নতুন মৌসুম সামনে রেখে আমের রাজ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাগান ও গাছ পরিচর্যা চলছে জোরেশোরে। জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার পাঁচ উপজেলার ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমির ৮১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪০টি আমগাছের ৯০ শতাংশেই মুকুল এসেছে।
চলতি মৌসুমের আবহাওয়া শুরু থেকেই যথেষ্ট অনুকূল বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। মৌসুমে শীতের তীব্রতা কম থাকায় মুকুল এসেছে সময়মতো।
ফলে ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো মুকুল আসার সম্ভাবনা নেই। তবে দেরিতে আসা (নামলা) কিছু মুকুল বড় হবে। চলতি মৌসুমের ডিসেম্বরে জেলার সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও জানুয়ারিতে তা বেড়ে যায় বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
চলতি বছর হেক্টরপ্রতি ১০.৩ মেট্রিক টন হিসেবে ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার ২৯০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে।
গত মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৩ লক্ষ টন, তবে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ২৭৮ টন।
গত মৌসুমে ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। সেবার ১৩৩ টন আম রপ্তানি হয় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এবার সে পরিমাণ বাড়বে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, গত রবিবার জেলায় হঠাৎ বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অফিস না থাকায় জেলার বৃষ্টিপাতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে কৃষি বিভাগ জেলায় গড়ে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে। সর্বাধিক বৃষ্টি হয় ভোলাহাট উপজেলায়। ১০ মিলি মিটার।
এ ছাড়া জেলার অন্য কোথাও ১ থেকে ২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা বৃষ্টিতে প্রস্ফুটিত মুকলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
কৃষি বিভাগও এই শঙ্কার কথা জানিয়েছে। তবে তারা বলছে, সকালে বৃষ্টির পর রোদ ওঠে। যা ক্ষতি কমাতে সাহায্য করেছে। এ ছাড়া বৃষ্টি হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। কিছু এলাকায় ছিটেফোটা বৃষ্টি হয়েছে।
তবে অনেক কৃষক বলছেন, আমের জন্য ফাল্গুনের পানি আগুন। যত কমই হোক, তা ফুল নষ্ট করে। ফাল্গুনের পানিতে ক্ষতি ছাড়া কখনও লাভ হয় না।
এদিকে, পেশাদার বাগানিরা বৃষ্টির পরপরই মুকুল রক্ষায় ছত্রাকনাশক (ফাংগিসাইড) স্প্রে শুরু করেছেন। সাথে ব্যবহার করছেন আমের ‘মহাশত্রু’ বলে বিবেচিত হপার পোকা (মহা) দমনে কীটনাশক। মাকড়নাশকও দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষিবিদ ইনিস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ সোহেল বলেন, ‘জেলার বাগানিরা সাধারণত প্রতি মৌসুমে প্রথমে পাতায়, এরপর মুকুল বড় হয়ে প্রস্ফুটিত হবার ঠিক আগে দ্বিতীয়বার ও গুটি ধরার পর মার্বেলাকৃতি হলে তৃতীয়বার প্রয়োজনীয় বালাইনাশক ব্যবহার করেন। এ ছাড়া পরিস্থিতি, আবহাওয়া, রোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ অনুযায়ী স্প্রে করা হয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যাণতত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘চলতি বছর আম উৎপাদনের অন ইয়ার। পরিস্থিতি ভালো। এখন গাছের গোড়ায় সেচ বা পানি দেওয়া জরুরি।’ আম প্রক্রিয়াজাত করে সারা বছর রপ্তানির কথাও বলেন এই কৃষিবিদ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক ড. পলাশ সরকার বলেন, ‘সবচেয়ে আশার কথা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষি ও বাগানিরা এখন সচেতন ও দক্ষ। তারা বাগান ব্যবস্থাপনা বোঝে। তবে এবার ফাল্গুন মাসে আর বৃষ্টি না হলেই ভালো। এ মৌসুমে যথেষ্ট উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে। শিবগঞ্জ অঞ্চলের পুরাতন গাছ কাটায় গত বছরের তুলনায় এবার ১০০ হেক্টর বাগান কমে গেছে। তবে তা উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে না। কৃষকরা এখন ঘন ছোট গাছের বাগানের দিকে ঝুঁকছেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বাগানি মুনজের মানিক বলেন, ‘ফজলি, ক্ষীরসা, আশ্বিনা ও ল্যাংড়া আমের চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভৌগলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি রয়েছে। গোপালভোগ আমের জিআই স্বীকৃতির আবেদনের প্রক্রিয়া চলছে। আম শুধু জেলার কৃষিপণ্য নয়। সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চলতি বছর আমের ফলন কৃষি বিভাগের হিসাবের চাইতে বেশি হবে বলে আশাবাদী।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘জেলার লক্ষ মানুষ আম সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানে জড়িত। চেম্বার আম উন্নয়ন ও রপ্তানি বাড়াতে সরকারকে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। চীন আম ও কাঁঠাল নিতে আগ্রহী।’
এবার চার লক্ষাধিক টন আম উৎপাদন হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমের নায্য মূল্য যাতে কৃষকরা পায় সে লক্ষ্যে কাজ করছে চেম্বার। এটি জরুরি।’
আমচাষি ও বাগান পরিচর্যাকারী সদর উপজেলার রামকৃষ্টপুর গ্রামের মন্টু মিয়া (৬২) বলেন, ‘এখনও ৯০ শতাংশ গাছে পুরোপুরি মুকুল আসেনি। এখনও কিছু গাছে মুকুল আসছে।’ তবে এবার ফলন বাম্পার হবে বলে তিনি আশাবাদী।