kalerkantho


হেমোফিলিয়া সম্পর্কে জানুন অন্যকে জানান

ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



হেমোফিলিয়া সম্পর্কে জানুন অন্যকে জানান

আজ ২৮তম বিশ্ব হেমোফিলিয়া দিবস। প্রতিবারের মতো এবারও সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের স্লোগান ‘শেয়ারিং নলেজ’ অর্থাৎ অংশীদারি জ্ঞানের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী করে তোলা। হেমোফিলিয়ার মতো একটি রোগ সম্পর্কে নিজে জানা এবং অন্যকে জানিয়ে এই বিষয়ে সম্যক সচেতনতা অবলম্বন করাই এই দিবস পালনের মূল প্রতিপাদ্য।

হেমোফিলিয়া এক ধরনের বংশগত রোগ, যাতে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা প্রলম্বিত হওয়ার কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ঘটে। এ রোগের তীব্রতা বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন—তীব্র, মাঝারি ও মৃদু। তবে এই রোগ দুই ধরনের হয়—হেমোফিলিয়া ‘এ’ (ফ্যাক্টর ৮-এর ঘাটতি, যা প্রতি লাখে ১০ জন) এবং হেমোফিলিয়া ‘বি’ (ফ্যাক্টর ৯-এর ঘাটতি, যা প্রতি লাখে দুজন)। যখন এই পরিবর্তন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়, তখন এটি মা-বাবা থেকে শিশুদের কাছে চলে যায়। সাধারণত পুরুষরা এ রোগে আক্রান্ত হয় বা রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় ভোগে এবং আর নারীরা রোগটির জিন বৈশিষ্ট্য ধারণ করলেও রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় তেমন ভোগে না। সাধারণত নারীদের ীী নামে দুটি ক্রমোজম থাকে। একটি ী ক্রমোজমের হেমোফিলিয়া জিন না থাকলেও অন্য ী ক্রমোজমে থাকা জিন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফ্যাক্টর ৮ বা ৯ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ রোগীর নিবন্ধন করা হয়েছে। যদিও হিসাব মতে, প্রায় ১৭ হাজার রোগী থাকার কথা।

বেশির ভাগ হেমোফিলিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় শৈশবেই। তবে অনেকের আরো পরিণত বয়সে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। সাধারণত জন্মের ছয় মাস বয়স থেকে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, যখন শিশুটি হামাগুড়ি দিতে শেখে। কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যেতে পারে নবজাতকের হেমোফিলিয়া রয়েছে কি না। জন্মের পর নাড়ি কাটার পরও রক্তক্ষরণ হয়। এই রোগ থাকলে শিশুরা চলাফেরা করার সময় বা খেলাধুলার সময় পড়ে গেলে মাংসপেশিতে কালশিরা পড়ে যায়। পেশির অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের ফলে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুলে যায় এবং ব্যথা অনুভব করে। অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের ফলে অস্থিসন্ধিতে চাপ পড়ে এবং ক্ষয় হয়। শিশুর খতনা করার পর অতিরিক্ত রক্তপাত হয়। কেটে গেলে অথবা আঘাত পেলে রক্তপাত বৃদ্ধি পাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, দুর্ঘটনা ঘটলে বা শরীরের কোনো স্থান কেটে গেলে অনেক বেশি রক্ত ঝরতে থাকা ইত্যাদি হলো হেমোফিলিয়ার লক্ষণ।

হেমোফিলিয়া সারা জীবনের রোগ, যা দুই ধরনের হয়। হেমোফিলিয়া আপাতত নিরাময়যোগ্য রোগও নয়। এতে আক্রান্ত হলেও সঠিক চিকিৎসা ও যত্ন পেলে সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করা যায়। এর চিকিৎসা নির্ভর করে ধরন, মাত্রা এবং রোগীর বয়সের ওপর। একটু ব্যয়বহুল হলেও এই রোগের আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেশেই মিলছে। রক্তপাত বন্ধ করা ও রক্তপাতের হার কমানোই চিকিৎসার মূল দিক। সাধারণত ফ্যাক্টর ৮ বা ৯ অথবা প্লাজমা শিরাপথে দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এ ছাড়া ছোট কোনো ক্ষতের সৃষ্টি হলে ব্যান্ডেজও করতে হয়।

হেমোফিলিয়া সম্পর্কে জনগণের মধ্যে এখনো আশানুরূপ সচেতনতা তৈরি হয়নি। পরিবারের কারো হেমোফিলিয়া থাকলে, শিশুদের অস্থিসন্ধি ফুলে গেলে বা ব্যথা অনুভত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া জীবনযাপন পদ্ধতিতে আনতে হবে কিছু পরিবর্তন। বিশেষ করে প্রতিদিন কিছু ব্যায়াম, যেমন—সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ও হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। তবে ফুটবল, হকি, রেসলিংয়ের মতো খেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীরে আঘাত লাগতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। যাদের রক্ত জমাট বাঁধার বা রক্তপাত দীর্ঘ সময় ধরে হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের অবশ্যই দাঁতের চিকিৎসা বা যেকোনো অপারেশনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো শিরাপথে ওষুধ বা রক্ত অথবা রক্তজাত পদার্থ নিতে হবে। এতে যাদের হেমোফিলিয়া আছে, তাদের রক্ত জমাট বাঁধা বা দীর্ঘ রক্তপাতের সমস্যা কম হবে। পাশাপাশি অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ সেবন করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। মাংসপেশিতে কোনো ধরনের ইনজেকশন প্রয়োগ করা যাবে না। হেমোফিলিয়া হলে সহজে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। অর্থাৎ রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। শরীরের রক্তের মধ্যে কিছু প্রোটিন উপাদান এমনভাবে বিন্যস্ত, যাতে রক্ত তরল অবস্থায় থাকে এবং শরীরের বাইরে কোথাও কেটে বা ছিঁড়ে গেলেও রক্ত আস্তে আস্তে জমাট বেঁধে রক্তপাত হওয়া বন্ধ করে। এক ধরনের কণা রক্তনালির মধ্যে রক্তকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয়, আবার এক ধরনের কণা বাইরে রক্তক্ষরণ হলে জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের কোনো অংশ কেটে গেলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি রক্তপাত হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রোগী অকালে মৃত্যুবরণ করতে পারে। যারা বেঁচে থাকে তাদের শরীরের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণে আস্তে আস্তে হাত-পা, গিরাগুলো নষ্ট বা পঙ্গু হয়ে যায়।

 

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল

 


মন্তব্য