kalerkantho


সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিসত্তা

মুহম্মদ নূরুল হুদা

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিসত্তা

১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে পা রাখার পর থেকেই এককালের সুপ্রসিদ্ধ বর্ধমান হাউস চত্বরে আমার নিয়মিত আনাগোনা। সাহিত্যচর্চার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই কোনো এক অদৃশ্য প্ররোচনায় আমি আর সহপাঠী মকবুল (এখন ইউরোপিয়ান  ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য ড. মকবুল আহমদ খান) প্রায় অভিন্ন লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি, বাংলাবাজার ও বিউটি বোর্ডিং হয়ে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসসহ ঢাকা শহরের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিরামহীন ঘুরে বেড়িয়েছি। লেখকদের সঙ্গে দেখাদেখি, পরিচিতি, আড্ডাবাজি, সুযোগ পেলে নিজের রচনা পাঠ করে শোনানো, পত্রিকার সাহিত্য পাতায় লেখা ছাপানো ইত্যাকার নানা নেশায় ও মতলবে আমাদের এই নিত্যবৈকালিক ঢাকা-জরিপ। কখনো বাসে, কখনো পায়ে হেঁটে, তবে কদাচ রিকশায়। তখনো আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। দুই বছর পরে যখন উনিশ শ সাতষট্টিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকছি, তখন সদরঘাট থেকে নতুন ঢাকার বনানী পর্যন্ত নানা সড়ক আমাদের পায়ের তলায় বেধড়ক নেচে বেড়াচ্ছে। তবে এই ঘূর্ণিনৃত্যের মূল মঞ্চ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যার মাঝখানে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি জাতিসত্তার সূচক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। আমার সৌভাগ্য, আমার শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭৩ সালে এই বাংলা একাডেমিতেই আমার কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক শুরু। আর এখানেই কেটেছে আমার কর্মজীবনের প্রায় ৩৩ বছরের (১৯৭৩-২০০৬) দীর্ঘ পরিসর। মাঝে বছর পাঁচেক নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি, সাড়ম্বরে দেশ-বিদেশে নজরুল জন্মশতবর্ষ পালন করেছি। তারপর আবার বাংলা একাডেমিতে এসেই অবসর গ্রহণ করেছি। কাজেই আমার কর্মজীবন বা সৃষ্টিজীবন যা-ই বলি না কেন, তার প্রায় সবটাই এই বাংলা একাডেমির দান।

