kalerkantho


সরকারি চাকরি কোনো দান নয়

আলম রায়হান

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সরকারি চাকরি কোনো দান নয়

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১১ এপ্রিল বিকেলে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ ঘোষণা দেন। সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা থাকবে না, শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। পানি অনেক ঘোলা করার সুযোগ না দিয়েই প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় সিদ্ধান্ত স্বস্তি বয়ে এনেছে সারা দেশে। এর আগে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছে। মাজাভাঙা বিএনপি অন্যের ডিমে তা দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের বাচ্চা ফোটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার প্রমাণ করলেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয়; তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি রাষ্ট্রনায়কও।

সরকারি চাকরিতে মেধাবীরা যত বেশি নিয়োগ পাবে, দেশ তত এগিয়ে যাবে। বিষয়টি নিয়ে সরকার আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করছে বলে মনে করছেন অনেকে। একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তা হচ্ছে—বাংলাদেশের সবচেয়ে অসহায় হচ্ছে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত তরুণরা। উচ্চবিত্তদের কোনো সমস্যা নেই; বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের পাঁচ আঙুলেই ঘি। আর যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত নয়, তাদের সমস্যা তেমন প্রকট নয়। ঢাকা শহরে একজন রিকশাচালকও মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করে। সিএনজি স্কুটারের একজন চালকের মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকার কম নয়। একজন বাস পরিবহন শ্রমিকের আয়ও প্রায় এ রকম। গ্রামের একজন দিনমজুরেরও প্রতিদিনের আয় ৫০০ টাকা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী একজন তরুণ-তরুণী ১৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেলে নিজেকে ধন্য মনে করে। আমরা একজন রিকশাচালকের জন্য সংগত কারণেই দরদ দেখাই। কিন্তু শিক্ষিত যে ছেলেটি বা মেয়েটি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করে, তার জন্য কোনো দরদ দেখানোর কাউকে তেমন পাওয়া যায় না। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। ব্যতিক্রম কিন্তু উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

এসব বাস্তবতায়ই কোটার বিরুদ্ধে কথা উঠেছে। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। এ প্রশ্নে শুধু ছাত্রদের আন্দোলন নয়, অনেকেই এ বিষয়ে মতামত দিয়ে আসছিলেন। কেউ কোটার পক্ষে, কেউ বিপক্ষে; কেউ হ্রাসের সুপারিশ করেছেন, কেউ আবার কোটা একেবারে তুলে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তবে ছাত্রদের দাবি ছিল মাঝামাঝি। সংস্কারের। এই দাবিতেই তারা রাজপথে নেমেছিল। দাবি সরকারের কাছে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। ঘোলা পানিতে তৃতীয় পক্ষের মাছ শিকারের চেষ্টার কারণে পরিস্থিতি কিছুটা ঘোলাটে হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুলস্টপ দিয়ে দিলেন ১১ এপ্রিল শুভ সন্ধ্যায়।

এর আগে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিরক্তিকর উপাদান হিসেবে কাজ করেছে পুলিশি অ্যাকশন। আলোচনার টেবিলেই যেহেতু  সমাধানের পথ উন্মুক্ত হলো, সেখানে ফুলেল দৃশ্যপট টিয়ার গ্যাসে রূপান্তরিত হলো কেন! কোনোই সন্দেহ নেই, ভিসির বাসভবনে নজিরবিহীন হামলা চালানো হয়েছে। এটি আন্দোলনকারীদের ফাঁকে ঢুকে তৃতীয় পক্ষের অপকর্ম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হয়তো একই গোষ্ঠী সাংবাদিকদের ওপরও হামলা চালিয়েছে।

