kalerkantho


রাশিয়া ও আমেরিকার ‘প্রক্সি ওয়ার’

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পূর্ব ঘৌতা ঘিরে আছে সিরিয়ার সেনা। দায়িত্বে আছেন বাশার আল আসাদের ভাই মেহের এবং সেনাবাহিনীর কর্নেল সোহেল হাসান। এই সোহেল হাসান রাতারাতি আসাদ সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছেন, কারণ দেশের বেশ কিছু এলাকায় তাঁর বাহিনীই বর্বর আইএসকে তাড়িয়েছে। কোনো যুদ্ধে প্রধানত রাতের বেলায় ট্যাংক নিয়ে এগোনোর চিরাচরিত ট্র্যাডিশনকে এখন পাল্টে সিরিয়ায় সেটা দিনের আলোতেই ঘটছে। দামাস্কাসের হাইওয়ে দিয়ে দিনের বেলায়ই সারি সারি সরকারি সেনার ট্যাংক বিভিন্ন ফ্রন্টে পাঠানো হচ্ছে এখন, বিশেষ করে পূর্ব ঘৌতায়। সিরিয়ার সরকার চাইছে ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদীদের দিনের আলোতেই খতম করে এই যুদ্ধ শেষ দেখিয়ে দিতে। 

কিন্তু পূর্ব ঘৌতায় এই মুহূর্তে আটকে আছে ২০ হাজার অসামরিক মানুষ। ২০১৩ সাল থেকেই সন্ত্রাসবাদীদের কবজায় এরা আছে। বর্তমানের সিরিয়া ও রাশিয়ার যৌথ বিমান হামলার আগে এদের জন্য ‘এসকেপ রুট’ খোঁজা হয়েছে, এখনো হচ্ছে কিন্তু পাওয়া যায়নি, যাচ্ছেও না। পশ্চিমের ভাষ্য আর রাষ্ট্রসংঘের প্রধানের বিবৃতি অনুযায়ী পূর্ব ঘৌতা এখন ‘পৃথিবীর নরকে’ পরিণত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে ১৫০ জন শিশু। আহত অসংখ্য।

পূর্ব ঘৌতায় এই মুহূর্তে তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে। আল নুসরা ফ্রন্ট, জইশ আল ইসলাম ফ্রন্ট, রহমান লেজিওন। এর মধ্যে নুসরা ফ্রন্ট কোনোভাবেই কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না। তাদের অস্ত্র দেয় আমেরিকা। আর বাকি দুটি নিজেদের মধ্যেই আবার মাঝেমধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, কারণ জইশ হলো সৌদির মদদপুষ্ট গ্রুপ আর রহমান হলো কাতারের। উল্টোদিকে সিরিয়ার সেনার ১৪ নম্বর ডিভিশন একেবারে পূর্ব ঘৌতার কাছাকাছি রয়েছে। তার পেছনেই আছে ৪ নম্বর আর ৭ নম্বর ডিভিশন। এই তিনটি ডিভিশন সিরিয়ান সেনার ‘স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ’। 

পূর্ব ঘৌতায় সন্ত্রাসীদের পতন হবে নিশ্চিত। এটাই সামগ্রিক বার্তা। সিরিয়ার সরকার পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার সিরীয় সেনা শুধু এই ঘৌতায় প্রাণ হারিয়েছে। গত চার বছরে বারবার দামাস্কাসে ঘটে যাওয়া গাড়িবোমা বিস্ফোরণ এবং কয়েক দিন আগে থেকে একটানা ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে আসা—সবই হয়েছে ঘৌতার দউমা অঞ্চল থেকে। যার ফলে সিরীয় সেনার বদলার আঁচ এখন গনগনে, কোণঠাসা সন্ত্রাসীরা। বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে গোটা অঞ্চলে। রাষ্ট্রসংঘের ‘হাস্যকর’ যুদ্ধ বিরতিতে কোনো কাজ হয়নি, হওয়ার ছিলও না। এই কার্পেট বোমা হামলায় নিহত ও আহত শিশুদের ছবি পশ্চিমের করপোরেট মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে, যেটা গত সাত বছর তারা আমেরিকার হামলার বেলায় করেনি, আইএসের হামলার বেলায়ও করেনি আর ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের হামলার ক্ষেত্রে আজকের দিনেও করছে না। অন্যদিকে এই বিমান হামলার ফলে ঘটে যাওয়া শতাধিক শিশুমৃত্যুর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে রাশিয়া ও সিরিয়ার সেনাবাহিনীর তরফ থেকে ‘মানবঢালের’ কথা বলা হয়েছে। এই মানবঢালের গল্পও আবার আমরা বিভিন্ন সময়ে শুনেছি, যেমন—মসুল আর আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে আমেরিকা বলেছিল, গাজার ক্ষেত্রে ইসরায়েল বলেছিল, চেচনিয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া বলেছিল এবং ইয়েমেনে সৌদি আরব বলেছে। মানবঢালের অর্থ কিন্তু হাতে, পায়ে, বুকে বোমার আঘাত পাওয়া শিশুরা জানে না। 

ঘৌতা পুনর্দখল করার পরও দেশে আরো অনেক এলাকা পড়ে আছে সিরিয়া ও রাশিয়ার বাহিনীর জয়ের জন্য। এরপর সম্ভবত উদ্ধার হবে ইদলিব, আফরিন আর তারপর কুর্দিদের হাতে থাকা রাক্কা। আমেরিকাও নিশ্চিত তার ভাড়াটে বাহিনীদের তৈরি রাখবে। রাক্কা নিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ সেখানে তুরস্কেরও সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। কুর্দিদের যেমন আসাদও সহ্য করতে পারেন না, তেমনই এরদোয়ানও পারেন না।    

আসলে এক জটিল রাজনীতির পাশাখেলায় পরিণত হয়েছে সিরিয়া। একাধিক শক্তি আর একাধিক দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকা, তুরস্ক, ইরান, রাশিয়া এই দেশগুলো একে অপরের স্বার্থের বিপরীত। এর মধ্যে আবার মূল ‘প্রক্সি ওয়ার’ আমেরিকা-রাশিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ ও বাণিজ্য দখলে রাখা ছাড়া আর কোনো ইস্যু নেই। কারণ সিরিয়ায় আমেরিকার ‘গণতন্ত্র স্থাপন’ করতে চাওয়ার আগে সেটা তাদের পরম মিত্র সৌদি আরবে গিয়ে করে আসা উচিত। 

২০১১ থেকে আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে শুরু হওয়া এই সিরীয় সংকটে এখন পর্যন্ত চার লাখ মৃত, যার মধ্যে এক লাখের কাছাকাছি শিশু। মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দেশে এবং দেশের বাইরে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর নয়া সাম্রাজ্যবাদের যুগে মানুষের মানবতা বলেও আর কিছু অবশিষ্ট নেই। একটা ব্যর্থ মৃতপ্রায় দালাল সংগঠন রাষ্ট্রসংঘের অস্তিত্বও আর কিছুদিন পরে হয়তো থাকবে না।

পাঁচটা নদীর জল পায় ঘৌতা। এখন সেগুলো লাল।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ

 


মন্তব্য