kalerkantho


এক বছরে বিশ্বব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছেন ট্রাম্প

গাজীউল হাসান খান

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক বছরে বিশ্বব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০ জানুয়ারি ২০১৮। এই এক বছরে নতুন করে আমেরিকাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোর ট্রাম্পের কৌশল দেশটিকে বরং ক্রমে ক্রমে একঘরে করে ফেলেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি কিংবা বিশ্বায়নের ধ্যান-ধারণায় এরই মধ্যে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ট্রাম্পশাসিত আমেরিকা। বিশেষজ্ঞ কিংবা তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, একবিংশ শতাব্দীর এ পর্যায়ে কোনো রাষ্ট্রই অগ্রাধিকারভিত্তিক বৈশ্বিক বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার অর্থ হবে সমস্যাসংকুল এ পৃথিবীকে আরো বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া। বিশ্ববাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা পরিবেশ ও প্রকৃতি থেকে সুবিধাবাদী মনোভাব নিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার অর্থ হবে নিজেদের জন্য সমূহ বিপদ ডেকে আনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যেমন আবার নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, তেমনি নতুন পরিস্থিতিতে পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রও একটি বিশ্বব্যবস্থায় আসতে বাধ্য হয়েছে।

গত পঞ্চাশের দশকের সূচনায় কোরিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক বিশ্বে যে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়েছিল, তাতে বিশ্ব মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তখন তথাকথিত মুক্তবিশ্বের নেতৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছিল পুঁজিবাদী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। তারা তখন বিভিন্ন সংগত কারণেই আমেরিকাকে বিশ্বের এক নম্বর শক্তি বা দেশ হিসেবে বিবেচনা করত। এরপর নব্বইয়ের দশকের সূচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে দুই বিশ্বের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসান ঘটে। বিশ্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। রিগ্যান-থেচার-গর্বাচেভের সম্মিলিত উদ্যোগে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে বিভিন্ন সামরিক সংকটের অবসান ঘটে। অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আসে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউটিও) গঠন। বিশ্ববাজার বা মুক্ত অর্থনীতি সচল করার ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি বিশেষ উদ্যোগ। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান থেকে বুশ (পিতা ও পুত্র) এবং বারাক ওবামা পর্যন্ত সে ব্যবস্থার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মুক্তবাজার বা বাণিজ্যের সাফল্য বিবেচনা করার আগে অন্তত একটি কথা স্বীকার করতে হবে যে এ ব্যবস্থায় পৌঁছতে বহু বছর ধরে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এতে দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে চীনসহ বহু উন্নয়নশীল দেশও উপকৃত হয়েছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা কিংবা এমনকি পদ্ধতিগতভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতিকে বরদাশত করতে রাজি নন। তাঁর মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বা বহিরাগমন নীতিসহ সাবেক সরকারগুলোর গৃহীত কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণযোগ্য নয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ব’ বা ‘আমেরিকা নম্বর ওয়ান’ বলতে ট্রাম্প বোঝেন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গদের স্বার্থ। ‘শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদে’ বিশ্বাসী বর্ণবাদী ও বিকারগ্রস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শ্বেতাঙ্গ এবং তারা গ্রামীণ সমাজে বসবাস করে। তারাই হচ্ছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র বা আধার। সেসব মানুষের বেশির ভাগই অল্প শিক্ষিত। শ্বেতাঙ্গ হওয়ার কারণে তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিশেষ সুবিধা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে তাদের সব চাকরিবাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে অশ্বেতাঙ্গ মানুষেরা। গ্রামীণ অল্প শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ মানুষের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পও মনে করেন অশ্বেতাঙ্গদের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রে আসছে মেক্সিকানদের মতো অবৈধভাবে। তারা সরকারের প্রদত্ত সব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাও তেমনি অবৈধভাবেই ভোগ করছে। ট্রাম্প প্রথাগত রাজনীতি থেকে আসেননি। তাঁর যেমন নেই কোনো প্রশাসনিক পূর্ব অভিজ্ঞতা, তেমনি নেই কোনো উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত দর্শন। সমালোচকদের মতে, তাঁর অর্থবিত্ত যা-ই আছে, সেগুলো সবই প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু ট্রাম্পের আর কিছু না থাকুক, আছে গোঁয়ার্তুমি ও সব কিছু অগ্রাহ্য করার স্পর্ধা। অনেকের মতে, তিনি নিজেকে সবজান্তা ভাবেন এবং অর্থ গরিমায় কাউকেই পাত্তা দিতে চান না। তদুপরি তাঁর জীবনে রয়েছে অসংখ্য নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা এবং বিভিন্ন মানসিক বিকারগ্রস্ততা। এ অভিযোগ গণমাধ্যমসহ তাঁর বিভিন্ন ঘনিষ্ঠজনের। সে কারণেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মানসিক দিক থেকে উপযোগী নন বলে উল্লেখ করেছিলেন। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন মনোবিজ্ঞানীও ট্রাম্প সম্পর্কে একই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। ক্ষমতায় ট্রাম্পের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এখনো আবার গণমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য বা অবস্থা নিয়ে একই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এর জবাবে বিভিন্ন টুইট বার্তায় ট্রাম্প নিজেই আবার নিজেকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও স্মার্ট বলে উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টকে নিয়ে নিজ দেশে কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এত হৈচৈ কখনো হয়নি। ক্ষমতায় আসার আগে অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় থেকেই তাঁর পক্ষে রাশিয়ার সাইবার কারসাজি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে সাক্ষাতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ সাইবার হস্তক্ষেপ সম্পর্কে অভিযোগ করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে কাজ করেছে রুশ বাহিনী। তা ছাড়া প্রচারাভিযানের সময় এবং নির্বাচনের পর গোপনে রুশ কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ট্রাম্পের জামাতা ও পুত্র। এবং এমনকি নির্বাচনের পরও ট্রাম্পের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা সাবেক জেনারেল মাইকেল ফ্লিন গোপনে রাশিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে শপথ নিয়ে মিথ্যা কথা বলার কারণে শেষ পর্যন্ত অবশ্য ফ্লিনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার সত্যি কোনো যোগসাজশ ছিল কি না, তা নিয়ে এখন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সাবেক পরিচালক রবার্ট মুলারের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এ তদন্তে ট্রাম্পের নির্বাচনের সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলে ক্ষমতায় থাকা দুষ্কর হবে তাঁর পক্ষে। তা ছাড়া একই অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। তবে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তাদের অভিযোগ বাতিল করে দিয়েছেন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কুখ্যাত ‘ওয়াটার গেট’ তদন্তের মতো পরিসমাপ্তি ডেকে আনে কি না, তা নিয়ে অনেকেই এখনো শঙ্কিত। এর মধ্যে বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক মাইকেল উলফের প্রকাশিত বই ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্পস হোয়াইট হাউস’ বিরাট তোলপাড় সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী। উলফ বলেছেন, বইটিতে ট্রাম্প সম্পর্কে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ক্ষমতার অবসান ঘটতে পারে। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে থাকার যোগ্য নন—এটি এখন একটি জনরবে পরিণত হয়েছে। উলফ মনে করেন, বইটির কারণে ট্রাম্পের ‘বস্ত্রহরণ’ হয়েছে। ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে বইটিতে।

গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবিশেষের প্রশ্ন হচ্ছে—এ ব্যতিক্রমী প্রেসিডেন্ট মাত্র এক বছরের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যত বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন, তাতে ক্ষমতায় তাঁর বাদবাকি সময়টুকু কিভাবে পার হবে? সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অতীতে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থা কিংবা চুক্তিই তাঁর পছন্দ নয়। সম্ভব হলে ট্রাম্প ওবামার সব কিছু এক নিঃশ্বাসে মুছে দিতেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামার নামটি হোয়াইট হাউসের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে পারলে যেন শান্তি হতো। অনেকে মনে করে, ট্রাম্প শুধু একজন কট্টর জাতীয়তাবাদীই নন, তিনি বর্ণবাদীও। ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা তাঁকে করে তুলেছে অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ ও মুসলিমবিদ্বেষী। এ অভিযোগ অনেকের। কিন্তু এ অভিযোগ নিয়ে তো কোনো ব্যক্তি মুক্তবিশ্বের নেতৃত্ব দিতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বাইরে তিনি ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আর কিছু বুঝতে চান না। সে কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিবাদ ও বিতর্ক সৃষ্টি করা ছাড়া তিনি গত এক বছরে আর কিছুই করতে সক্ষম হননি। ক্ষমতায় এসেই তিনি তিন দিনের মাথায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২টি দেশের স্বাক্ষরিত ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিটিপি) চুক্তি বাতিল করে দিয়েছেন। স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার বিশেষ উদ্যোগে সে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। বিনা শুল্কে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রস্তাবিত সে বাণিজ্য চালু হলে তাতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছিলেন।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি কিংবা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে যেতে আগ্রহী। এতে তিনি প্রতিটি দেশের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারবেন। কারণ তাঁর মতে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ‘ডিল মেকার’। সে কারণে নর্থ আটলান্টিক ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টভুক্ত (নাফটা) প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে চলছে তাঁর ভয়ানক মতবিরোধ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ তৎপরতায় ২০১৫ সালে বিশ্বের ছয় শক্তি ও ইরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি ট্রাম্প একেবারেই মানেন না। তাঁর মতে, এমন বাজে চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর দুটি নেই। ইউরোপের সব স্বাক্ষরকারী দেশ সে চুক্তি মেনে নিলেও ট্রাম্প এর বিরোধিতা করেছেন। তিনি সে চুক্তিকে গ্রহণ করছেন না। ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সঙ্গে একাট্টা হয়ে তিনি চান সে চুক্তিতে আরো কঠিন শর্ত আরোপ করতে। নতুবা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপাতে তিনি বদ্ধপরিকর। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও চীনের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছিল প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সফল পরিণতিতে পৌঁছা। যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮৮টি দেশ সে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প চান সে চুক্তি নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা করে পরিবর্তন আনতে। কিন্তু এতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন, রাশিয়াসহ কেউ রাজি নয়। তারা বলেছে, এ চুক্তি পরিবর্তন করা যাবে না। তাই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এখন নতুনভাবে চিন্তা করছেন কিভাবে আবার চুক্তিটিতে ফিরে যাওয়া যায়। ক্ষমতায় এসেই এই মুসলিমবিদ্বেষী মানুষটি সাতটি মুসলিম দেশের জনগণের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরে আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও ইরাককে বাদ দিয়ে আবার ছয়টি দেশের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন রাজতন্ত্রের অধীন কোনো দেশ উচ্চবাচ্য করেনি। তারা বরং কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র কিনছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। তা ছাড়া সৌদি আরব তার নিরাপত্তা বিধানে নিয়োগ করেছে ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে। অন্যদিকে ইসরায়েলকে সন্তুষ্ট করতে ট্রাম্প স্বীকৃতি দিয়েছেন জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার দূতাবাস সরিয়ে নেবে যথাসময়ে। মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বের দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবারও ভেবে দেখেননি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের দীর্ঘ প্রায় সাত দশকের সংগ্রাম ও অধিকারের কথা।

