kalerkantho

বিশেষণে বিশ্বায়ন

আবদুল বায়েস

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিশেষণে বিশ্বায়ন

গল্পে আছে, একজন রসিক ব্যক্তিকে বিশ্বায়নের উদাহরণ দিতে বলা হয়েছিল। তার উদাহরণটির সঙ্গে একটি মর্মান্তিক বিয়োগান্ত ঘটনার মিল আছে বলে এক অর্থে সেটা অত্যন্ত বেরসিকও। রাজকুমারী ডায়ানার মৃত্যুকে তিনি বিশ্বায়নের চমৎকার উদাহরণ হিসেবে মনে করেন : “এই ঘটনায় একজন ইংরেজ রাজকন্যা তাঁর মিসরীয় ছেলেবন্ধুর সঙ্গে ফরাসি দেশে সুড়ঙ্গ সড়কে দুর্ঘটনায় আহত হন। তাঁরা একটি জার্মান গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িটির ইঞ্জিন ছিল ওলন্দাজের তৈরি। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন একজন বেলজিয়াম চালক, যিনি স্কচ (স্কটল্যান্ডের) হুইস্কি খেয়ে মাতাল ছিলেন। গাড়িটির পেছন পেছন জাপানি মোটরসাইকেলে চড়ে ছুটে আসছিল একদল ইতালিয়ান চিত্র সাংবাদিক। আহত ডায়ানার চিকিৎসা করলেন একজন মার্কিন চিকিৎসক। তিনি ব্রাজিলের তৈরি ওষুধ ব্যবহার করেন। বিল গেটসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সংবাদ পাঠান একজন মার্কিন নাগরিক। আপনি সম্ভবত এ খবর কম্পিউটারে পড়েছেন, যাতে ব্যবহার করা হয়েছে তাইওয়ানের প্রস্তুত ‘চিপস’। এই কম্পিউটার সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকরা সংযোজন করে। এটি বহন করে এনেছিল ভারতীয় লরিচালকরা...এই হলো বিশ্বায়নের উদাহরণ।”

হোটেল এবং হতাশা

বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জগদীশ ভগবতীর কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে বক্তব্য শুরু করা যেতে পারে। ‘ম্যানহাটান’ ছায়াছবিতে উডি অ্যালেনের চরিত্রটি নাকি একটা হোটেলে ঢুকে ভয়ানক পচা খাবারের সন্ধান পায়। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকানোর পর ভ্রুকুঞ্চিত উডি অ্যালেন বিড়বিড় করে বলে—‘তাও তো দেখছি খুব বেশি নেই।’ অর্থাৎ পচা খাবার যদি বেশি থাকত, উডি অ্যালেনের হয়তো মন্দ লাগত না। বহুজাতিক কম্পানি ও বিশ্বায়নবিরোধীদের অবস্থান অনেকটা মনে হয় উডি অ্যালেন চরিত্রের মতোই। একদিকে অভিযোগ হচ্ছে যে গরিব দেশের জন্য বিশ্বায়ন সর্বনাশ ডেকে আনে, একই নিঃশ্বাসে অনুযোগ করা হচ্ছে যে উন্নত দেশগুলো নানা বাহানায় অনুন্নত দেশের পণ্যের প্রবেশগম্যতা সীমাবদ্ধ করে রাখছে। অনুন্নত দেশের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ‘অনিষ্টকারক’ বহুজাতিক কম্পানিগুলো ওই সব দেশে যেতে চায় না। দেখা গেছে আরো যে পক্ষে বা বিপক্ষে যেসব যুক্তি রয়েছে তার বেশির ভাগ আবেগতাড়িত অথবা শুধু রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত।

এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিচ্যুতি হচ্ছে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের অভাব। এটা শুধু বেদনাদায়ক নয়, বড় ধরনের বিপত্তিরও উৎস হতে পারে। এ নিয়ে অনেক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। তবে খুব সংক্ষেপে একটি ঘটনার কথা বলতেই হচ্ছে। ফরাসি সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসো মিতেরার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন ভাবগম্ভীর এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী জেকস আটালি। অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। বইয়ের তাকসমেত এক দেয়ালের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় তাঁকে একবার ফরাসি টেলিভিশন থেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘এই যে এত বই আপনার শেলফে, এর মধ্যে অর্থনীতির কোনো বই কি আছে?’ মিতেরা তাঁর বক্ষস্থল সামনে বাড়িয়ে না রাখার আনন্দে বলেছেন, ‘একটিও না।’ এবং এর কয়েক সপ্তাহ পরেই ফ্রান্স একটা অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়। কারো কারো মতে, অর্থনীতি একটা গৃহিণীর মতো, যাকে অবজ্ঞা করা মানে নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা। সম্ভবত বড় মাপের দেশপ্রেমিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সূত্রগুলোকে অবজ্ঞা করার কারণে জ্যামাইকার মেনেলি, ঘানার নক্রুমা, মিসরের নাসের এবং ইন্দোনেশিয়ার সোয়েফান তাঁদের বামঘেঁষা অর্থনৈতিক নীতিমালা সফল করতে পারেননি। সুতরাং বিশ্বায়ন দেখতে হবে অর্থনীতির চশমায়।

আমরা সবাই জানি যে বৈশ্বীকরণ বা বিশ্বায়নের স্তর ও মাত্রা অতি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এও জানি যে অর্থনৈতিক অখণ্ডতার সুযোগে দেশগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে আসতে শুরু করেছে। তবে বিশ্বায়নের এই প্রবণতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিতে গিয়ে জানতেন না কোথায় যাচ্ছেন এবং পৌঁছে জানতেন না তিনি কোথায় পৌঁছেছেন। ভাবলেন, ভারতে এসেছেন। কিন্তু ভারতীয়রা লাল কেন? সেই থেকে রেড ইন্ডিয়ান এবং বিস্তৃত হতে থাকল বিশ্বায়ন। শত বছর আগেও জাতিগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক যোগসূত্রতার কথা শোনা যায়। তবে হয়তো তা বর্তমানের মতো এত গভীর ও বহুমুখী ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, অতীতের তুলনায় ইদানীং অপ্রত্যাশিতভাবে পণ্য ও আর্থিক বাজারে সংযোগ বেড়ে চলেছে এবং সম্ভবত বর্তমানে ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থান করছে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, আগের চেয়ে বর্তমানে পুঁজি ও পণ্যবাজার অধিকতর বেগবান হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আরো তিনটি উৎসে বর্তমান বিশ্বায়নের ১০০ বছর আগের বিশ্বায়নের চেয়ে ভিন্নতর। যথা : বাণিজ্যকৃত পণ্য উৎপাদনের একটা বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে, সেবামূলক পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উৎপাদন ও বিশেষ করে বাণিজ্যে বহুজাতিক কম্পানিগুলোর উপস্থিতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বহুজাতিক কম্পানির আগমন প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ১০০ বছর কেন ৩০০ বছর পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আগমন প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনকে ভারত আবিষ্কারের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং অন্যদিকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ইন্দোনেশিয়ায় প্রবলভাবে প্রভাব রেখেছিল।

যা হোক, যোগাযোগ আগের চেয়ে আরো ব্যয়-সাশ্রয়ী করার জন্য ইতিমধ্যে পরিবহন খরচ তীব্রভাবে কমে যেতে শুরু করেছে। যেমন—নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনে তিন মিনিটের টেলিফোন কলের দাম ১৯৩০ সালের ২৩০ ডলার থেকে কমে বর্তমানে মাত্র কয়েক সেন্টে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা ১৯৮৬ সালের পাঁচ হাজার থেকে বর্তমানে কয়েক কোটি। বলা বাহুল্য, এর পেছনে কাজ করেছে বিশেষত বিমান ও জাহাজ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। সুতরাং বিশ্বায়নের বলে শুধু আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যে প্রসার ঘটছে না, সে বাণিজ্য আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ওপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রবৃদ্ধির ওপর বাণিজ্যের প্রভাব পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে অর্থবোধক হয়ে উঠছে এই অর্থে যে যদি বাণিজ্য-জিডিপির অনুপাত ২০ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়, তাহলে প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি বাড়ে ০.৫-১ পয়েন্ট। আবেগ এবং বুদ্ধি (Hearts and Heads)

