kalerkantho


সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা ক্রমহ্রাসমান

বিধান চন্দ্র দাস

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা ক্রমহ্রাসমান

সুন্দরবনের আরেক নাম জোয়ার অরণ্য। সেই জোয়ার অরণ্যের বাস্তুতান্ত্রিক সেবাগুলোয় এখন ভাটার টান। শুরু হয়েছে বহুকাল আগে থেকেই। বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়, ‘বাস্তুতান্ত্রিক সেবা’ বলতে সাধারণভাবে একটি বাস্তুতন্ত্র থেকে আমরা যে উপকার বা সুবিধাগুলো পাই, তাকেই বোঝানো হয়। এই সেবাগুলোর অনেকই আমাদের কাছে দৃশ্যমান, যেমন—সুন্দরবন (ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র) থেকে প্রাপ্ত বনজদ্রব্য, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি। অনেকগুলো আবার আমাদের চোখের আড়ালে (কার্বন শোষণ, পানি ও মাটি বিশুদ্ধকরণ ইত্যাদি) সংঘটিত হয়। সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবাগুলো, বিশেষ করে প্রাপ্ত বনজ দ্রব্যগুলো বিগত কয়েক দশকে ক্রমাগত কমছে। বিগত শতকের চল্লিম-পঞ্চাশের দশকে আহরণের জন্য যে পরিমাণ মাছ, মধু, গোলপাতা পাওয়া যেত—এখন তা আর পাওয়া যায় না। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের সংখ্যা ও ঘনত্বও কমেছে। একসময় সুন্দরবনে হাতি, গণ্ডার, বাইসন, বুনো মোষ, বারসিংহা ও পারা হরিণ, শজারু, মিঠাপানির কুমির পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যায় না। কত যে অমেরুদণ্ডী প্রাণী সুন্দরবন থেকে বিদায় নিয়েছে, তার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই।

এ কথা ঠিক যে সুন্দরবনের এই অবস্থা একদিনে সংঘটিত হয়নি। প্রাচীন গঙ্গারিডি রাজ্যের অধীন এই বন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমির অবনমন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের অভিঘাতে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে। পাণিনি সূত্রের পতঞ্জলিকৃত ভাষ্যে প্রাচীন আর্যাবর্তের পূর্বসীমায় ‘কালকবন’কে অনেকে সুন্দরবন বলে চিহ্নিত করেছেন। পুঁড়া, চান্দাল, বাগদি প্রভৃতি সম্প্রদায় নিয়ে প্রাচীনকালে সুন্দরবনের মূলত প্রান্তসীমায় গড়ে ওঠা জনবসতির সঙ্গে সুন্দরবনের সম্পর্ক ছিল বাস্তুতান্ত্রিকভাবে ভারসাম্যময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভারসাম্যের অবনতি হতে শুরু করে। একসময় সুন্দরবনের মূল আয়তন ছিল ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। ত্রয়োদশ শতকে সুলতানি আমলে বহিরাগতদের এনে সুন্দরবন ধ্বংস করে কৃষিকাজের পত্তন হয়। তবে ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যে পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের সম্মিলিত অত্যাচারে (হত্যা, লুণ্ঠন, বিদেশে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি) সুন্দরবনসংলগ্ন অধিবাসীরা এই এলাকা ত্যাগ করার পর অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে সরকারি সহায়তায় সুন্দরবন ধ্বংস করার কাজ প্রবলভাবে শুরু হয়। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে (১৭৭০-৮৭) চব্বিশ পরগনা জেলার কালেক্টর ক্লড রাসেল ও যশোরের জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সুন্দরবনের সুপারিনটেনডেন্ট টিলম্যান হেংকেলের আগ্রহ ও তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন এলাকায় বন ধ্বংস করে আবাদি জমি বের করার কাজ তুঙ্গে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ এখানে চলে আসে। এই সময়ে (১৭৯৩) সুন্দরবন ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমে যায়। পরে ১৮৭৮ সালে বন আইনে সুন্দরবন সংরক্ষিত (বর্তমান ভারতীয় সুন্দরবন অংশ) ও মজুদ (বর্তমান বাংলাদেশ সুন্দরবন অংশ) ঘোষিত হওয়ায় সুন্দরবন ধ্বংস করে কৃষিজমি বের করার প্রবণতা হ্রাস পায়। তবে একেবারেই তা বন্ধ হয় না। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় (১৯৪৭) সুন্দরবনের মোট আয়তন দাঁড়ায় সাড়ে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো। বর্তমানে বাংলাদেশে ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এবং ভারতে চার হাজার ৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে সুন্দরবনের মোট আয়তন দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৮০ বর্গকিলোমিটার।

আমাদের সৌভাগ্য যে বিগত সত্তর বছরে (১৯৪৭-২০১৮) বাংলাদেশ সুন্দরবনের মোট আয়তন খুব একটা কমেনি। তবে সুন্দরবনের গুণগত কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আর এই পরিবর্তনের জন্য সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবায় টান পড়েছে। সুন্দরবনের গুণগত পরিবর্তনের জন্য যে কারণগুলো চিহ্নিত করা যায় সেগুলো হচ্ছে :

