kalerkantho


ক্রেডিট কার্ডে স্বেচ্ছাচারিতা

মাহফুজুর রহমান

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ক্রেডিট কার্ডে স্বেচ্ছাচারিতা

অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড বিশ্বব্যাপী এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। দেশে বা বিদেশে, যেখানেই হোক না কেন, পকেটে একটা ক্রেডিট কার্ড থাকলে আর কোনো চিন্তা নেই। ঘুরে বেড়ানো আর শপিং করার ক্ষেত্রে কখনোই কার্ডধারীকে সমস্যায় পড়তে হয় না। কার্ডধারী ব্যক্তি মনের সুখে পরম আনন্দ নিয়ে বেড়ানো বা শপিংয়ের কাজটি সেরে আসতে পারেন।

কিছুদিন আগেও ক্রেডিট কার্ডের এমন রমরমা ব্যবসা ছিল না। তখন দেশের বাজারে ঢুকতে হলে পকেটে নগদ টাকা নিয়ে ঢুকতে হতো। আর বিদেশে যেতে হলে পকেটে রাখতে হতো আমেরিকান ডলার বা ট্রাভেলার্স চেক।

বাংলাদেশে প্রথম ক্রেডিট কার্ড চালু করে লঙ্কা-বাংলা ফিন্যান্স কম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কাছে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখা হলে তবেই ক্রেডিট কার্ড দেওয়া হতো। তখন দেশের ব্যবসায়ীরাও ক্রেডিট কার্ড দেখে অভ্যস্ত ছিলেন না। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কোনো পণ্য কিনতে হলে ৩ শতাংশ বেশি দাম দিতে হতো আর মালামালের সরবরাহ পাওয়ার জন্য তিন দিন অপেক্ষা করতে হতো। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের ওপর তখনো বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি।

বর্তমানে অবশ্য ক্রেডিট কার্ডের চেহারা পাল্টেছে। দেশে অনেক কম্পানি বিশেষ বিশেষ ক্রেডিট কার্ডধারীকে নানা রকম কমিশন দিয়ে থাকে। কোনো ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড সংগ্রহ করলে দেখা যাবে যে কার্ডের সঙ্গে বিশাল একটা তালিকা দিয়ে দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান বা ‘মার্চেন্ট’ কার্ডধারীকে বিভিন্ন হারে কমিশন দিয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো জানানো হয়, অমুক খাতে কমপক্ষে এত টাকা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করা হলে শতাংশ হারে কিছু টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কোনো পণ্য কেনা হলে বা কোনো সেবা গ্রহণ করা হলে ১৫ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়া যায় টাকা পরিশোধ করার জন্য। বিল দিবসের পরদিন যদি কেউ একটি পণ্য কেনে, তাহলে এর বিল হতে এক মাস লাগে। আর বিল হওয়ার পরও টাকা প্রদানের জন্য ১৫ দিন সময় পাওয়া যায়। আবার বিমানবন্দরে ক্রেডিট কার্ডধারীদের সঙ্গীসহ জামাই আদর করে খাওয়ানো হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, যেখানে ব্যাংক থেকে একটি টাকা কর্জ নিলে রাত পোহাতেই সুদ যোগ হয়ে যায়, সেখানে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় করা হলে ক্যাশব্যাক পর্যন্ত করা হয়। বিমানবন্দরে খাওয়ানো হয়। এত ভালোবাসার পেছনে কারণ কী? কারণ হচ্ছে, ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় করা টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কাবুলিওয়ালাদের মতো আচরণ করে সুদ ও সার্ভিস চার্জ হিসেবে অনেক টাকা আদায়ের সুযোগ রয়েছে। ক্রেডিট কার্ডে বিলে লিখে দেওয়া হয় যে পুরো টাকা না দিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ টাকা দিলেও চলবে। গ্রাহকরা এটা দেখে খুশি হয়ে যান। ক্রেডিট কার্ডের বিলের মাত্র ১০ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে অনেকেই মহাসুখে ঘুরে বেড়ান। ব্যাংকের দৃষ্টিতে তাঁরাই হলেন সবচেয়ে ভালো গ্রাহক। ক্রেডিট কার্ডের এই ঋণের ওপর ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করা হয়। গ্রাহককে এই তথ্য কখনোই জানতে দেওয়া হয় না। ব্যাংকাররা সব সময় বলে থাকেন যে ক্রেডিট কার্ডে আরোপিত সুদের হার হলো আড়াই থেকে তিন পার্সেন্ট। কিন্তু এই সুদের হার যে মাসিক, এটা বলা হয় না। আবার প্রতি মাসেই এই ঋণ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে যায়। এখানেই শেষ নয়। যদি কোনো গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের ভেতর বিলের ৯০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করে দেন, তবু পরের মাসে পুরো টাকার ওপর পুরো মাসের জন্য সুদ আরোপ করা হবে। এ ছাড়া সার্ভিস চার্জ, নবায়ন ফি, পেনাল্টি চার্জ—এগুলো তো আছেই। আমার এক বন্ধু একবার মাত্র ৫ পয়সা বিল কম দিয়েছিলেন। সে জন্য পরের মাসে তাঁকে জরিমানা গুনতে হয়েছিল ৫০০ টাকা। কারণ ব্যাংকটির জরিমানা আদায়ের ন্যূনতম পরিমাণ ছিল ৫০০ টাকা।

