kalerkantho


নীলফামারী

যাত্রাশিল্পের জয়গান

নীলফামারী প্রতিনিধি   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অশ্লীলতার দুর্দিনে সুস্থধারার যাত্রাশিল্পের বিকাশ ঘটাতে নীলফামারীতে কাজ শুরু করেছে একদল প্রবীণ ও নবীন সাংস্কৃতিককর্মী। জেলার বিভিন্ন স্থানে তারা আয়োজন করছে সবার উপভোগ্য সুস্থধারার যাত্রাপালা। তাদের এমন উদ্যোগ দর্শক-শ্রোতার মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। শিল্পীরা বলেছেন, শোষণ, জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে অভিনয় যেমন একটি বিপ্লব, তেমনই সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠায়ও অভিনয় অন্যতম একটি মাধ্যম। অন্যদিকে দর্শক-শ্রোতারা বলেছেন, সুস্থধারার বিনোদনের খুবই অভাব। দীর্ঘদিন পর এমন বিনোদন উপভোগ করতে পেরে তাঁরা আনন্দিত।

জেলা সদরের খোকসাবাড়ী ইউনিয়নের বোর্ডেরহাট নামক স্থানে ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে আয়োজন করা হয়েছিল ছয় দিন ধরে যাত্রাপালার। শুক্রবার ছিল এর শেষ দিন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যাত্রাপালায় বিভিন্ন বয়সের পাঁচ সহস্রাধিক দর্শক-শ্রোতা। কোনো হৈ-হল্লা নেই। মনোযোগ সহকারে তারা উপভোগ করছে রঞ্জন দেবনাথ রচিত ‘জীবন নদীর তীরে’ যাত্রাপালা। জানতে চাইলে রামকলা গ্রামের অনাথ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আগোত শীত আসিলে গ্রামোত মেলা হইতো, যাত্রা হইতো। রাইতোত মা-বাবার হাত ধরি যাত্রা শুনির গেছিনো। তারপর এমন দিন আসিল, যাত্রা শুনির খারাপ মাইনষি ছাড়া কাহো যায় না। মেলা দিন পর আজি আগের মতন যাত্রা দেখির পারিনু।’ খোকসাবাড়ী গ্রামের এমদাদুল হক বলেন, ‘এলাকায় এখন আর আগের মতো যাত্রার আয়োজন হয় না। যেটুকু হয় তাতে অশ্লীলতার জন্য সেখানে যাওয়াই যায় না। এবার অশ্লীলতা মুক্ত যাত্রাপালা উপভোগ করে মনটা ভরে গেল।’ যাত্রাপালায় পুরুষ চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন স্থানীয় উদ্যোগী শিল্পীরা। নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার পেশাদার শিল্পীরা।

যাত্রাপালার একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্থানীয় শিল্পী আফজালুল হক (৫৫)। তিনি রয়েছেন একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায়। তিনি বলেন, ‘অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা কাজ করছি। এ জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন যশোরের কল্পনা সেন (৫৫)। তিনি গত ৪০ বছর ধরে আছেন যাত্রাশিল্পে। তিনি বলেন, ‘বেলেল্লাপনার কারণে গত কয়েক বছর অভিনয় করিনি। এখন সুস্থধারার যাত্রাপালার কথা শুনে আবার অভিনয়ে এসেছি। এখানে এসে মানুষের উৎসাহ দেখে ভালোই লাগছে।’

যাত্রাশিল্পে একটি অপেরা দলের মিউজিক পরিচালক মকছেদুল রহমান (৬০) বলেন, ‘১৯৮৬ সালে এসেছি এ পেশায়। সে সময় আর এ সময়ের মধ্যে অনেক তফাত। শিল্পীরা অশ্লীলতা চায়ন না, কিন্তু তাঁদের দিয়ে সেটি করানো হয়। তবে পেটের দায়ে অনেকে সেটি করতে বাধ্য হন। আমরা চাই আড়াই শ বছরের সেই পুরনো শিল্প ফিরে আসুক।’

খোকসাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান প্রধান বলেন, ‘সুস্থধারার যাত্রাশিল্পের বিকাশে এলাকাবাসীর উদ্যোগে ছয় দিন ধরে যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে যাত্রা সবাই উপভোগ করেছেন।’ জেলা সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক আহসান রহিম মঞ্জিল বলেন, ‘আমরা সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশের পক্ষে। আর সুস্থধারার বিনোদন বিকাশে আমাদের সহযোগিতা অবশ্যই থাকবে। যাত্রা ফেডারেশন যে কাজটি শুরু করেছে, তাতে আমাদের সমর্থন রয়েছে।’


মন্তব্য