<p>হাওরের বিশাল জলরাশির দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন কৃষক সোলেমান মিয়া। যে জমিতে কয়েক দিন আগেও সোনালি ধানের শীষ বাতাসের তালে দুলত, সেখানে এখন শুধু অথই জল। অধিকাংশ ধান তলিয়ে গেছে অকাল বন্যায়। তবুও সেই ধানের মায়া কাটাতে পারছেন না তিনি। সুযোগ পেলে ছুটে যান হাওরের পাড়ে; তাকিয়ে থাকেন ডুবে যাওয়া স্বপ্নের দিকে। বুকফাটা আর্তনাদ আর চোখের জল এখন তার নিত্যসঙ্গী।</p> <p>সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নয়ানগর গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী কৃষক সোলেমান মিয়া এখন এক বিধ্বস্ত স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। নিজের ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। আশা ছিল, ধান গোলায় তুলে জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামত করবেন। কিন্তু প্রকৃতি বিমুখ হয়েছে। অন্তত দেড় লাখ টাকার ফসলি ক্ষতির মুখে পড়ে সোলেমানের হৃদয়ে এখন গভীর ক্ষত।</p> <p>শনিবার দুপুরে কুড়ির হাওরে দেখা মেলে বিষণ্ন সোলেমানের। পরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর রূপ। ১০ বছর আগের পুরোনো জরাজীর্ণ ঘরটি কোনোমতে খুঁটি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কয়েক দিনের ঘূর্ণিঝড়ে চালের টিন উড়ে গিয়ে অবস্থা আরও নাজুক। বারান্দায় অলস পড়ে আছে শ্যালো মেশিন আর একগাদা খালি বস্তা—যেগুলোতে এবার ধান ওঠার কথা ছিল।</p> <p>আলাপকালে সোলেমান বলেন, ‘কৃষিই আমার সব। ১০ বিঘা চাষ করতে এক লাখ টাকার বেশি খরচ হইছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার টাকাই মহাজনের ঋণ। আশা আছিল ২০০ মণ ধান পামু, সেই টাকা দিয়া ঘর ঠিক করমু। এখন সব শ্যাষ। ঋণের টাকা কেমনে দিমু আর পরিবাররে কী খাওয়ামু, হেই চিন্তায় রাইতে ঘুম ধরে না।’</p> <p>সোলেমান যখন কথাগুলো বলছিলেন, ‘এই বছর ধান চাষ কইরা আমগোর বাঁচার উপায় নাই। পোলাপানের মুখে খাবার দিমু কী দিয়া আর মহাজনের ঋণ বা শোধ করমু কেমনে? আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই।’</p> <p>শুধু সোলেমান নন, হাওরাঞ্চল মধ্যনগর উপজেলার হাজারো কৃষকের গল্প এখন একই সুতোয় গাঁথা। সরকারি হিসাবে ৭৫ শতাংশ ধান কাটার দাবি করা হলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। কৃষকদের দাবি, এখনো অর্ধেকের বেশি ধান মাঠেই রয়ে গেছে। হাওরের ঢেউ যখন পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে, তখন যেন কৃষকের স্বপ্নভঙ্গের শব্দই শোনা যায়। <br /> স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তার হাত না বাড়ালে ঋণের বোঝা আর ক্ষুধার জ্বালায় নিঃস্ব পরিবারগুলোর ঠাঁই হবে পথে।</p> <p>উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মধ্যনগর উপজেলায় ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন ১৯ হাজার ৬৫০ কৃষক। শনিবার পর্যন্ত ৭৫.৭ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এ বছর জলাবদ্ধতা ও অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৪২৫ হেক্টর। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এখনো ৪০ শতাংশ ধানও কাটা হয়নি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।</p> <p>মধ্যনগর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ধর্মপাশা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করছি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে তা দ্রুত কৃষকদের দেওয়া হবে।’</p>