kalerkantho


বিগত দিন থেকে শিক্ষা নিন

ডা. মো. ফজলুল হক

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বিগত দিন থেকে শিক্ষা নিন

আমাদের দেশের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী হেরে গেলেই বলা হয় ভোটে কারচুপি হয়েছে, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে, জাল ভোট দিয়েছে, অর্থাৎ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, পুনর্নির্বাচন চাই। লাখ লাখ ভোট প্রদান ও গ্রহণে কিছু অনিয়ম হতেই পারে, যেমনটি হয় পরীক্ষার হলে ছিটেফোঁটা নকল। নকল করা ছাত্ররা কোনো দিন ভালো রেজাল্ট করতে পারে না, ফেলই করে বেশি। তেমনই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাই হয়। আমি ১৯৮৩ সালে সরকারি চাকরিতে (ক্যাডার সার্ভিসে) যোগদানের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছি, তা ছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছি। সব নির্বাচনেই হেরে যাওয়া পরাজিত দলের একই মন্তব্য শুনেছি। প্রিসাইডিং অফিসার (তৎকালীন) হিসেবে মন্তব্য হলো, মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যই বেশি। তবে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছিল, সেখানে ছোটখাটো ভোটচুরির যে ঘটনা ঘটেছে, তা এখন হয় না বললেই চলে। সে সময় রাস্তায় ব্যালট পেপার পাওয়া যেত। এর কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায় ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। তাতে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও সরকারদলীয় (আওয়ামী লীগ) পরাজিত মেয়র প্রার্থীরা পরাজয়কে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। বিএনপির বিজয়ী মেয়র প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এটাই হলো গণতন্ত্র। প্রার্থীর জয় পেতে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে ওই প্রার্থীর বিগত সময়ের কর্মকাণ্ড, আচার-ব্যবহার, নীতি-নৈতিকতা, সততা, রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি ও দেশের স্বাধীনতায় ভূমিকা ইত্যাদি। গাজীপুরে গত ২৬ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন। এ বিজয় প্রার্থীর পাশাপাশি তাঁর রাজনীতির বিজয়। আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারের জয়। এ বিজয় এ দেশের স্বাধীনতার সপক্ষের জনগণের বিজয়, উন্নয়নের প্রতি মানুষের সমর্থনের বিজয়। এ জয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের জয়।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের আগাম মন্তব্য ছিল গাজীপুর সিটি নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য এসিড টেস্ট স্বরূপ। দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করলে তার মূল্য দিতে জানে এ দেশের মানুষ, তারই প্রমাণ খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল। উল্লেখ্য, নির্বাচনের দুই দিন আগে গাজীপুরে থাকা কয়েক বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নির্বাচনের খবর কী? তাঁরা অকপটে জানালেন, নৌকা প্রতীকের দিকেই হাওয়া বইছে। নির্বাচনের পর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের একজন হাফেজ সাহেবের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বাড়ি ওই এলাকায় হলেও নির্বাচনী এলাকার মধ্যে নয়। তাঁর মন্তব্য হলো, লোকমুখে শুনেছেন, এবারের নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে, যা এর আগে কখনো গাজীপুরে হয়নি। সাধারণভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় বর্তমান যুগটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগ। কোথায় কী ঘটছে তা মুহূর্তের মধ্যে মিডিয়ায় চলে আসে, ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে সব কিছু। আজকাল কি খুব বেশি অনিয়ম করার সুযোগ আছে।

২১ আগস্ট ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মীর মৃত্যু দেশের মানুষ দেখেছে। অবৈধ পথে দশ ট্রাক অস্ত্র বিদেশ থেকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে। তা ছাড়া মিল-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, পেট্রলবোমার দ্বারা মানুষ হত্যা, বাস, ট্রাক, ট্রেনে অগ্নিসংযোগ, গাছ কেটে রাস্তা অবরোধ ইত্যাদি বিএনপি ও জামায়াতের হরতালেই ঘটেছিল। এ দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আগুন-সন্ত্রাস চায় না। পোড়া মানুষের কান্না শুনতে ও দেখতে চায় না। সেসব বিভীষিকাময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক তা আর দেখতে চায় না। দেশের উন্নতি চায়, অগ্রগতি চায়। এ অগ্রগতি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বারাই সম্ভব হচ্ছে, যার প্রমাণ অনেক। যেমন—সমুদ্র বিজয় (এক লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার), ছিটমহল বিনিময়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (প্রক্রিয়াধীন), মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদীতে পদ্মা সেতু তৈরি (কাজ চলমান), ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল (নির্মাণাধীন), সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ও বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উেক্ষপণের মাধ্যমে ৫৭তম সদস্যসহ বিভিন্ন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গি দমন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য জিরো টলারেন্স নীতি (চলমান) ইত্যাদি এ সরকারেরই অগ্রগতির একটি অংশ। অর্থাৎ দেশের স্বার্থে কাজ করলে ভোটাররাই সে দল বা প্রার্থীকে আরো দেশের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ করে দেবে—এটিই স্বাভাবিক। এ কারণেই এ সরকারের পক্ষের প্রার্থীরাই বিপুল ভোটে এগিয়ে যাচ্ছে। ভোট ভোটারের নিজস্ব আমানত। এ আমানত যোগ্য প্রার্থী বা যোগ্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক। টেনশন করার কিছু নেই। ডা. মাহাথির মোহাম্মদ একাধারে ২২ বছর (১৯৮১-২০০৩) মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে ওই দেশকে উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিধায় প্রায় ৯৩ বছর বয়সে ওই দেশের মানুষ আবার জোর করেই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করেছেন তাঁকে। এ থেকে সবারই শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। দেশের স্বার্থে কাজ করলে ভোটারের পেছনে দৌড়াতে হবে না ভোটের জন্য।   

 

লেখক : চেয়ারম্যান ও ডিন, মেডিসিন, সার্জারি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স বিভাগ, ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

 

 



মন্তব্য