমাদের আমলে নেওয়া দরকার। ভিডিওতে মেয়েটির মুখ ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে। সে কারণে আমার মনে হয়েছে, এটি তার একার কাজ নয়। হয়তো বা এ কাজে তার বন্ধুবান্ধবও জড়িত আছে। অথবা হতে পারে তার চেয়ে বয়সে বড় কেউ তাকে এই বক্তব্য দিতে সহায়তা করেছে। যাকগে, আসুন শুনি ফেসবুকে মেয়েটি কী বলছে।

‘মানুষের মাথার ওপর একটা বই। কখনো কি মা-বাবা এগুলো ভাবে? না ভাবে না। যদি ভাবত তাহলে স্কুল থেকে আসার পর বলত, তুমি কি ক্লান্ত আছ? কিছু খাও... রেস্ট নাও... বরং বাবা বলে তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসো। ঠিক আছে, তাই হোক... (দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়েটি) আমার স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সাড়ে ৩টা বাজে। ফ্রেশ হতে না হতেই হুজুর আসে। তার কাছে পড়ি। সে যেতে যেতে আমার বিকেলের টিচার আসে। তার পড়াশোনা আগে থেকেই রেডি করে রাখি। সে যেতে যেতে ৭টা, সাড়ে ৭টা এ রকম... তার কিছুক্ষণ পরই মা আসে। মা এসেই বলে, আজ সবার কাছে সব কিছু পড়েছ? আমি বলি, হ্যাঁ। তারপর তার কাছে পড়তে বসি। পড়তে পড়তে ৯টা... তারপর মা যায়... তখন আমি আবার পড়তে বসি। পড়তে পড়তে ১০টা, ১১টা বাজে। তখন আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। তখন একটু খেয়ে, ঘুমাই... সকালবেলা উঠে আবার একই রুটিন। আমি এখন ফোরে পড়ি। মনে আছে, যখন আমি থ্রিতে পড়তাম তখন একবার আমার রোল ৫ হয়েছিল। তো... হওয়ার কারণে... বাবা যখনই শুনছে যে আমার রোল ৫ হয়েছে... বাবা সেদিন বাইরে থেকে এসে আমাকে পাঁচ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখে (মেয়েটি কেঁদে ফেলে) আমার খুব খারাপ লাগছিল তখন। মানুষই তো ভুল করে। আমি না হয় একটা ভুল করেছি। সে জন্য এমন শাস্তি... বাবা সব সময় মাকেও বকাবকি করে। তুমিও তো একজন টিচার। মেয়ের কিছুই খেয়াল রাখো না কেন? তো... মা রেগে গিয়ে সব বকাঝকা আমার ওপরই দিত। বলত, এই পড়াটা যদি না পারিস তোকে আইজ আমি খাবারই দিমু না। তো, আমি পড়তাম। কষ্ট হলেও পড়তাম। মা-বাবা তো খারাপ কিছু বলে না। ভালোর জন্যই তো বলে। হ্যাঁ... আমি যখন স্কুল থেকে আসি, বাইরে একটা বড় মাঠ আছে। সেখানে আমার সব ফ্রেন্ড স্কুল ছুটির পরে খেলে। তাদের মায়েরা মাঠের কোনায় বসে থাকে। ওদের মায়েরা যখন বলে, যাও একটু খেলে আস। তখন আমার খুব কান্না পায়। আমার মা-বাবা তো কখনো এই ভাবে বলে না। (হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে মেয়েটি) একজন মানুষ কি সারা দিন পড়তেই থাকবে? তার মানসিক গঠনের জন্য খেলাধুলা অথবা অন্য কোনো বিনোদনের দরকার নাই? অবশ্যই আছে। অথচ আমার মা-বাবা কখনোই এসব কথা বলে না। শুধু বলে পড়ো... পড়ো... পড়ো... আমার খুব ইচ্ছে করে শীত আসলে মা-বাবার সঙ্গে ‘র‌্যাকেট’ খেলতে। তারা খুব ভালো পারে। তারা কখনোই আমাকে খেলার কথা বলে না। আমি খেলতে চাইলে তারা রেগে যায়—কিসের খেলা? সারাক্ষণ তুমি পড়বে। তুমি যদি খেলে সময় নষ্ট করো তাহলে রেজাল্ট কিভাবে ভালো হবে? আমি যে ম্যাডামের কাছে পড়ি, তাকে যদি কখনোও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাই তাহলে তিনি রেগে যান। কেন এটা না কালকে আমি তোমাকে বুঝায় দিছি। আজ কেন বলতে পারছ না। মাথার মধ্যে কি আছে তোমার? বোঝ না কেন? আবার যখন বাবার কাছে জিজ্ঞেস করতে যাই, তখন বাবাও বলে, এটা তো তোমাকে আগেই বলে দিয়েছি। এখন পারো না কেন? মাথার মধ্যে কী আছে তোমার? তখন আমার খুবই খারাপ লাগে। কেন, ভুল তো মানুষের হতেই পারে। সব মাথা কি একই রকম? সবার ব্রেইন কি সমান... মা-বাবা কেন এমন করে? তবুও... আই লাভ মাই ফাদার অ্যান্ড মাদার! আমি তাদেরকে অনেক ভালোবাসি...’