১. লবণাক্ততা বৃদ্ধি : ম্যানগ্রোভ বন গড়ে ওঠা ও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন মিষ্টি ও লবণ পানির নির্দিষ্ট মাত্রার মিশ্রণযুক্ত একটি পরিবেশ। শুধু মিষ্টি পানিতে যেমন ম্যানগ্রোভ বন গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি শুধু সমুদ্রের পানিতেও ম্যানগ্রোভ বন হয় না। লবণাক্ততার ওপর ভিত্তি করে সুন্দরবনের মধ্যে তিন ধরনের অঞ্চল, যথা—‘অত্যল্পলোনা’ (০.০৫-০.৫ শতাংশ, অলিগোহ্যালাইন), ‘স্বল্পলোনা’ (০.৫১-১.৮ শতাংশ, মেছোহ্যালাইন) ও  ‘অধিক লোনা’ (১.৮১-৩.০০ শতাংশ  পলিহ্যালাইন) থাকার কথা। সমুদ্রের অত্যধিক  লোনা পানি ও উজান থেকে নেমে আসা মিষ্টি পানির মিশ্রণে তৈরি হয় এই তিন অঞ্চল। ‘অত্যল্পলোনা’ ও ‘স্বল্পলোনা’ অঞ্চল তৈরির জন্য উজান থেকে শুষ্ক মৌসুমে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ কিউবিক মিটার মিষ্টি পানি আসার প্রয়োজন। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে এই পরিমাণ পানি না আসার কারণে সুন্দরবনের ‘অধিকলোনা’ অঞ্চলের আয়তন বেড়ে গেছে। ফলে ‘অত্যল্পলোনা’ ও ‘স্বল্পলোনা’ অঞ্চলে অভ্যস্ত গাছগুলো (সুন্দরী, গোলপাতা, পশুর ইত্যাদি) শারীরবৃত্তীয় কাজ ঠিকমতো করতে না পারায় তাদের নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। তাদের বৃদ্ধি ও জন্মানো ব্যাহত হচ্ছে, রোগাক্রান্ত হচ্ছে এবং ঘনত্বও কমে আসছে। সুন্দরবনের প্রাণিকুলের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে।

২. দূষণ : শিল্প-কলকারখানা, কৃষি, গৃহস্থালি ও নগরকেন্দ্রিক বর্জ্য থেকে শুরু করে নৌযানের তেল ও তেলজাতীয় পদার্থসহ নানা ধরনের দূষক প্রধানত নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনের পরিবেশ দূষিত করছে। মাঝে মাঝে ট্যাংকার দুর্ঘটনায় নদীতে তেল বা কয়লা পড়েও সুন্দরবনের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতু ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিসা ইত্যাদি ক্ষতিকর মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ সুন্দরবনের নদীর পানি চরে পাওয়া গেছে। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও আলোক, শব্দ ও বর্জ্য দূষণ ঘটছে।

৩. চোরাশিকার : গত বছর ইউরোপে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে (ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকবৃন্দ প্রণীত) সুন্দরবনে চোরাশিকারের এক ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ওই গবেষণাপত্রে সুন্দরবনে ৫৬টি ফাঁদে প্রায় দেড় হাজার ফাঁস পাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। গবেষকরা সেই সব ফাঁসে মৃত হরিণ, বন্য শূকর ও বনমোরগ দেখতে পেয়েছেন। এ ছাড়া হরিণের মৃতদেহে বিষ মেখে তা বাঘ শিকারের কাজে ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চোরাশিকার বন্ধ হওয়া জরুরি।

৪. পরক প্রজাতি (ইনভেসিভ প্রজাতি) : সুন্দরবনের মধ্যে অর্ধশতাধিক উদ্ভিদ প্রজাতি পাওয়া গেছে, যেগুলো মূলত পরক প্রজাতি, অর্থাৎ সেসব প্রজাতি সুন্দরবনের মধ্যে থাকার কথা নয়। এর মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি সুন্দরবনের জন্য হুমকি বলে গবেষকরা বলছেন। এসব প্রজাতি সুন্দরবনের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলোর জন্ম ও বৃদ্ধি ব্যাহত করাসহ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লিখিত বিষয়গুলো যতদূর সম্ভব সমাধান প্রয়োজন। সুন্দরবনে শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানি প্রবাহের জন্য উজানে জলাধার নির্মাণ করা যেতে পারে। সুন্দরবনসংলগ্ন শিল্প-কলকারখানায় আধুনিক ও উন্নত মানের দূষণরোধক ব্যবস্থা স্থাপনসহ ট্যুরিস্টদের মধ্যে ও উপকূলীয় অঞ্চলে দূষণবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। চোরাশিকার (অন্যান্য বনজ দ্রব্যসহ) বন্ধের জন্য দূরনিয়ন্ত্রিত ক্যামেরা ফাঁদ স্থাপন করা যায়। পরক প্রজাতির (প্রাণীসহ) নিয়ন্ত্রণও প্রয়োজন।

এ কথা ঠিক যে সুন্দরবনের নানা বিষয়ে দেশে-বিদেশে উচ্চমানের গবেষণা অনুষ্ঠিত হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশ প্রজাতি আমাদের অজানা। বিশেষ করে অমেরুদণ্ডী প্রাণিবৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অতি সীমিত। সুন্দরবনের জন্য বাঘ যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি অমেরুদণ্ডীরাও কম প্রয়োজনীয় নয়। সুন্দরবন থেকে অমেরুদণ্ডীরা বিদায় নিলে সুন্দরবন যে টিকে থাকবে না তা বলাই বাহুল্য। সুন্দরবন থেকে প্রাপ্ত বাস্তুতান্ত্রিক সেবা উৎপাদনের এরা অন্যতম প্রকৌশলী—সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিশ্বঐতিহ্যের অংশ অনন্য অনুপম সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য