kalerkantho


খুলনা সিটি নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয়

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



খুলনা সিটি নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয়

অবশেষে ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন (খুসিক) নির্বাচন শান্তিপূর্ণ উপায়ে শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোটে বিএনপি মনোনীত ও ২০ দল কর্তৃক সমর্থিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে পরাজিত করে বিজয় লাভ করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছে। ছোটখাটো কিছু ঘটনা ঘটলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে কেন্দ্র পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে আসে। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি আগাগোড়াই সরকারের পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, নেতাকর্মীদের হয়রানিসহ নানা ধরনের অভিযোগ করেই গেছে। বিএনপি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে—নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রভাবে ফলাফল এমন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। তবে তাদের দাবির পক্ষে গণমাধ্যমগুলো তেমন প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবি করেনি। নির্বাচনের আগে যে ধরনের টান টান উত্তেজনা ছিল, ১৫ মে নির্বাচনের দিন ভোটের দৃশ্য টিভি পর্দায় দেখে তেমন পরিস্থিতি অনুভূত হয়েছে বলে মনে হয়নি। অবশেষে নির্বাচনের পর ভোট গণনার শুরু থেকেই বোঝা গেল যে খুলনার জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবার তাদের মেয়র পরিবর্তন করার ইঙ্গিত দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ব্যবধান নিয়েই তালুকদার আবদুল খালেক বিজয়ী হয়েছেন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু হেরে গেছেন।

নির্বাচনের আগে কোনো কোনো গণমাধ্যমে সাত-আটটি ফ্যাক্টর এই নির্বাচনে ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব রাখতে পারে বলে মতামত রেখেছিল। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বসে অনেকে অনেক ধরনের কথাই বলেছেন, অনেক সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবেশ সে রকম ছিল, বলার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। যেসব ফ্যাক্টরের কথা ভোট বিএনপির দিকে বেড়ে যাওয়ার কথা কোনো কোনো মহল থেকে বলা হয়েছিল সেটি মনে হয় না তেমন বড় ধরনের কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে। যদি সাম্প্রদায়িক, আঞ্চলিক, ২০ দলীয় জোটের প্রভাব, আওয়ামীবিরোধী শক্তির ভোট ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে বড় ধরনের  কোনো ফ্যাক্টর হওয়ার  মতো ভোট দিতে পারত তাহলে ব্যবধান এত বেশি হতো না, আবার ওই সব ফ্যাক্টরের ভোটার সংখ্যা যদি যোগফল মিলিয়ে বিশাল হয়ে থাকে, তাহলে বিএনপির ভোট বা মঞ্জুর ব্যক্তিগত ভোটের সংখ্যা তো তলানিতে পড়ে যায়। সুতরাং নির্বাচনের আগের আশঙ্কার অনেকই এখন মনে হচ্ছে খুসিক নির্বাচনে তেমন বড় হয়নি,  প্রভাব ফেলেনি।

তবে যে বিষয়টি  বিবেচনায় নিতে হবে, বিএনপি দাবি করেছিল খুলনা শহরটি তাদের ভোটব্যাংক বলে খ্যাত। অতীতে তারা এখানে বারবার বিভিন্ন নির্বাচনে  জয়লাভ করেছে। সুতরাং তারা আশাবাদী ছিল অতীতের  ধারাবাহিকতায় তারা এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। সুতরাং বিএনপিকে ভাবতে হবে, ভোটব্যাংক ধারণাটি চিরস্থায়ী নয়। এটি পরিবর্তনশীল। ১৫ মের নির্বাচনে সম্ভবত বিএনপির  ভোটব্যাংক ধারণাটি ভেঙে গেছে বলে ধরে নিতে হবে।

আর একটি ধারণা বিএনপিসহ দেশের সুধীসমাজের একটি অংশ প্রায়ই মিডিয়ার মাধ্যমে করে  থাকে, যেহেতু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অনেক মানুষই ভোট দিতে পারেনি। বিএনপি অবশ্য এর জন্য এককভাবে সরকার তথা আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বেড়াচ্ছে এবং এবারও সরকার তেমন ভোটারবিহীন নির্বাচন করতে যাচ্ছে বলে বারবার দাবি করছে এবং বলেও বেড়াচ্ছে যে মানুষ এখন সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে, নির্ভয়ে ভোটদানের সুযোগ পেলে সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে অপেক্ষায় আছে—তাদের এসব দাবি চূড়ান্ত বা নিরঙ্কুশভাবে সত্য নয়, সেটি এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে প্রমাণিত হচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ২০ দল শুধু বর্জন করেনি, প্রতিহত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। তেমন পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এ কাজগুলো যেহেতু জামায়াত-বিএনপি করেছিল, সুতরাং ওই নির্বাচনে ভোট না দিতে পারার দায় প্রায় পুরোটা বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়েই পড়ে। সুতরাং বিএনপির বাইরে যাঁরা মনে করেন যে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, তাঁরা রাজনীতির গণক হিসেবে বোধ হয় কাস্টমার পাওয়ার যোগ্যতা হারাচ্ছেন।

