তিনি বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের কিছু রোজা কাজা থাকত, কিন্তু আমি তা আদায় করতে পারতাম না, যতক্ষণ না শাবান মাস আসত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫০)
রমজানের আগমনের জন্য ছয় মাস দোয়া
সাহাবায়ে কিরাম (রা.) রমজানের জন্য এমনভাবে প্রস্তুতি নিতেন যে তাঁরা ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন, যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। তারপর, রমজানের পরবর্তী ছয় মাস তাঁরা আবার দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাঁদের রোজা ও ইবাদত কবুল করেন। এভাবে তাঁদের পুরো বছরজুড়ে রমজানের ছোঁয়া লেগে থাকত। (আসরারুল মুহিব্বিন ফি রমাজান, পৃষ্ঠা-৪২)
সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ কিছু দোয়া করতেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দোয়া করতেন : হে আল্লাহ! আমাদের বেশি দান করো, আমাদের কম দিয়ো না, আমাদের সম্মান ও মর্যাদা দাও, আমাদের লাঞ্ছিত কোরো না, আমাদের দান করো, বঞ্চিত কোরো না, আমাদের অগ্রগামী করো, আমাদের ওপর অন্য কাউকে অগ্রগামী কোরো না, আমাদের সুপ্রসন্ন করো এবং আমাদের ওপর সুপ্রসন্ন থাকো। (আল মুসতাদরিক আলাস সহিহাইন, হাদিস : ১৯৮৫)
উসাইদ বিন আবি তালিব (রা.) দোয়া করতেন : হে আল্লাহ! আমাদের পরিণাম সব বিষয়ে সুন্দর করো এবং আমাদের দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও পরকালের শাস্তি থেকে রক্ষা করো। (আল জামিউস সগির, হাদিস : ১৪৫০)
হুসাইন ইবনে আলী (রা.) দোয়া করতেন : হে আল্লাহ! তুমি যাদের সঠিক পথে পরিচালিত করেছ, আমাদেরও তাদের সঙ্গে হেদায়াত দাও। তুমি যাদের নিরাপদে রেখেছ, আমাদেরও নিরাপদ রাখো। তুমি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছ, আমাদেরও গ্রহণ করো। তুমি আমাদের যা দান করেছ, তাতে বরকত দাও।
তুমি যা ফয়সালা করেছ, তার অনিষ্ট থেকে আমাদের রক্ষা করো। তুমি ফয়সালা করো, কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে কেউ ফয়সালা করতে পারে না। তুমি যার বন্ধু, সে কখনো লাঞ্ছিত হয় না। তুমি বরকতময়, তুমি মহান। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭২২, আল ফিরদাউস বিমাসুরিল খিতাব, পৃষ্ঠা-৪৮৩)
শাবান মাসে নফল রোজার অভ্যাস
সাহাবায়ে কিরামের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। শাবান ছিল রমজানের এক অনন্য প্রস্তুতি পর্ব, যেখানে রোজা, কোরআন তিলাওয়াত এবং অন্যান্য নেক আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই অভ্যাস তাদের রমজানের ইবাদতের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করত। (নিদাউর রাইয়ান ফি ফিকহিস সওম ওয়া ফাজলি রমাজান, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৭৯)
নবী করিম (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। বলা হয়, এর কারণ হলো—এই মাসে মানুষ সাধারণত রোজার ব্যাপারে গাফিলতি করে। নবী করিম (সা.) স্বয়ং এ সম্পর্কে বলেছেন : এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী হওয়ায় অনেক মানুষ এর ব্যাপারে গাফেল থাকে। অথচ এটি এমন এক মাস, যখন মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আমি চাই যে আমার আমল যখন আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে, তখন আমি রোজাদার থাকি। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ২৩৫৭)
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন : আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাসের চেয়ে বেশি কোনো মাসে রোজা রাখতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৭০)
সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে কেউ কেউ শাবানের রোজার প্রতি এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে তারা রমজানের মতোই এ মাসের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। যেমন—লুলুওয়াহ (রা.), যিনি আম্মার বিন ইয়াসির (রা.)-এর সেবিকা ছিলেন, বর্ণনা করেন, তিনি শাবান মাসের জন্য এমনভাবে প্রস্তুতি নিতেন, যেভাবে রমজানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। (আত-তাবসিরা, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৭)
যেভাবে রমজানকে স্বাগত জানাব
মুসলমানদের জন্য রমজান মাসের আগমন এক মহা নিয়ামত, যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ দান। আল্লাহ তাঁর সে বান্দাকে কখনো ফিরিয়ে দেন না, যে অন্তর দিয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা করে। এটি স্পষ্ট হয় সেই ঘটনার আলোকে, যা আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন—
একবার কুজাআ গোত্রের বালী গোত্রের দুই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের একজন যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হন, আর অন্যজন এক বছর পর ইন্তেকাল করেন। তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি একবার স্বপ্নে জান্নাত দেখতে পেলাম এবং লক্ষ্য করলাম, যে ব্যক্তি পরে ইন্তেকাল করেছেন, তিনি শহীদের আগেই জান্নাতে প্রবেশ করেছেন! আমি এতে বিস্মিত হলাম। সকালে উঠে এ বিষয়ে নবী করিম (সা.)-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, সে কি পরের বছর রমজান মাস পেয়েছিল না? সে কি ছয় হাজারেরও বেশি রাকাত নামাজ আদায় করেনি কিংবা আরো কিছু? (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮৩৯৯)
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রমজান মাস পাওয়া এবং তাতে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকা কত বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তাই যে ব্যক্তি সত্যিই রমজান মাসকে যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রস্তুতি নিতে চায়, তার কিছু করণীয় হলো—
১. অন্তরে রমজান পালনের আগ্রহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি করা। ২. বেশি বেশি নেক আমল করা, যেন রমজানে ইবাদতের জন্য আত্মা ও শরীর প্রস্তুত থাকে।
৩. কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো।
৪. অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে খাঁটি তাওবা করা।
৫. দরিদ্র ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো এবং দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তোলা।
এভাবেই একজন মুসলিম রমজানের আগমনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে পারে এবং এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত কল্যাণময় করে তুলতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের রমজানকে স্বাগত জানিয়ে তাতে বেশি বেশি ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।