kalerkantho


দেশেই মোবাইল ফ্যাক্টরি!

গাজীপুরে দেশের প্রথম হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা চালু করল ওয়ালটন। উদ্বোধনের দিন কারখানার ভেতর-বাইরে দেখে এসেছেন আল-আমীন দেওয়ান

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



দেশেই মোবাইল ফ্যাক্টরি!

ওয়ালটন হাইটেক ও মাইক্রোটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পার্ক

গাজীপুরের চন্দ্রায় ঢুকে একটু পরই মহাসড়ক থেকে ওয়ালটন হাইটেক ও মাইক্রোটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পার্কের বিশাল স্থাপনা চোখে পড়ে। দেখতে দেখতে প্রশাসনিক ভবনের ফটক দিয়ে প্রবেশ করলাম।

প্রধান অতিথি তখনো আসেননি। তাই একটু জিরিয়ে নেওয়া গেল। খানিক পরেই এক ওয়ালটন কর্মকর্তা জানালেন, প্রধান অতিথি এসেছেন। কারখানা ভবনের দিকে রওনা হব আমরা। ভেবেছিলাম পাশের ভবনই হবে হয়তো। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে ওই কর্মকর্তা জানালেন, ওয়ালটনের পার্কের ভেতরই প্রায় দেড় কিলোমিটার যেতে হবে। বাইরে রোদের ভীষণ তেজ। হাঁটতে হবে? না, শাটল কার আছে, গলফ কার্ট আছে। যেতে কষ্ট হবে না।

এই পার্কেই এইচএফসি গ্যাসমুক্ত ইন্টেলিজেন্ট ইনভার্টার প্রযুক্তির রেফ্রিজারেটর ইউনিট, অত্যাধুনিক কম্প্রেসার কারখানা, টিভি, মোটরসাইকেল, রিমোট কন্ট্রোল টেবিল ফ্যান, সিলিং ফ্যান, রাইস কুকার, ব্লেন্ডার, ইলেকট্রিক সুইচ-সকেট, রিচার্জেবল ব্যাটারি, গ্যাস স্টোভ এবং অসংখ্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন কারখানা করেছে ওয়াটলন। মৃদু হেসে কম্পানিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বললেন, হেঁটে তিন দিনেও ঠিকঠাক দেখে উঠতে পারবেন না। কিছুক্ষণ পরই আমরা উপস্থিত হলাম ওয়াটলনের মোবাইল ফোন কারখানার সামনে। অতিথিরা ফিতা কেটে যখন বিশাল ওই কারখানা উদ্বোধন করছেন তখনো অনুমান করতে পারিনি ভেতরে কী চমক অপেক্ষা করছে।

ঢুকেই সুবিশাল লিফটে আমরা সরাসরি চলে গেলাম উৎপাদন বিভাগের ফ্লোরে। সবাই জুতার ধুলা কাভার করা পলি অ্যাপ্রন পরে ঢুকলাম একটি কনটেইনার চেম্বারের মতো কক্ষে। ঢোকার পরই অটোমেটিক দরজা লক হয়ে গেল। চারপাশ থেকে দ্রুতগতিতে বাষ্প ছাড়তে লাগল। অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকেই ঘাবড়ে গেল। আসলে এটি এয়ার শাওয়ার টানেল। কারখানার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন ধুলাবালিসহ নানা উপাদান শরীরের বাইরে থেকে পরিষ্কার করে দেয়।

প্রথমেই দেখানো হলো উৎপাদন ইউনিটের একটি লাইন। সেখানে একেকটা ডেস্ক হয়ে কিভাবে একটি হ্যান্ডসেট অবয়ব পাচ্ছে দেখছিলাম। কারখানার ইউনিফর্ম-অ্যাপ্রনে সারিবদ্ধ কর্মীদের কেউ কেসিং জোড়া দিচ্ছেন, কেউ মাদারবোর্ড ও কি-বোর্ড লাগাচ্ছেন, কেউ বা বাটন চেক করছেন। এভাবে ধাপে ধাপে পরিপূর্ণতা পাচ্ছে একটি মোবাইল হ্যান্ডসেট।

আমরা গেলাম গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে। সেখানে প্রকৌশলীরা হ্যান্ডসেটের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার কথা জানালেন। একে একে ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, টেস্টিং ল্যাব, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ হ্যান্ডসেট সংযোজনের পুরো প্রক্রিয়া দেখলাম আমরা।

কাঁচামাল মজুদ ও সংরক্ষণের জায়গাটা এত বড় যে অনায়াসে ১০টি বড় কাভার্ড ভ্যান কনটেইনার এটে যাবে। ওয়ালটনের কর্মকর্তারা জানালেন, কারখানার জন্য আনা যন্ত্রপাতিগুলো জার্মানি ও জাপানি প্রযুক্তির। এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আরেকটি ইউনিটে। এখানকার কর্মীরা দানবীয় সব মেশিনপত্রে নিজেরাই বড় বোর্ড কেটেকুটে তাতে খুব সূক্ষ্ম কাজ করছেন। আসলে তা মাদারবোর্ড তৈরির সারফেস মাউন্টিং টেকনোলজি (এসএমটি) সিস্টেমসহ আরো কিছু প্রযুক্তি ল্যাবের সন্নিবেশ।