বাস্তবে খুলনায় সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম মঞ্জু ভোটারদের সংখ্যার বিচারে বড় অংশের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। খুলনার সমস্যা সমাধানে তিনি ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে সফল হওয়ার অবস্থানে নেই। তা ছাড়া একজন প্রার্থী মিডিয়ার সম্মুখে যেসব অভিযোগ করছেন, ঘন ঘন অভিযোগ করে ভোটারের সহানুভূতি আদায়ের যে কৌশল নিয়েছিলেন, তা খুলনার ভোটারদের একটি বড় অংশ ভালোভাবে নেয়নি। এতে বাস্তবতার প্রতিফলনের ব্যত্যয় ঘটতে যাঁরা দেখেছেন, স্থানীয়ভাবে তাঁরা বেঁকে বসেছেন হয়তো। অন্যদিকে তালুকদার আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত সততা, ভাবমূর্তি, শান্তলয়ে কথা বলার সংস্কৃতি খুলনাবাসীর কাছে পরিচিত। সুতরাং মঞ্জুর চেয়ে তালুকদার এবার ভোটারদের কাছে অনেক বেশি এগিয়ে গেছেন। বিএনপির ধারণা ছিল গতবারের ভোটারের হিসাব। গতবার ছিল ভিন্ন স্টাইলে প্রচারণা, যা এত দিনে মানুষের কাছে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি তালুকদারের পক্ষেই বেশি গেছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে একাট্টা ছিল, সেভাবে গোটা দল তালুকদারের পক্ষে কাজ করেছে। ভোটারদের বড় অংশই মনে করেছে, খুলনার উন্নয়নে তালুকদারের বিকল্প প্রার্থী তেমন আর কেউ নেই। এদিক  থেকে খুসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরিপক্বতা ভালোভাবে দেখিয়েছে, এর ফলও তারা ঘরে তুলে নিতে পেরেছে। অন্যদিকে বিএনপি  অভিযোগের মাত্রাহীন প্রচারণায় যেভাবে ব্যস্ত থেকেছে তাতে তারা নেতিবাচক ভোট পাওয়ার ওপর যতটা আশা করেছিল, বাস্তবে তা বিপরীত ফল দিয়েছে। বিএনপি মনে করছে যে খালেদা জিয়ার কারাভোগটা তারেক রহমানের লন্ডনে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি সরকারবিরোধী মনোভাব মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। মানুষ বিএনপির এমন করুণ অবস্থার জন্য সরকারের ওপর রুষ্ট বলেই বিএনপির নেতারা মনে করেন। কিছু মানুষ হয়তো আইন-আদালত, আচার-বিচার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে তা মনে করতেই পারে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তত মানুষ বিএনপির রাজনীতির দুর্বলতা বুঝতে পারছে, দেশকে সেভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা খালেদা জিয়ার কতটা আছে তা নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। তারেক রহমানের ব্যাপারে খুব বেশি মানুষ আশাবাদী নয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সাহসী ও দক্ষ, মেধাবী নেতা হিসেবে দেশে-বিদেশে যেভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন তা কাল্পনিক নয়, বাস্তবেই তিনি তিন মেয়াদে নতুন নতুন উচ্চতায়  দেশটাকে নিয়ে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আগে যেসব সমালোচনা গ্রামেগঞ্জে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হতো সেগুলো এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ততটা সফল কি না, বিশেষত নেতাকর্মীদের অনেকেই বিতর্কিত ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ সমালোচিত হচ্ছে, তবে শেখ হাসিনা দলের ঊর্ধ্বে মানুষের কাছে আশার স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। গত ১০ বছর দেশের আর্থ-সামাজিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত যত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি। ফলে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে যে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটেছে তাতে মানুষের বিচার-বিবেচনা করার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়। বিএনপি পরিবর্তনের এসব বিষয়কে কখনো গুরুত্ব দেয়নি, সাম্প্রদায়িকতা, ভারতবিরোধিতা এবং ইতিহাস বিকৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে অতীতে যেভাবে ভোটব্যাংক তৈরি করেছিল সে সবে বোধ হয় ভাঙন ধরেছে। তবে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনের ফলাফল দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পথ চললে ভুল করবে। তাদের তালুকদারের মতো নেতাদের সম্মুখের ভোটে বাছাই করতে হবে, তাতে ভুল করলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। দলের অভ্যন্তরে অনেক হাইব্রিড নেতাকর্মী  রয়েছেন তাদের নয়, বরং সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও জনসম্পৃক্ত নেতাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করলে নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে বিমুখ করবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। প্রয়োজন আসনভিত্তিক প্রার্থী বাছাইয়ে তালুকদারদের মতো নেতা খোঁজা, মনোনয়ন প্রদান করা। বিএনপিকে প্রচারণা বাদ দিয়ে উদারবাদী গণতান্ত্রিক দল হওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

 


মন্তব্য