kalerkantho


তহবিল সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে তত ক্ষতি

প্যাট্রিসিয়া কোহেন ও জিম ট্যাংকারসলি

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নিঃস্বতার প্রাথমিক ধাপে দেশের অর্থনীতি যে থমকে দাঁড়াবে, তা নয়। কোনো কর্মচারীই পে চেক থেকে বঞ্চিত হবে না। তবে উইকএন্ডে সমস্যাটি দেখা দেওয়ার কারণে কিছু ব্যবসায়িক-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিছু গ্রাহক বা ক্রেতা হারাতে পারে, সরবরাহেও কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে তারা। তবে এ সমস্যা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। সরকারের তহবিল সংকট (শাটডাউন) যত দীর্ঘায়িত হবে অর্থনীতির ওপর তত বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাময়িকভাবে হলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারা থমকে দাঁড়ানোর আশঙ্কাই বেশি।

তহবিল সংকটে সরকার আংশিকভাবে হলেও স্থবির হয়ে পড়ে। তবু জরুরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা কাজ চালিয়ে যাবে; অনেক ধরনের পরিষেবাও অব্যাহত থাকবে। সাময়িক স্থবিরতায় উৎপাদন সময়ের বা কর্ম সময়ের অপচয় হয়। অভিজ্ঞতা বলে, এ কারণে পার্ক বা মিউজিয়াম থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ফি সংগ্রহ করার বিষয়েও প্রভাব পড়ে। সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি কম্পানিগুলোর কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া ভ্রমণব্যয় সংকুচিত হয়। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকার কন্ট্রাক্টরদের বিল দিতে দেরি করলে বাড়তি সুদ গুনতে হয়। ফেডারেল চেক ও লাইসেন্স পারমিট ইস্যুতে দেরি হলে অর্থনীতির সচলতা, আমদানি-রপ্তানি, মর্টগেজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক ঋণপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা দেয়। সরকারের তহবিল সংকটের কারণে গোটা অর্থনীতির ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভোক্তার মানসিকতা ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফেডারেল এজেন্সিগুলোর ডাটা সরবরাহেও ভাটার টান পড়তে পারে। এসব ডাটার ওপর ভর করেই ব্যবসায়ীরা দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। সংকট কেটে গেলে অর্থনীতি দ্রুত সচল হয় বটে, তবে এরই মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে বেশ ক্ষতি হয়ে যায়।

২০১৩ সালে ১৬ দিনের জন্য তহবিল সংকটে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার। সিকিউরিটিজ রেটিং ফার্ম মুডির হিসাব মতে, এর ফলে চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার (বার্ষিক হারের নিরিখে) ০.৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল; উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ ছিল দুই হাজার কোটি ডলার। ওই সংকটের চরম দশায় সাড়ে আট লাখ ফেডারেল কর্মচারীকে বসিয়ে রাখতে হয়েছিল। এতে ৬৬ লাখ কর্মদিবসের অপচয় হয়েছিল। কাজ না করলেও তাদের ২০০ কোটি ডলার বেতন বাবদ দিতে হয়েছে। বেসরকারি খাতের নিয়োগপ্রক্রিয়ায়ও ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিল—দুই সপ্তাহে এক লাখ ২০ হাজার কর্ম সৃজন করার কথা ছিল, সেটি সম্ভব হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল খুবই ধীরগতিতে। কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস প্রতিবেদন ২০১৪ অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি সপ্তাহে ০.১ শতাংশ বা তারও বেশি পরিমাণে কমেছিল। সরকারি কর্মচারীদের অবচয়িত কর্ম সময়ের কারণে প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি ০.৩ শতাংশ কমেছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা বলছেন, তহবিল সংকট অব্যাহত থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কর্মহীন থাকার কারণে সপ্তাহে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ হারে কমবে।

স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরের (এসঅ্যান্ডপি) অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তহবিল সংকট অব্যাহত থাকলে জাতীয় উৎপাদন সপ্তাহে কম করে হলেও ৬৫০ কোটি ডলার কমবে। এসঅ্যান্ডপির অর্থনীতিবিদ বেথ অ্যান বভিনোর বক্তব্য হলো, সরকারের তহবিল সংকট (শাটডাউন) শুধু ওয়াশিংটন ও তার কর্মচারীদের ওপরই প্রভাব ফেলবে না, সারা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও বিভিন্নভাবে প্রভাব পড়বে। শপিং মল, পার্ক, ঠিকাদার, হোটেল, রেস্তোরাঁ—সব কিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন, নিয়োজনপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা দেবে। তারা ঝুঁকি বোধ করছে, কর্মসংস্থান পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কথা ভাবতে হচ্ছে তাদের। ওয়াল স্ট্রিটের জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে প্রায় মাসব্যাপী তহবিল সংকটে পড়েছিল ফেডারেল সরকার। স্টক মার্কেটে ৫ শতাংশ দরপতন ঘটেছিল। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ন্যান্সি ভানডেন হোটেনের মতে, স্বল্প মেয়াদে তহবিল সংকটে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে এ সংকট যত বেশি দীর্ঘায়িত হবে আর্থিক বাজারের তত বেশি ক্ষতি হবে। সাম্প্রতিক চাঙ্গাভাবের পরও স্টক মার্কেট কিছু ঝুঁকিতে পড়বে। এখন পর্যন্ত স্টক মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। সংকট শুরু হওয়ার পর গত শনিবারেও স্টক মার্কেটে ঊর্ধ্বগতি ছিল। তবে পুঁজিবাজারের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের কারণে সরকারের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি যথাসময়ে মোকাবেলা করার জন্য ঋণসীমা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়বে না—এ বিশ্বাস ট্রেডারদের পেয়ে বসতে পারে। আশঙ্কার বিষয়টি সেখানেই।

মর্গান স্ট্যানলির পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের তহবিল সংকটের কারণে কিছু খাতে পেমেন্টে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ঋণসীমার কারণে ট্রেজারি খেলাপি হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি মার্কেট এবং অন্যান্য ম্যাক্রো মার্কেটের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

 

লেখক : দুজনই নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে যুক্ত

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস (অনলাইন সংস্করণ)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক


মন্তব্য