kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

ইতিহাসের রসিকতা প্রিজন প্যালেসের দুই অতিথি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইতিহাসের রসিকতা প্রিজন প্যালেসের দুই অতিথি

অনেকেই বলেন, ইতিহাস মহাকালের নির্মম বিচারক। তার আদালতের কাঠগড়ায় জয়ী-পরাজয়ী কারো না দাঁড়িয়ে উপায় নেই। কিন্তু মহাকালের এই নির্মম বিচারক ইতিহাসের কি কোনো রসবোধ নেই? আমি প্রশ্নটার জবাব খুঁজেছি। যে জবাব পেয়েছি, তাতে মনে হয়, এই ইতিহাস-দেবতার মনেও চমৎকার রসবোধ আছে। সবার চোখে হয়তো ধরা পড়ে না। কিন্তু প্রকৃত রসিকজনের চোখে তা ঠিক ধরা পড়ে।

ইতিহাসের রসিকতাটা একটু প্রতিশোধমূলক। আজ যিনি ক্ষমতার দম্ভে বলীয়ান হয়ে প্রতিপক্ষকে অপদস্ত করছেন, কয়েক দিন পর দেখা গেল তিনি তার কাছে নতশির। অথবা তার ভাগ্য বরণ করেছেন। ইতিহাসের এই সূক্ষ্ম রসিকতা অনেককে হাসায় না। বরং ভাবায়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জেলগমন এবং তা নিয়ে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির এক নেতার মন্তব্য (জেনারেলের মন্তব্য এখনো জানতে পারিনি) শুনে ইতিহাসের এই রসবোধের কথা মনে পড়ল। জাতীয় পার্টির নেতাও রসিকতা করে বলেছেন, ‘এরশাদ সাহেব ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের জেলখানার ভেতরে যে কুলগাছটি লাগিয়ে এসেছেন, তাতে এখন কুল ধরেছে। তা খালেদা জিয়া খেতে পারবেন।’

জাতীয় পার্টির নেতা এটা রসিকতা করে বলেছেন। কিন্তু আমি রসিকতা করে বিষয়টি নিয়ে লিখছি না। কারণ খালেদা জিয়ার জেলগমনে আমি সত্যই দুঃখ বোধ করি। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীর এই পরিণতি আশা করিনি। আমি বিষয়টি নিয়ে লিখছি ইতিহাসের রসবোধ ও শোধবোধের বিস্ময়কর ঘটনার পারম্পর্য পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য। খালেদা-এরশাদ কাহিনি লেখার আগে একটি বিদেশি কাহিনি লিখতে চাই।

প্রথম মহাযুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কাছে জার্মানির পরাজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধরত জার্মান সেনাপতি ফরাসি সেনাপতির কাছে আত্মসমর্পণের দ্বারা যুদ্ধবিরতি ঘটানোর আবেদন জানান। ফরাসি সেনাপতি নির্দেশ দেন, আত্মসমর্পণের জন্য জার্মান সৈন্যরা যেন রাইন নদীর তীরে জমায়েত হয়। নির্দেশ মোতাবেক জার্মান সৈন্যরা তাদের সেনাপতির অধীনে রাইন নদীর তীরে এক ময়দানে সমবেত হয়। তাদের দেখে ফরাসি সেনাপতি ঠাট্টা করে বলেন, ‘আমরা তো ভালোই যুদ্ধ করছিলাম। হঠাৎ লজ্জাকর আত্মসমর্পণ দ্বারা আপনারা যুদ্ধবিরতি ঘটাতে চান কেন?’ জার্মান সেনাপতি বললেন, ‘আমরা বড় ক্লান্ত, আর যুদ্ধ চালাতে পারছি না।’ এ রকম হাস্য-পরিহাসের মধ্যে জার্মান সৈন্যরা ফরাসিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