আবার এখানে কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব শ্রেষ্ঠ লেখকের সান্নিধ্যধন্য হয়েছি, তাঁদেরই এক শীর্ষজন সেলিনা হোসেন। বয়সে আমার এক-দুই বছরের বড়। সেহেতু তিনি বরাবরই  আমার সেলিনা আপা। আমি গৌরব বোধ করি এ জন্য যে তিনি আমার সহকর্মী, সহমর্মী, সহসাহিত্যস্রষ্টা, সহযোদ্ধা ও আমার কালের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মিনারমূর্তি। এটি তাঁর অমিত অদম্য নমস্য সৃষ্টিসত্তার প্রতীক। একাত্তর পেরিয়ে তিনি এখন বাহাত্তরে পড়ছেন এ বছর। এখন তিনি আর ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির শুরুর কোনো প্রবেশক কর্মরত এক প্রতিশ্রুতিশীল গবেষকই নন, বরং ফুলেফলেপত্রপল্লবে সুশোভিত এক সুবিশাল মহীরুহ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্যের অঙ্গনে বহুমাত্রিক সৃষ্টিবৈচিত্র্যেরও এক শীর্ষ নাম। ১৯৭৩ সালে প্রথম উপন্যাস ‘জলোচ্ছ্বাস’ দিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা, আর আজ তাঁর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে শতক। এই সংখ্যা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমরা সম্মোহিত তাঁর গুণপনায়। তিনি নিজেও সতর্ক গুণবিচারী। মূলত কথাশিল্পী হলেও তিনি প্রবন্ধ, গবেষণা, অভিধান-চয়ন, সম্পাদনা, নারীবাদ, মুক্তিযুদ্ধ ও মানবমুক্তির জন্য কলমযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা আভরণে, নানা আঙ্গিকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিনি শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষী, অংশীজন বা কথক-রূপকারই নন, তিনি তাঁর সত্যান্বেষী ব্যাখ্যাকারও বটে। তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ (তিন খণ্ড) বাংলাদেশের দৃশ্যমান ইতিহাসের নির্মোহ দলিল। সমকালে স্বার্থান্বেষীরা ইতিহাস-বিকৃতির যে অজাচারে অভ্যস্ত, তার বিরুদ্ধে এক সত্যনিষ্ঠ রায়-ভাষণ এই বাস্তবাশ্রয়ী জীবনালেখ্য, সাহিত্যের পরিভাষায় আমরা যার নাম দিয়েছি উপন্যাস। শুধু এটিই নয়, তাঁর প্রায় প্রতিটি উপন্যাস বা গল্প বা আলেখ্য বা প্রবন্ধ অথবা লিখিতরূপের অন্য কোনো সৃষ্টিকর্ম, সবটাই তাঁর সচেতন চিন্তাপ্রসূত ও গবেষণালব্ধ জরিপের সৃষ্টিসম্মত ফসল। আদি বাঙালির চর্যা-জীবন থেকে শুরু করে নদীমাতৃক বাংলাদেশে পদ্মা-তিস্তার মানবসৃষ্ট জলহীনতার সংকট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত বাংলাদেশে পোকা-মাকড়ের ঘরবসতি তথা মানুষপ্রাণী মাত্রেরই পরিবেশবাহিত জীবনযাপন, কিংবা বহুস্তরীয় মানব-চৈতন্যের গহনলোকে মগ্নশিস, ইত্যাকার মূর্ত-বিমূর্ত নানা থিম তাঁর রচনায় কাব্যিক মোহনীয়তায় স্বাতন্ত্র্যসিদ্ধ হয়ে ওঠে। এভাবেই তিনি নিজেকে নির্মাণ করেন একালের এক সদাচারী ও সত্যবিচারী দ্রষ্টা-স্রষ্টা হিসেবে। আর আমরা তাঁকে বরণ করি আমাদের বহমান ইতিহাসের এক সত্যসন্ধ রূপকার রূপে। দৃশ্যবাস্তবতা ছাড়াও মনোবাস্তবতার নানা রূপ তাঁর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বীক্ষণে ও পরিবেশনায় অনন্যতা লাভ করে। কথক-দর্শক-স্রষ্টা সেলিনা হেসেনের এ এক ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। ফলে শুধু বাংলাদেশের সাহিত্যে নয়, সমগ্র বাংলা ভাষার সৃষ্টিকলায় তিনি আজ এক স্বকীয় কলাকার হিসেবে সুস্বীকৃত। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে শুরু তাঁর সৃষ্টির স্বীকৃতি ব্যাপকতর হচ্ছে বহির্বিশ্বেও। হালে আমাদের যে কজন অঙ্গুলিমেয় সাহিত্যস্রষ্টার রচনা আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত, তিনি তাঁদের মধ্যেও সর্বাগ্রগণ্য। সবচেয়ে বড় কথা, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও তাঁর সৃষ্টিতে কোনো শৈথিল্য নেই, খিচুড়িপনা নেই; আছে অমিতযৌবনের পারম্পর্যময় অন্তর্যাত্রা। এভাবেই তিনি হয়ে উঠছেন আমাদের সময়ের এক সত্যদর্শী সৃষ্টিদর্পণ। ‘রূপজালাল’-এর নবাব ফয়জুন্নেসা থেকে বেগম রোকেয়া হয়ে, সুফিয়া কামাল হয়ে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সেলিনা হোসেন : আমাদের নারীমুক্তিবাহিত মানবমুক্তির সামগ্রিক অগ্রযাত্রার এক অত্যুচ্চ সময়-ফলক। শিশু-কিশোর-তরুণ-বয়োবৃদ্ধ বা বানপ্রস্থ : সব কিছুই উঠে আসছে তাঁর বয়ানসমগ্রে। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন একালের বাঙালিমানস ও অসাম্প্রদায়িক মানবসত্তার প্রমিত উচ্চারক। এটিকে তাঁর সৃষ্টিসত্তার সর্বমানবিক বিশ্বরূপ বলে মনে করি।

দশ হাতে লিখে চলেছেন আমার সেলিনা আপা। আপা, আপনি বয়সী বিপন্নতার কাছেও নত নন এখনো। হবেন না কখনো। আপনার নন্দনজয়ী সৃষ্টিসত্তা সর্বজয়ী হোক।

লেখক : কবি


মন্তব্য