kalerkantho

জন্মান্ধতা জয়

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জন্মান্ধতা জয়

মিজানুর রহমান

দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও প্রবল স্মরণশক্তির গুণে স্বাবলম্বী হয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যকে জয় করল জন্মান্ধ মিজানুর রহমান (১৫)। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেনি। এ দুঃখ তাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাই বাধ্য হয়ে টাকা উপার্জনের পথে নামে। কিন্তু শুরুর দিকে তাকে নানা ধরনের অবহেলার শিকার হতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেধা ও স্মরণশক্তি দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে। এখন সে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করে পরিবারের অর্থ সংকট অনেকটা কমিয়েছে।

অন্ধ হয়েও ফ্লেক্সিলোড করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কিভাবে করে? এ কৌতূহল অনেকের মধ্যে। কিন্তু মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফ্লেক্সিলোড করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগে অন্ধ মিজানের। দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করলেও একবারও ভুল করেনি। মোবাইল নম্বর তার লিখে রাখার প্রয়োজন হয় না। পুরো দিনের লেনদেনের হিসাব মুখস্থ থাকে।

চোখে না দেখে মোবাইল ফোনে টাকা লেনদেন করা যায় কিভাবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘কোন বাটনে কোন সংখ্যা, এটা মোবাইল সেটের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারি। ব্যবহার করতে করতে আমার সব জানা হয়ে গেছে। ফ্লেক্সিলোড করার ক্ষেত্রে মোবাইলের কোন বাটন টিপতে হবে, কোন অপশনে যেতে হবে—সেটাও আমার জানা হয়ে গেছে। বর্তমানে আমি ইউনম্যাক্স, ওয়াল্টন ও নকিয়া কম্পানির সেট ব্যবহার করছি। এতে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

বিকাশে (ব্র্যাক ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং) বা রকেটে (ডাচ্-বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং) টাকা পাঠাতে তার সমস্যা নেই।

শুধু ইনকামিংয়ের ক্ষেত্রে তাকে সংশ্লিষ্ট কম্পানির হট লাইনে কথা বলে নিশ্চিত অথবা অন্য কারো সহযোগিতা নিতে হয়। রূপালী ব্যাংকের শিওর ক্যাশে শিক্ষার্থীদের পাঠানো উপবৃত্তির টাকাও সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসে। গত ছয় মাস ধরে টাপুরচর বাজারে এই ব্যবসা করছে মিজান। তার মামা নুরুল ইসলামের দোকানের বারান্দায় চেয়ার-টেবিল বসিয়ে টাকা লেনদেনের এই ডিজিটাল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

মিজানের মামা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা শিওর ক্যাশের মাধ্যমে আউট করে সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিত। পরে তাকে আমার দোকানের সামনে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছি। সে সফলভাবে এ ব্যবসা করছে। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। তা ছাড়া আমি তাকে এ কাজে সব ধরনের সহযোগিতা করছি। টাকার নোট চিনতে মাঝে মাঝে দু-একবার সমস্যা হয়। তখন পাশের দোকানদার বা আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে সহযোগিতা করি।’

রৌমারী উপজেলার টাপুরচর বাজারে গিয়ে বিস্তারিত কথা হয় অন্ধ মিজানের সঙ্গে। তখন পার্শ্ববর্তী এক দোকানদার বলেন, ‘সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতোই মিজান কাজ করছে। গ্রাহকের সঙ্গে টাকা আদান-প্রদানে কোনো ঝামেলার ঘটনা আমি দেখিনি।’

টাপুরচর বাজারের আব্দুর রফিক নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি একদিন গ্রামীণফোনে রিচার্জ করার জন্য মিজানের দোকানে যাই। মোবাইল নম্বর ও রিচার্জের পরিমাণ বলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা করে দেয়। এ কাজে তার মনোবল ও স্মরণশক্তি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।’

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার টাপুরচর টাঙ্গারী পাড়া গ্রামে মিজানুর রহমানের বাড়ি। বাবা মন্তাজ আলী একজন দিনমজুর। মা মমিনা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সংসারে একমাত্র ছেলে মিজানুর রহমান।

বাবা মন্তাজ আলী বলেন, মিজান জন্মান্ধ। এরপরও জন্মের পর চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার চোখে অপরাশেন করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছিল না। তাই অপারেশন করা হয়নি। অর্থ সংকটের কারণে মিজানকে পড়াতেও পারেননি। তবে সে এখন টাকা আয় করে পরিবারকে সাহায্য করছে।

টাপুরচর বাজারের বাসিন্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম বাদল বলেন, ‘চোখে দেখতে না পারলেও মিজানুর রহমান অনেক মেধাবী। যেকোনো কথা একবার শুনেই বলে দিতে পারে। আমরা তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি, অন্ধ হয়ে মোবাইল ফোনে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করা যায়। কিন্তু তার সাহস, মনোবল আর স্মরণশক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’


মন্তব্য