<p style="text-align: justify;">হাম সংক্রমণে বরিশাল অঞ্চলে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম বরগুনা। সন্দেহজনক আক্রান্ত এবং নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা এ জেলায় বেশি; এমনকি হামে মৃত্যুর ঘটনাও এখানে বেশি। কিন্তু সাগরতীরের এই জেলা সংক্রমণের কেন্দ্র হয়েও পিছিয়ে রয়েছে চিকিৎসায়।</p> <p style="text-align: justify;">চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ৭৭ জন নিশ্চিত হাম রোগীর মধ্যে ৩৮ জনই বরগুনার, যা প্রায় অর্ধেক। একই সঙ্গে নিশ্চিত মৃত্যুর তিনটি ঘটনাই এই জেলার। অর্থাৎ সংক্রমণের তীব্রতা যেমন বেশি, তেমনি জটিলতাও এখানে অত্যন্ত প্রকট। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই চাপ সামলানোর মতো প্রস্তুতি কী বরগুনায় রয়েছে?</p> <p style="text-align: justify;"><strong>রোগীর ভিড় শেবাচিমে, নিশ্চিত সংক্রমণ ও মৃত্যু বরগুনায়</strong><br /> বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এক হাজার ৫৪২ জন সন্দেহজনক রোগী বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ রোগী শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)-এ চিকিৎসা নিয়েছে। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের একজন শেবাচিম হাসপাতালেই এসেছে। পটুয়াখালীতে এই হার ২২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বরগুনায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।</p> <p style="text-align: justify;">এই বিপুলসংখ্যক (এক হাজার ৫৪২) সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে মাত্র ৭৭ জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। এর মধ্যে ৩৮ জনই বরগুনার, যা মোট আক্রান্তের ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ, অথাৎ প্রায় অর্ধেক। বরিশালে এই হার ১৮ দশমিক ২ শতাংশ, আর ভোলা ও ঝালকাঠিতে প্রায় ১০ শতাংশ করে।</p> <p style="text-align: justify;">স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর সন্দেহজনক ১৫টি মৃত্যুর মধ্যে তিন শিশুর শরীরে হাম সংক্রমণের প্রমাণ মেলে। ওই তিন শিশুই বরগুনার। অর্থাৎ রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও নিশ্চিত হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি এ জেলায়। বিপরীতে, শেবাচিমে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি, কিন্তু নিশ্চিত হামের রোগী ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একজনও শনাক্ত হয়নি।</p> <p style="text-align: justify;"><strong>প্রায় ৭০ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য</strong><br /> বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট সবচেয়ে তীব্র আকারে দেখা যাচ্ছে। এখানে মোট ৫২টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ৩৬টিই শূন্য, যা ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিনজনের জায়গায় কার্যত একজন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালাতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপের জায়গা চিকিৎসক পর্যায়ে।  সহকারী সার্জন, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও ডেন্টাল সার্জন, এই ক্যাটাগরির মোট ২৭টি পদের মধ্যে ১৯টিই শূন্য, যা ৭০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।</p> <p style="text-align: justify;">বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রেও জনবল সংকট স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ল্যাব, রেডিওগ্রাফি, ফার্মাসি, বায়োকেমিস্ট্রি, ডেন্টাল, ইপিআই ও ফিজিওথেরাপি শাখা মিলিয়ে মোট ১৭টি পদের মধ্যে ১০টিই শূন্য, যা প্রায় ৫৮ দশমিক ৮২ শতাংশ।</p> <p style="text-align: justify;">নার্সিং ও সেবা ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে চিত্র কিছুটা স্বস্তিদায়ক। ১০৩টি পদের মধ্যে আটটি শূন্য, যা প্রায় ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সংখ্যাগতভাবে শূন্যপদ কম হলেও ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ স্তরে, যেমন সেবা তত্ত্বাবধায়ক ও উপসেবা তত্ত্বাবধায়কের পদ ফাঁকা থাকায় সামগ্রিক সমন্বয় ও তদারকিতে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।</p> <p style="text-align: justify;">অন্যদিকে, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রে সংকট আরো প্রকট। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সেবার ওপর। ল্যাব টেস্ট, এক্স-রে বা অন্যান্য ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম অনেক সময় দেরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট না থাকায় বিদ্যমান কর্মীদের অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। ফলে সেবা প্রদানের গতি ও নির্ভুলতা- দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।</p> <p style="text-align: justify;">প্রশাসনিক কাঠামোতেও ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো পূরণ হয়নি।</p> <p style="text-align: justify;">জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া গেলেও জটিল রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবা সীমিত। ফলে রোগীর অবস্থা খারাপ হলেই তাকে পাঠাতে হচ্ছে বরিশাল বা অন্য বড় হাসপাতালে। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে ঝুঁকি। টিকাদান কভারেজ ও সচেতনতার ঘাটতিও সংক্রমণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। অনেক শিশুই নিয়মিত টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে, আবার অনেক পরিবার দেরিতে হাসপাতালে আসছে।</p> <p style="text-align: justify;">সব মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসছে, তা উদ্বেগজনক। সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠলেও চিকিৎসা অবকাঠামো সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি বরগুনায়। এর আগেও ডেঙ্গুতে অন্তত ৫০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। তখনো দেশের শীর্ষে ডেঙ্গুতে ছিল এই বরগুনা। তারই ধারাবাহিকতায় বিভাগে হামেও শীর্ষে রয়েছে। সঙ্গে নতুন করে মাথাচড়া দিয়েছে ডায়রিয়া। </p> <p style="text-align: justify;">হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রোগীর চাপ বাড়লেও জনবল না বাড়ায় বিদ্যমান কর্মীদের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার পরও ডেঙ্গু, হাম এবং ডায়রিয়ার মতো মহামারী সামাল দিতে হচ্ছে বছর বছর। </p>