এক ফাঁকে ভবনের ছাদে উঠে গেলাম। সেখান থেকে যত দূর দেখেছি, শুধু ওয়ালটন-সাম্রাজ্য।

পরিকল্পনার শুরু

স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ-টিভিসহ বিভিন্ন নিত্য প্রযুক্তিপণ্য সংযোজনের অভিজ্ঞতা ওয়ালটনের আগেই ছিল। আগে তারা চীনে তৈরি হ্যান্ডসেট আমদানি করে আনত। কিন্তু খাতটিতে বাংলাদেশের বাজারের ব্যাপকতা ও ভবিষ্যৎ দেখে স্থানীয় উৎপাদনের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করে। অনেকটা নীরবেই গড়ে তুলতে থাকে মোবাইল উৎপাদনের কারখানা।

 

উদ্যোগে গতি

২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সরকার স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর বড় ধরনের ছাড় দেয়।

এ ক্ষেত্রে এসকেডি (সেমি নক ডাউন) পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং সিকেডি (কমপ্লিট নক ডাউন) পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আগে উভয় ক্ষেত্রে এই শুল্ক ছিল ৩৭.০৭ শতাংশ। আর এটি ছিল স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য মহা সুযোগ। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে ওয়ালটন। লোকবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি আমদানিসহ কারখানা চালুর সব আয়োজন করতে থাকে।

 

কারখানা চালুতে অনুমোদন

কারখানা চালু করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিটিআরসি) কাছে ওয়ালটন যখন আনুষ্ঠানিক আবেদন করে তখন এসংক্রান্ত কোনো নিয়মনীতি বা নির্দেশিকা কিছুই ছিল না। এরপর বিটিআরসি খুব দ্রুতই ডিভাইস উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনের নির্দেশিকা জারি করে। পরে সেই নির্দেশিকা অনুসারে ‘এ’ ক্যাটাগরির কারখানা হিসেবে তালিকাভুক্তি সনদ চায় ওয়ালটন। এই ক্যাটাগরিতে মানসম্মত লে-আউটের মাধ্যমে নিজস্ব একটি টেস্টিং ল্যাবের কারখানা হতে হবে। ল্যাবে প্রয়োজনীয় সব টেস্টিং সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন বিভাগ বা শাখাও থাকতে হবে।

 

কারখানা

গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটনের মোবাইল উৎপাদনের যে কারখানা, তার নাম ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কারখানার আয়তন দুই লাখ বর্গফুট। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীসহ কারখানায় সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার কর্মী সম্পৃক্ত রয়েছে।

 

হ্যান্ডসেট উৎপাদন

শুরুতে চারটি উৎপাদন ইউনিট চালু করা হয়। প্রতি ইউনিটে দিনে চার হাজার হ্যান্ডসেট উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাসে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ হ্যান্ডসেট। আপাতত এতে ছয়টি মডেলের হ্যান্ডসেট সংযোজন করা হবে।

 

বিনিয়োগ

এই হ্যান্ডসেট কারখানা স্থাপনের জন্য ওয়ালটনের শুরুর বিনেয়োগ ১০০ কোটি টাকা। আসছে বছরই আরো বিপুল পরিমাণ অর্থ এতে বিনিয়োগ করা হবে। ধারাবাহিক বিনিয়োগের জন্য আরো তহবিল রয়েছে বলে জানান ওয়ালটনের সিনিয়র অপারেটিভ ডিরেক্টর উদয় হাকিম।

 

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

৫ অক্টোবর কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন টেলিযোযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। এ সময় ছিলেন ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এস এম শামসুল আলম, ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এস এম রেজাউল আলম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মঞ্জুরুল আলম।

এই কারখানা স্থাপনের ফলে মোবাইল হ্যান্ডসেটের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে উল্লেখ করে তারানা হালিম বলেন, মানের দিক থেকে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকবে ওয়ালটন। ভবিষ্যতে দেশের বাইরেও বাংলাদেশের এই হ্যান্ডসেট রপ্তানি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আর সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের হ্যান্ডসেট মানুষের কাছে তুলে দেওয়ার কথা জানান এস এম  শামসুল আলম ও এস এম রেজাউল আলম।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

২০১৮ সালেই উৎপাদন ইউনিট ১০-এ উন্নীত করতে চায় ওয়ালটন। বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা নিতে চায় এক কোটিতে, যেখানে ৭০ লাখ সাধারণ এবং ৩০ লাখের মতো স্মার্টফোন তৈরি হবে। এ ছাড়া হ্যান্ডসেটের কেসিং, চার্জার, ব্যাটারি, ইউএসবি কেবল, ডিসপ্লে, ইয়ারফোনসহ হ্যান্ডসেটের বেশির ভাগ যন্ত্রাংশও যেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যায়, সে চেষ্টাও করবে তারা।


মন্তব্য