এ সময় হিটলার ছিলেন আত্মসমর্পণকারী জার্মান সেনাবাহিনীতে একজন করপোরাল। তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, সেদিনই তিনি দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন—এর প্রতিশোধ তিনি নেবেনই। এরপর ২০ বছর পার হয়ে গেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এবারও জার্মানির মূল প্রতিপক্ষ ব্রিটেন ও ফ্রান্স। হিটলার তখন জার্মানিতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এবার জার্মানির কাছে ফ্রান্স পরাজিত। হিটলার নির্দেশ দিলেন, সেই রাইন নদীর তীরে পুরনো মাঠে এসে ফরাসি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে হবে। তাঁর নির্দেশ  পালিত হলো। ফরাসি সেনাপতিকে জার্মান সেনাপতি পরিহাস করে বললেন, ‘যুদ্ধ তো ভালোই চলছিল। আপনারা হঠাৎ আত্মসমর্পণ করতে চাইছেন কেন?’ ফরাসি সেনাপতি বললেন, ‘আমাদের আর যুদ্ধ করার শক্তি নেই। আপনারা আমাদের দুর্ভেদ্য ম্যাজিনো লাইনও ভেঙে ফেলেছেন। দয়া করে আমাদের আত্মসমর্পণ করতে দিন।’ জার্মানদের হাসিঠাট্টা ও রসিকতা সহ্য করে সেদিন ফরাসিদের জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। ইতিহাসে জয়ী ও পরাজিতের মধ্যে এ ধরনের শোধবোধের কাহিনি প্রচুর আছে। তার একটি মাত্র আজ এখানে উল্লেখ করলাম।

এবার বাংলাদেশে ফিরে আসি। ১৯৯০ সাল। টানা ১০ বছর স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে দেশ পরিচালনার পর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে জেনারেল এরশাদের পতন ঘটে। আন্দোলনে জয়ী দুই নেত্রী—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। দুই নেত্রীর দুই ইচ্ছা। শেখ হাসিনা চেয়েছেন স্বৈরাচারী শাসনের অবসান। এরশাদের হাতে নির্যাতিত হয়েও তাঁর ওপর কোনো ব্যক্তিগত রাগ ছিল না। কিন্তু খালেদা জিয়া এরশাদের পতন কামনা ছাড়াও তাঁকে কঠিন শাস্তি দিতে চেয়েছেন। কারণ তাঁর ওপর বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত রাগ ছিল। তাঁর দলেরই অনেকে বলেন, বেগম জিয়া তাঁর স্বামী জেনারেল জিয়াউর রহমানকে হত্যার পেছনে জেনারেল এরশাদের যোগসাজশ ছিল বলে মনে করেন।

প্রচণ্ড গণ-অভ্যুত্থানের মুখেও জেনারেল এরশাদ দেশ ছেড়ে পালাননি। আত্মগোপন করেননি। সহিংস পন্থায় গণ-আন্দোলন দমন করতে না পেরে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। খালেদা জিয়া তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এরশাদ সাহেবকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবি জানান। অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এ ব্যাপারে একটু দোমনা ছিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বেগম জিয়ার চাপাচাপিতে তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়।

তার পরও বেগম জিয়া তাঁকে জেলে নেওয়ার জন্য প্রতিদিন সভা-সমিতিতে দাবি জানাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরশাদ সাহেবের কপাল ভালো। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি জেলে ডিভিশন পান। তার পরও জেলের ভেতরে তাঁর ঘরটিতে এয়ার কন্ডিশনার বসানো হয়। টেলিভিশন বসানো হয়। তাঁর বিশেষ খাবার তৈরি করার জন্য পাচক নিযুক্ত হয়। অর্থাৎ ঢাকার জেলখানা এরশাদ সাহেবের জন্য প্রিজন প্যালেসে পরিণত হয়। এই প্রিজন প্যালেসে তিনি ছয় বছর কাটিয়েছেন।

ভাগ্যের কী পরিহাস, মাত্র ২৮ বছরের মাথায় বেগম জিয়া ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের সেই একই জেলখানায় বন্দি হয়েছেন। জেলে ডিভিশন পেতে তাঁর দুই দিন দেরি হয়েছে। তবে পেয়েছেন। তাঁকে একজন মেইডও নাকি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে এরশাদ সাহেবের ব্যবহৃত কক্ষেই রাখা হয়েছে কি না জানি না। তবে এটুকু জেনেছি, তাঁকেও এয়ার কন্ডিশনার ও টেলিভিশনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। এরশাদ সাহেব শাসক হিসেবে স্বৈরাচারী ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে নিপাট ভদ্র মানুষ। নইলে বেগম জিয়ার এই ভাগ্য বিড়ম্বনা নিয়ে হয়তো সরস মন্তব্য করতে পারতেন। এখনো তিনি তা করেছেন বলে জানি না।