ইউরোপের অনেক পুরনো একটা বচন এ রকম : ৩০ বছর বয়সের আগে যদি কেউ সমাজতন্ত্রী না হয় তখন বুঝতে হবে ব্যক্তিটির আবেগ বলে কিছু নেই, আর ৩০ বছর পার হওয়ার পরও যদি সে সমাজতন্ত্রী থাকে, তখন বুঝতে হবে তার বুদ্ধি বলে কিছু নেই। সাম্প্রতিককালে গড়ে ওঠা বৈশ্বীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বচনটি একটু ঘুরিয়ে উপস্থাপন করা যেতে পারে। বৈশ্বীকরণের ফলে যা ঘটছে তার সবটাই সুন্দর এবং সমর্থনযোগ্য এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। আপনি যদি তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের পণ্য ক্রয় করেন, তো নিশ্চিত জানবেন এটা তারাই তৈরি করেছে, যাদের মজুরি পশ্চিমা পরিপ্রেক্ষিতে খুবই কম এবং সম্ভবত ভয়ানক পরিবেশে তৈরি হয়েছে। এ বিষয়গুলো যাদের অন্তত কিছু সময় চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন করে না, বলতে হবে তাদের হৃদয় বলে কিছু নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য সঠিক। বরং যারা মনে করে বিশ্ব দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের উত্তর হচ্ছে শুধু বিশ্ব বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, তাদের বুদ্ধি নেই অথবা বুদ্ধি থাকলেও তা খাটাতে পছন্দ করে না। বিশ্বায়নবিরোধীরা কাজের মাধ্যমে তাদের ক্ষতি করছে বেশি, যাদের ব্যাপারে তারা সচরাচর সোচ্চার। একটা শিশু ঘর্মশালায় (Sweatshop) কাজ করছে, এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে?

১৯৯৩ সালের কথা। বাংলাদেশের শিশু শ্রমিক ওয়ালমার্টের জন্য কাপড় তৈরি করছে এবং সিনেটর টম হারকিন কম বয়স্ক কর্মীদের ব্যবহারকারী অঞ্চল থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করায় প্রস্তাব পেশ করলেন। এর প্রত্যক্ষ ফল হলো এই যে বাংলাদেশে বস্ত্র কারখানাগুলো শিশু শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দিল, কিন্তু চাকরি হারানো ওই শিশুগুলো কি স্কুলে গেছে? বরং চাকরিচ্যুত শিশুরা আরো বিরূপ পরিবেশে কাজ করছে অথবা রাস্তায় পড়ে থাকছে এবং একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পতিতালয়ে প্রবেশ করেছে। সুতরাং কারা মন্দ লোক?

কুইবেক শহরে আন্দোলনরত বিশ্বায়নবিরোধী কর্মীরা এমন ভাব দেখাচ্ছে যে নেতারা নিরাপত্তার দুর্গে বসে আছেন আর হাজার হাজার পুলিশ বাইরে থাকা বিরোধীদের থেকে তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত। কিন্তু প্রতিচ্ছবি অনেক সময় প্রতারণা করতে পারে। শক্ত বেড়া দিয়ে ঘেরা দুর্গের ভেতরে যাঁরা অবস্থান করছেন তাঁদের অনেকে বিশ্বের দরিদ্রদের সাহায্য করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, আর মনে হয় বেড়ার বাইরে পথ আটকে বসে থাকা আন্দোলনরতদের, তাদের উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, সর্বপ্রচেষ্টা চলছে দরিদ্রকে দরিদ্রতর করার জন্য।

(উৎস : পল ক্রুগম্যান, ২০০১, নিউ ইয়র্ক টাইমস)

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 


মন্তব্য