kalerkantho


সিরিয়া যুদ্ধে শখ মিটেছে যুক্তরাষ্ট্রের

রবার্ট ফিস্ক

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সিরিয়া যুদ্ধে শখ মিটেছে যুক্তরাষ্ট্রের

এটা বিশ্বাসঘাতকতা। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে আসাদবিরোধী যোদ্ধাদের জন্য ওয়াশিংটন থেকে আসা অভাবনীয় এক বার্তায় বলা হয়েছে, পশ্চিমাদের কাছ থেকে আসাদবিরোধী বা রাশিয়াবিরোধী লড়াইয়ে আর কোনো সাহায্যের আশা তারা যেন না করে। একসময় ইতিহাসের বইয়ে এই বিশ্বাসঘাতকতার কথা লেখা হবে। সিরিয়া যুদ্ধের বাঁক বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা এটি। আপনি যদি বিপর্যস্ত ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মির’ অংশ হয়ে থাকেন, তাহলে বুঝবেন আপনার সঙ্গে কী ধরনের বেঈমানি করা হয়েছে। অন্যদিকে এটি বিদ্রোহীনিয়ন্ত্রিত সিরিয়ার বিভিন্ন অংশ পুনর্দখল করতে ইচ্ছুক আসাদ প্রশাসনের জন্য বড় জয়।

সম্প্রতি সিরিয়ার দক্ষিণ ও পূর্ব দারা এবং কুনেইত্রা ও সোয়েইদার আসাদবিরোধী যোদ্ধারা শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ওই সব এলাকায় রুশ ও সিরীয় বাহিনীর বোমাবর্ষণ শুরু হয়। শহরগুলো থেকে আবার পালাতে শুরু করে লোকজন। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রত্যাশায় বা ধারণাবশত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া তোমাদের উচিত হবে না।...তোমরা যে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছ তা যুক্তরাষ্ট্র সরকার বোঝে। আমরা এখনো রাশিয়া ও সিরিয়া সরকারকে বলছি, এমন কোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাক, যা ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে।’ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বার্তাটি প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ খবর নাকচ করেনি।

দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন তার আশীর্বাদপুষ্ট বিদ্রোহীদের ‘জটিল পরিস্থিতি’ বোঝে! তারা আবার যুদ্ধবিরতি না ভাঙার জন্য রাশিয়া ও সিরিয়াকেও পরামর্শ দেয়। বাস্তবিক অর্থে এসবই মস্কোর মস্তিষ্কপ্রসূত। যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, তাদের শত কোটি ডলারের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ আল-নুসরার হস্তগত হয়েছে। এই আল-নুসরা ৯/১১-এর হামলাকারী আল-কায়েদারই আরেক নাম। দারার বাইরের অনেকখানি এলাকা এখনো আল-নুসরার দখলে, খাতা-কলমে যার দখল ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) হাতে (একসময় বলা হতো এ বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী)।

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় যুদ্ধে লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরানের বাহিনী অংশ নেয়নি। এটি যে রাশিয়া ও সিরিয়ার হামলা, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একমত; সিরিয়াও তা জানে। ভ্লাদিমির পুতিন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কথা বলছেন এমন কেউ ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছে—তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন গোলান মালভূমিতে সিরিয়া যুদ্ধের আঁচ পড়বে না। সিরিয়ার লড়াই অভ্যন্তরীণ লড়াই হিসেবেই থাকবে। আম্মানের তথাকথিত মিলিটারি অপারেশনস সেন্টারও (এমওসি) কার্যক্রম গুটাতে শুরু করেছে। জর্দানের উত্তর সীমান্তে লড়াইরত বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও অর্থ দেওয়ার কথা ছিল তাদের। লক্ষণেই স্পষ্ট, কাজটি তারা আর করবে না।

ইসরায়েল এখনো সিরিয়ায় সিরীয় ও ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা কখনোই আইএস বা আল-নুসরা বা আল-কায়েদার ওপর হামলা চালায়নি। আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে এ যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। এখন সে লক্ষ্য থেকে সরে গেছে তারা; জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে দামেস্ক সরকারের জন্য। হয়তো ইসরায়েলকেও তারা পরামর্শ দিয়েছে, গোলানে সিরিয়া যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যাওয়ার জন্য।

দামেস্কের সাবেক বিরোধী যোদ্ধাদের দেওয়া তথ্যমতে, এমওসি বিদ্রোহীদের সব তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী ছিল। কিন্তু চার বছর আগে তারা এফএসএকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তখন রাজধানীতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার জন্য মর্টার ও কামান চাওয়া হয়েছিল; এমওসি দেয়নি। এটি ছিল সতর্কবার্তা। সিরিয়ার কুর্দিরা তখনই সতর্ক হয়।

আগেও দুইবার বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদ পেয়েছে কুর্দিরা। ১৯৭৫ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তাদের সঙ্গে একই খেলা খেলেছেন। তখন সাদ্দাম হোসেন ও ইরানের শাহর মধ্যে দূতিয়ালি করছিলেন তিনি। তার আগে থেকেই সাদ্দামের বিরুদ্ধে কুর্দিদের উসকাচ্ছিল সিআইএ। মধ্যস্থতার কারণে কুর্দিদের জন্য বরাদ্দ অর্থ থেকে এক কোটি ৬০ লাখ ডলার ছেঁটে ফেলা হয়। ১৯৯১ সালেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।

সিরিয়ার আশঙ্কা, ইসরায়েল গোলানে তাদের নিজস্ব বাফার জোন গড়ে তুলবে। দক্ষিণ লেবাননে তারা যে দখলদারিত্ব গড়ে তুলেছিল এটি হবে তারই আদলে। সেই দখলদারিত্ব বজায় ছিল ২২ বছর ধরে। ২০০০ সালে ইসরায়েল পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এটি খুবই স্পষ্ট, সিরিয়া থেকে পিছু হটছে পশ্চিমা শক্তি। তারা যদি সিরিয়ার দক্ষিণে ও উত্তরে তাদের সহযোগীদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, রাশিয়া (এবং আসাদও) জয় পেয়েছে। বিদ্রোহীরা পরাজিত। তবে ওয়াশিংটন এ দাবি করতেই পারে, তারা ইরানকে ইসরায়েলের কাছ থেকে দূরে রেখেছে। এ দাবির সারার্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার লড়াইয়ে হার মেনেছে।

 

লেখক : মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ; ব্রিটিশ সাংবাদিক

সূত্র : কাউন্টার পাঞ্চ অনলাইন

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 



মন্তব্য