সব কোটা ছাড়িয়ে একসময় অঘোষিত একটি কোটা বেশ কার্যকর ছিল। যাকে বলা চলে ‘মামা কোটা’। বলা হতো চাকরি পেতে মামার জোর লাগে। কিন্তু এই মামা কোটাও মৃতপ্রায়। এর স্থান দখল করে নিয়েছে ‘চাকরি বাণিজ্য’ কোটা। বহু বছর ধরেই চাকরি মানেই বাণিজ্য। এ ক্ষেত্রে অন্য সব কিছু নস্যি। এ কোটাটি এতই শক্তিশালী যে এর কাছে মেধাবী, মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা, উপজাতি কিছুই কিছু না। এর শক্তির কাছে প্রশাসনের জাঁদরেল কর্মকর্তার হাতও নিথর হয়ে যায়। অন্যান্য কোটা প্রশ্নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি চাকরিতে এই ‘বাণিজ্য’ কোটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা প্রয়োজন।

এর আগেই বেশ কিছুদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে তাড়িত করে। প্রশ্নটি হচ্ছে—চাকরি কী? আর যাই হোক চাকরি নিশ্চয়ই কোনো দান নয়। এটি দান হিসেবে প্রদান করার বিষয়ও নয়; আর যে চাকরি করে সেও চেরিটি করে না। চাকরি প্রদানকারী ও গ্রহীতা—দুই তরফই প্রয়োজনে এক মোহনায় মিলিত হয়। এই হচ্ছে চাকরি দেওয়া-নেওয়ার সাধারণ ইকোয়েশন। কিন্তু চাকরির চেয়ে প্রার্থীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি। আমের চেয়ে টিয়া বেশি হওয়ার মতো। এর ওপর সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ছিল ৫৬ শতাংশ। এর ফলেই পরিস্থিতি অন্য রকম দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশে।

কোটা পদ্ধতি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে সরকারি প্রশাসন অনেকটাই মেধাহীন হয়ে পড়েছে। একটি কথা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রচলিত কোটাব্যবস্থাটি আগাগোড়া ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সমাজের অনগ্রসর অংশের উন্নয়নের মহৎ কথা বলে এ কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান কোটাব্যবস্থা তা কোনোভাবে সংরক্ষণ করেনি। শুধু তাই নয়, সংবিধান নানা ক্ষেত্রে যে সমতার নীতি সমুন্নত করেছে, কোটাব্যবস্থা তার স্পষ্ট লঙ্ঘন। অন্যদিকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নেও এ ব্যবস্থা মোটেই কার্যকর নয়। বরং এ ব্যবস্থা বাণিজ্যের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করেছে বহু বছর ধরে।

কোটার বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করেছে, তারা কোনোভাবেই ষড়যন্ত্রকারী নয়। তারা ভবিষ্যতে বেকারত্বের আশঙ্কায় হতাশ, তারা জানে শিক্ষাজীবন শেষে শুরু হবে বেকারত্ব। তাই তারা উদ্বিগ্ন। অনেকে এরই মধ্যে বেকারত্বে জর্জরিত। ফলে হরেক রকম কোটার নামে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তারা মেনে নিতে চাইবে না—এটাই স্বাভাবিক। এরা দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরসূরি। কিন্তু সরাসরি কোনো সনদ নেই। তাই বলে তারা কেন বঞ্চিত হবে? চোখেমুখে অন্ধকার ভবিষ্যৎ যখন সামনে তখন লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে এলে তা ঠেকানো কঠিন। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।

এদিকে অনেক ক্ষেত্রের মতো সরকারি প্রশাসনে নীতি-নৈতিকতা কফিনে শয্যা গ্রহণ করেছে অনেক আগে। দক্ষতার কফিনেও শেষ পেরেক ঠোকার আয়োজন অনেক দূর এগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছর হতে চলেছে। শুধু ৫০ বছর নয়, পাঁচ হাজার বছর পরও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার করতে হবে, এককথায় চিরকাল। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এ নিয়ে রাজনীতির খেলা হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে কার্যকরভাবে চিন্তা করা সময়ের দাবি ছিল, প্রধানমন্ত্রী সেটিই করেছেন। একটি দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য মেধার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি সৎ, নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক মানবসম্পদও প্রয়োজন। আমি মনে করি, কোটা বাদ নয়, সময়ের প্রয়োজনে যৌক্তিক সংস্কার হোক। সুবিচার নিশ্চিত করা হোক।

 

লেখক : সাংবাদিক

 

 



মন্তব্য