kalerkantho


জর্জ গ্যালোওয়ে

ধ্বংসের পথে ধাবিত ট্রাম্প নেতানিয়াহু

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



ধ্বংসের পথে ধাবিত ট্রাম্প নেতানিয়াহু

বাইবেলে বর্ণিত আরমাগেদ্দন শহর যেন গাজার খুব কাছেই; সাম্প্রতিক গণহত্যার স্থানটির একেবারে কাছে বলা যেতে পারে। গাজার ওই স্থানটিতে অতি সম্প্রতি গণহত্যার যে ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সময়ের শেষ সীমায়—অর্থাৎ চূড়ান্ত ফয়সালার দিনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন ‘পূর্ণবয়স্ক শিশু’র কর্মকাণ্ড। এ যাত্রায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও অন্যান্য দূত-ভবন ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়াস করেছেন। এই সেই জেরুজালেম, যার অর্ধেকটা দখল করে নিজেদের অংশ করে নিয়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনে সেটা আজও দখল করা ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত।

দখল করা ভূখণ্ডে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানো অপরাধ। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে অস্ত্রের জোরে জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল। দখল করা বিভিন্ন ভূখণ্ডে ইসরায়েল অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন—গোলান মালভূমিতে অনেক অবৈধ বসতি স্থাপিত হয়েছে, সেখান থেকে অনেক জ্বালানি তেল চুরি গেছে, সেখানে ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদার জন্য অনেক অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করেছে ইসরায়েল। এসব সত্ত্বেও গোলান এখনো সিরিয়ার। জেরুজালেমের মতো গোলান মালভূমিও দখলকৃত ভূমি। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে অথবা বিশ্বের অন্যান্য সরকারের কাছে দখলটাই সত্যি হয়ে যায়নি। ব্যতিক্রম শুধু ট্রাম্প প্রশাসন।

সত্যি বলতে কী, গত ৫০ বছর প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের অঙ্গীকার করেছেন, অন্তত নির্বাচনী দৌড়ঝাঁপের সময়। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারকাব্য আর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হলো গদ্য—কোনো প্রেসিডেন্টই অঙ্গীকার পূরণের পথে হাঁটেননি। ব্যতিক্রম শুধু ট্রাম্প।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে শেষ পর্যন্ত রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে, সেটা বোধ হয় তিনি বুঝতেই পারেননি। তাঁর চারপাশের পেশাদার লোকজন কিন্তু ঠিকই সেটা বুঝেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিস্মিত বিহ্বল লোকজন থেকে শুরু করে যারা উসকানি দেখার অপেক্ষায় লোলুপদৃষ্টিতে চেয়ে ছিল, তারা সবাই বুঝেছিল।

রক্তাক্ত ঘটনা আরো অনেক ঘটেছে। কিন্তু গাজার সাম্প্রতিক গণহত্যার ঘটনার তাৎপর্য যে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে, সেটা বিশ্বাস করার কারণ আছে। এ ঘটনায় নিশ্চিতভাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বের অবসানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। তাঁর জন্য সময় ও সুযোগ দুটোই আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। ফিলিস্তিনি ম্যান্ডেলা তথা কারাবন্দি মারওয়ান বারগুতি জেলে থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন বলে মনে হচ্ছে এবং আব্বাসের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি সফলতার মুখ দেখবেন। 

গাজার ঘটনায় সাময়িকভাবে হলেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সুসম্পর্কে জটিলতার জন্ম হবে। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল উভয়ের ইরানবিদ্বেষের সূত্রে। গাজার গণহত্যার ঘটনায় সে সম্পর্কে অনিবার্যভাবে চিড় ধরেছে। সৌদি আরবের ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠী ও রক্ষণশীল শক্তিগুলো অজুহাতের জন্য অপেক্ষা করছে। যে লোকটি তাদের স্বজনদের রিত্জ কার্লটনে উল্টো করে ঝুলিয়ে পকেট থেকে পয়সা বের করেছে, তাকে পাল্টা আঘাত করার জন্য তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছে। গাজার গণহত্যার ঘটনা তাদের সেই সুযোগ দিয়েছে।

এসব কারণে কোনো ইসরায়েলির উসকানিতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আরব শাসকের সঙ্গী হওয়া জটিল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক আরব হয়তো ইরানের ব্যাপারে শত্রুভাবাপন্ন, কিন্তু এ সপ্তাহের পর তাদের অনেকে হয়তো বুঝতে শুরু করবে, তাদের বিদ্বেষ আসলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যে অপরাধ, পশ্চিমা দেশগুলোতে সেটার বিরোধিতা এরই মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছে। যার ফলে বেশ কয়েকটি দেশে বিডিএস (বর্জন, ব্যবসা প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা) আন্দোলন বিপুল সফলতা অর্জন করেছে এবং এ আন্দোলন আরো তীব্র হবে বলেই মনে হচ্ছে।

আমি যখন ১৯৭৫ সালে ফিলিস্তিনিদের প্রতি একাত্মতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম, তখন পিএলওর (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) সমর্থকদের জায়গা দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের একটা মাঝারি আকারের মিলনায়তনই যথেষ্ট ছিল। এখন আপনি হাইড পার্কে, সত্যি বলতে কী, গোটা সেন্ট্রাল লন্ডনে তাদের জন্য স্থান সংকুলান করতে পারবেন না। সে সময় ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সত্যিকার মমতা ছিল। এখন কেউ তাদের জন্য ভালোবাসা নিয়ে এগোবে না; এগোবে শুধু স্বার্থের প্রয়োজনে, তা-ও ফুরিয়ে আসছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার অবসান হয়েছে বলা যায়। সেই তকমা নিশ্চিতভাবে এ সপ্তাহে আলগোছে রাশিয়ার গায়ে গিয়ে লেগেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কারোর ফেরার আর রাস্তা নেই। গাজায় গণহত্যার দিন সকালে ট্রাম্প টুইট করেছিলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য এটা এক মহান দিন।’ তাঁর কথা ঠিক। তবে যেভাবে তিনি ভেবেছিলেন সেভাবে তা একেবারেই ঠিক নয়।

 

লেখক : ব্রিটেনের সাবেক এমপি, উপস্থাপক, লেখক ও বক্তা

সূত্র : আরটি অনলাইন

ভাষান্তর : শামসুন নাহার


মন্তব্য