ভিডিওতে মেয়েটির বক্তব্য এ রকমই। হাজার কমেন্টের ৯০ শতাংশই তার পক্ষে। অর্থাৎ মেয়েটির প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। তহুর হোসেন নামে একজন লিখেছেন, ‘কেঁদো না মামনি, তোমার কান্না আমাকে অনেক কাঁদিয়েছে। তোমার মতো আমার একটা মামনি থাকলে তোমার ন্যায্য অধিকারের মূল্য দিতাম। তোমার এ প্রতিবাদে অসচেতন শিক্ষক ও মা-বাবারা সচেতন হবে আশা করি।’ সুমি আফরোজ লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের বাচ্চাদের শৈশব নষ্ট করে ফেলছি। পড়াশোনার বাইরে ওরা শুধু জানে ভিডিও গেমস খেলতে। অনেক বাচ্চাকে যখন দেখি সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে রাতে বাসায় ফেরে তখন মায়া হয়। প্রকৃতির কাছ থেকে মানুষ যা শেখে তা বই পড়ে কখনো শেখা যায় না।’ এস এম মাসুদ লিখেছেন, ‘মা-বাবা, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রিয়তম সম্পর্ক। কী হবে ক্লাসে প্রথম হয়ে যদি সেই সন্তান মা-বাবাকে ঘৃণা করে! এই কোমলমতি বাচ্চাদের কেন আমরা স্বাধীনভাবে উড়তে দিই না? কেন আমরা সমাজের দৃষ্টিটাকেই বড় করে দেখি। মা-বাবাকে বলব, প্লিজ থামুন। সন্তানের সুন্দর শৈশব এভাবে হারাতে দেবেন না, প্লিজ...’ অন্যদিকে কাজী নয়ন মেয়েটির ভিডিও বার্তার সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘এই পাকনা মেয়ে তুমি বলছ ক্লাস ফোরে পড়! অথচ যেভাবে বড়দের মতো করে কথা বলছ, তাতে আমার ডাউট হচ্ছে, তুমি আরো উঁচু ক্লাসে পড়। তবে তোমার কথাগুলো ঠিক আছে...’ শাদাত হাসান প্রান্ত লিখেছেন, ‘এই বয়সেই মা-বাবার প্রতি এতটা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব। আরেকটু বড় হলে যে কী করবে আল্লাহ জানেন!’ এম আর মাসুদ লিখেছেন, ‘নির্বাক হয়ে গেলাম, একজন শিক্ষিকার সন্তান কেন এভাবে বেড়ে উঠবে! ওই শিক্ষিকা কিভাবে মেধাবী প্রজন্ম তৈরি করবেন?’

বুঝে উঠতে পারছি না কার পক্ষ নেব? তবে মেয়েটির প্রতি অনেক মায়া হচ্ছে। মেয়েটি ক্লাস ফোরে পড়ে কি পড়ে না, মেয়েটি পাকনা কি পাকনা না—এটা আমার কাছে মোটেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তার বক্তব্যকে। সে অবলীলায় অপ্রিয় কিছু সত্য প্রকাশ করেছে। আমরা স্বীকার করি বা না করি, শিশুদের ওপর এভাবেই পড়াশোনার চাপ বাড়ছে। ক্লাসের বইয়ের চাপে শিশুদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়ছে। ক্লাসের বইয়ের চাপে শিশুদের আনন্দময় শৈশব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশা করি, বিষয়টি সবাই গুরুত্ব সহকারে ভাববেন, প্লিজ...

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার


মন্তব্য