গত বছরের বেশির ভাগ সময়টা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কেটেছে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনকে নিয়ে। বিশ্বের তথাকথিত ‘নম্বর ওয়ান’ দেশের প্রেসিডেন্টের অব্যাহত হুমকি-ধমকি উনকে দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। উত্তর কোরিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। উনের বিরুদ্ধে তর্জনগর্জন করতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেকে কৌতুকের বিষয়বস্তুতে রূপান্তর করেছিলেন। এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই তিনি শেষ পর্যন্ত ভর করেছিলেন চীনের রাষ্ট্রপ্রধান শি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাঁধে। সাফল্যজনকভাবে পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উন এখন কিছুটা রাজি হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে। এতে ট্রাম্পের বিশেষ কোনো কৃতিত্ব দেখা যায় না হুমকি-ধমকি ছাড়া। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেই (চীন ও রাশিয়াসহ) উত্তর কোরিয়ার তরুণ নেতা উন তাঁর পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে একটা সমাধানে আসতে পারেন বলে এখন মনে হচ্ছে। কাতার ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে ট্রাম্পের ভূমিকা একদেশদর্শিতা কিংবা জাজ্বল্যমানভাবে পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। তিনি মনে হয় ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের ‘সোল এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছেন—মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বদানকারী কোনো দেশের নেতা হিসেবে নয়। মীমাংসা কিংবা প্রকৃতপক্ষে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নয়।

আন্তর্জাতিক প্রায় সব ইস্যুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে ফেলেছেন। এটি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির কোনো সফল দিক হতে পারে না। মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম দিক হচ্ছে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা এবং মার্কিন প্রভাবকে সম্প্রসারণ করা। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের গৃহীত কৌশল আদৌ কোনো কৌশল নয় বলে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রটি বাদ দিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেও সর্বত্রই একই ব্যর্থতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে কৃষ্ণকায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যতই অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখুন না কেন, ওবামা গৃহীত কোনো নীতি বা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজের কোনো ধারার সূচনা করতে পারেননি। এমনকি ওবামাকেয়ার নামক স্বাস্থ্যসেবার কোনো বিকল্প তিনি এখনো চূড়ান্তভাবে কংগ্রেসের সিনেটে পাস করাতে পারেননি। তা ছাড়া প্রতিবেশী মেক্সিকো থেকে অবৈধভাবে মানুষ আসা বন্ধ করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমান্তে যে সুউচ্চ প্রাচীর নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে দেশের বর্ণবাদী বা এক শ্রেণির শ্বেতাঙ্গের বাহবা কুড়িয়েছিলেন, তা-ও এখন আটকে রয়েছে। ট্রাম্প বলেছিলেন প্রাচীর নির্মাণের অর্থ দেবে মেক্সিকো। কিন্তু মেক্সিকো বলছে, এ ব্যাপারে অর্থ জোগান দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ ব্যাপারে ট্রাম্প এখন কংগ্রেসের কাছে দেড় শ কোটি ডলার চেয়েছেন। কিন্তু তিনি কখন ও কিভাবে তা পাবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দেশের জনসাধারণ কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয়কর কমানো ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প-কারখানা দেশে ফিরিয়ে আনার ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এবং শেয়ারবাজারে এখন কিছুটা চাঙ্গা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু ধনিক শ্রেণির জন্য বিশেষভাবে আয়কর কমানোর কারণে দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বাজেট ঘাটতি অনেক বেড়ে যেতে পারে। আগামী দু-এক বছরের মধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে তত দিন ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী বিরাট বিতর্ক রয়েছে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসন প্রস্তাব আসতে পারে। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য ও নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ যদি প্রমাণ করে যে নির্বাচনে জালিয়াতি বা কারচুপি হয়েছে, তাহলে ট্রাম্পের রাজত্ব শেষ হতে সময় লাগবে না। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যদি সত্যিকার অর্থে কোনো বাধা সৃষ্টি করে থাকেন কিংবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তবে তা আইনত হবে এক বিশাল অপরাধ। সে অপরাধে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিক্সনের মতো এ ব্যতিক্রমী প্রেসিডেন্টকেও বিদায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কিংবা বিভিন্ন ইস্যুতে অসহযোগিতা করা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে ফেলার জন্য ট্রাম্প ব্যতিক্রমী হয়েছেন। কিন্তু এতে তিনি কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ভয়ানক ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি করেছেন। ট্রাম্প যতই বলুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বে আবার নাম্বার ওয়ান বানাবেন, আসলে প্রকৃত অর্থে তিনি ক্রমে ক্রমে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে ততই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক মিনিস্টার (প্রেস ও তথ্য)

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য