ক্রেডিট কার্ড নিয়ে অনেকেই বিদেশে বেড়াতে গিয়ে মনের সুখে খরচ করেন। এসব ক্ষেত্রেও ব্যাংকের চার্জ হয় বহুমুখী। কোনোটা দেখা যায়, কোনোটা দেখা যায় না। কোনো গ্রাহক যদি বিদেশে গিয়ে কেনাকাটা করে সমপরিমাণ টাকায় বিল পরিশোধ করতে চান, তাহলে ক্রেডিট কার্ড কাজ করবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের লাভের পরিমাণ কমে আসে। বিদেশি মুদ্রায় কার্ড চার্জ করা হলে দুইবার বৈদেশিক মুদ্রাকে কনভার্ট করতে গিয়ে শুভংকরের ফাঁকিতে ফেলে বেশ লাভ করা যায়। ধরা যাক, একজন গ্রাহক ভিয়েতনামে গেলেন। সেখানে যদি ভিয়েতনামি মুদ্রা ডংয়ে কেনাকাটা করে চলতি বিনিময় হার অনুসারে বাংলাদেশি টাকা নির্ধারণ করে কার্ড চার্জ করা হয়, তাহলে কার্ডটি অকার্যকর থাকবে। তবে ডংয়ে চার্জ করা হলে মূল্য পরিশোধ করা যাবে। এখন ব্যাংক বিল করার সময় এই ডংয়ের বিলটি প্রথমে মার্কিন ডলারে কনভার্ট করবে। এরপর আবার মার্কিন ডলারকে টাকায় কনভার্ট করা হবে। দুইবারই সর্বোচ্চ হার ব্যবহার করায় গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অর্থাৎ তাঁকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বিল আদায়ের ক্ষেত্রে আবারও সেই ১০ শতাংশ পরিশোধের আহ্বান তো থাকছেই। পুরো বিল পরিশোধ না করা হলে যে বার্ষিক হারের বিবেচনায় ৩০ বা ৩৬ শতাংশ হারে পুরো মাসের সুদ আদায় করা হবে, সে কথা ঘুণাক্ষরেও গ্রাহককে জানানো হয় না। ফলে গ্রাহক বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ঢিলে মেজাজে থাকেন এবং সহজ কিস্তি ভেবে কম টাকা পরিশোধ করতে আগ্রহী থাকেন। এভাবে তিনি নিয়মিতই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন।

এবার ব্যয়সীমা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। বার্ষিক ভ্রমণ কোটাও বাংলাদেশ ব্যাংকই নির্ধারণ করে থাকে। বর্তমানে সার্কভুক্ত দেশগুলো এবং মিয়ানমার ভ্রমণ করার জন্য এক পঞ্জিকাবর্ষে এক বা একাধিকবার ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়া যায়। আবার এই দেশগুলোর বাইরে অন্য যেকোনো দেশে বা দেশগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এক পঞ্জিকাবর্ষে এক বা একাধিকবারে সর্বোচ্চ সাত হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়া যায়। অর্থাৎ বছরে বিদেশ ভ্রমণের কোটা হলো ১২ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অন্য বৈদেশিক মুদ্রা। ব্যাংক বছরের শুরুতে গ্রাহকের পাসপোর্টে এই ভ্রমণ কোটার সমপরিমাণ বা এর অংশবিশেষ বিদেশে ব্যয় করার জন্য এনডোর্স করে দেয়। কখনো কখনো ব্যস্ততার অজুহাতে কাস্টমার এই এনডোর্সমেন্ট নিতে পারেন না। একজন ব্যস্ত গ্রাহক যদি ১০টি ব্যাংক থেকে ১০টি ক্রেডিট কার্ড সংগ্রহ করেন, তাহলে বিদেশে গিয়ে তিনি অনায়াসে এক লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করতে পারবেন। এটা যাচাই করার কোনো প্রক্রিয়া দেশে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। আবার একটি কার্ডে যদি সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত ব্যয় করার পর বাংলাদেশে এই টাকা স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করে দেওয়া হয়, তাহলেও তিনি আবার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এক পঞ্জিকাবর্ষের ভেতরই খরচ করতে পারবেন। এই বিষয়ও লক্ষ করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ মনে হয় এ দেশে নেই।

ক্রেডিট কার্ড নিঃসন্দেহে একটি অতি জনপ্রিয় এবং প্রয়োজনীয় লেনদেন মাধ্যম। কিন্তু এই কার্ড নিয়ে যেভাবে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, তাতে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ থেকে ব্যাংকগুলোকে নিবৃত্ত করা দরকার। একই সঙ্গে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বা অন্য কোনো পন্থায় গ্রাহকদের তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অবহিত করা দরকার। অন্যথায় ক্রেডিট কার্ড দিনে দিনে হয়ে উঠবে এক আত্মঘাতী হাতিয়ার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককেই বিষয়গুলো দেখতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

itismahfuz@gmail.com


মন্তব্য