ইতিহাসের এই রসিকতা ও শোধবোধের খেলা নিয়ে অতীতের একটি কাহিনি মনে পড়ল। পাঠকদের সে কাহিনিও উপহার দিতে চাই। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব-মোনেমি জমানায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় এই নাজিমুদ্দীন রোডের জেলখানাতেই আটক করা হয়েছিল। এরশাদ সাহেব বা বেগম জিয়ার মতো আরাম-আয়েশে বঙ্গবন্ধুকে জেলে রাখা হয়নি। তাঁকে জেলের পাগলাগারদের পাশে একটি নির্জন সেলে আটক রাখা হয়েছিল। গভর্নর মোনেম খানের ইচ্ছা ছিল তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলা। সারা রাত পাগলদের মারামারি ও হৈচৈয়ে বঙ্গবন্ধু ঘুমাতে পারতেন না।

এ সময় একদিন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকার জেলখানা পরিদর্শনে আসেন। তিনি তখন আইয়ুব খানের পুতুল পার্লামেন্টের স্পিকার। কৈশোরকাল থেকে তাঁদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। দুজনেই কলকাতায় লেখাপড়া করতেন। রাজনৈতিক জীবনে দুজনের মত ও পথ ভিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ন ছিল। জেলখানা পরিদর্শনকালে ফজলুল কাদের চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যান তাঁর নির্জন সেলে। কুশলাদি বিনিময়ের পর বঙ্গবন্ধু (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু হননি) হঠাৎ ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বললেন, ‘ভাই সাহেব, একটা অনুরোধ। জেলখানার অবস্থার একটু উন্নতি করুন। আমার কথা বাদ দিন, বিনা বিচারে আটক রাজবন্দিদেরও আপনারা যে অবস্থায় জেলে রেখেছেন, তা মানবতার অবমাননা। দয়া করে এর একটা বিহিত করুন। নইলে আজ আমরা জেলে আছি। কাল ভাগ্যের দোষে আপনারা থাকতে পারেন। তখন পস্তাবেন।’

ফজলুল কাদের চৌধুরী সেদিন এ কথার কোনো জবাব দেননি। এর মাত্র চার কি পাঁচ বছর পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর হিসেবে যখন ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকা জেলে বন্দি, তখন জেলের সেই অব্যবস্থার মধ্যে বাস করতে গিয়ে তিনি নাকি তাঁর পুত্র-পরিজনের কাছে বলেছিলেন, ‘মুজিবের কথায় সেদিন কান দিইনি। আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করছি।’ ঢাকা জেলের ভেতরেই বিভিন্ন রোগে জর্জরিত ফজলুল কাদের চৌধুরীর মৃত্যু হয়েছিল।

আমি খালেদা জিয়ার জেলগমন নিয়ে লঘু-গুরু কোনো কৌতুক করারই ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি না। বরং কামনা করি, তাঁর সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হলে তিনি যেন শিগগিরই জামিন পান এবং আটক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আগামী নির্বাচনে তাঁর দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। তাঁর দল যেন নির্বাচনে অংশ নেয় এবং দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। তবু তাঁকে ও এরশাদ সাহেবকে নিয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসের এই গল্পটা লিখলাম এ জন্য যে ইতিহাসকে আমরা শুষ্কঠং কাষ্ঠং মনে করি। কিন্তু ইতিহাসেরও রসজ্ঞান আছে এবং তার শোধবোধের ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ।

সবশেষে একটি কথা। এরশাদ সাহেবের নানা দোষ। তাঁর বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ। কিন্তু একটি কারণে সম্ভবত এরশাদ সাহেবের কাছে বিএনপি নেতাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এই কারণটি হলো, এরশাদ সাহেবের অছিলায় ঢাকার জেলখানাটি প্রিজন প্যালেসে পরিণত না হলে এখন সেখানে আতিথ্য নেওয়া খালেদা জিয়ার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হতো।

লন্ডন, রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮


মন্তব্য