<p style="text-align: justify;">একসময় ঘন সবুজ অরণ্যে ঢাকা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল। মেঘ ছোঁয়া সবুজ পাহাড়, ঝিরি-ঝর্ণার কলতান আর জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ ছিল এ অঞ্চল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সবুজ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেছে। </p> <p style="text-align: justify;">বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচার বন উজাড়, অপরিকল্পিত জুম চাষ, ইটভাটা ও কাঠ পাচারের ফলে পাহাড়ের বুক আজ ক্ষত-বিক্ষত। একসময়ের সবুজ আচ্ছাদন হারিয়ে বহু পাহাড় এখন পরিণত হয়েছে ন্যাড়া, অনুর্বর ভূমিতে—যা প্রকৃতির নীরব আর্তনাদ বহন করছে। </p> <p style="text-align: justify;">স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ সংগঠন, পরিবেশবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবর্তনের এই ভয়াবহ প্রভাব এখন স্পষ্ট যা উদ্বেগজনক। এতে পাহাড়ধসের ঘটনা বাড়ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি-ঝর্ণা; তীব্র হচ্ছে পানির সংকট। একই সঙ্গে বিলুপ্ত হচ্ছে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল। পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা শুধু প্রকৃতির ক্ষতি করছে না, সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, কৃষি ও অর্থনীতিতে।</p> <p style="text-align: justify;">তবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগে ন্যাড়া পাহাড়কে পরিকল্পিত বনায়ন, ফলজ-বনজ চাষ, হিমাগার স্থাপন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন রিসোর্ট ও তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ কক্সবাজারকে পর্যটন করিডোরের আওতায় আনা গেলে বদলে যেতে পারে পুরো পার্বত্য জনপদ।</p> <p style="text-align: justify;">রোয়াংছড়ি উপজেলার প্রু কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাসহ বেশ কয়েককজন বাসিন্দা বলেন, শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনাই নয়- পরিকল্পিত বনায়ন ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো পরিবেশগত ভারসাম্যও। বাঁচতে পারে পাহাড়, ফিরতে পারে পানির উৎস। এতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম হতে পারে।</p> <p style="text-align: justify;">বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার (৫,১৩৩ বর্গমাইল)। এ অঞ্চলের প্রায় ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির মধ্যে একসময় ১১ লাখ ৫ হাজার ৩৫৩ হেক্টর এলাকা ঘন সবুজ বনভূমিতে আচ্ছাদিত ছিল (প্রায় ৮০ শতাংশ)। দেশের মোট ভূমির প্রায় এক-দশমাংশ বা প্রায় ১১ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই পার্বত্য অঞ্চল যা একসময় জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক অরণ্যের আধার হিসেবে পরিচিত ছিল।</p> <p style="text-align: justify;">কিন্তু গত ৫০ থেকে ৬০ বছরে অবাধে প্রচলিত আদি পদ্ধতির চাষাবাদ (জুম চাষ), নির্বিচারে কাঠ পাচার এবং যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপনের মতো নানা কারণে এই বনভূমি উজাড় হয়েছে। ফলে বর্তমানে এসব এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বনভূমি ধ্বংস হয়ে ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হয়েছে।</p> <p style="text-align: justify;">জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, মোট বনভূমির মধ্যে প্রায় সাত লাখ ১০ হাজার ৬০৩ হেক্টর ‘ইউনক্লাসড স্টেট ফরেস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত, যা কার্যত অরক্ষিত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যবহারনির্ভর। এ কারণে এসব এলাকায় বন উজাড়ের হার তুলনামূলক অনেক বেশি।</p> <p style="text-align: justify;">গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর জুম চাষের ফলে প্রায় ২০ হাজার  হেক্টর এবং কাঠ পাচার, ইটভাটা ও অন্যান্য কার্যক্রমের কারণে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর পাহাড়ি বনভূমি উজাড় হচ্ছে।</p> <p style="text-align: justify;">এছাড়া বন বিভাগের তথ্যমতে, তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৬৪৪ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি বর্তমানে অবৈধ দখলে রয়েছে। এর ফলে শুধু বনভূমির পরিমাণই কমছে না, বরং এর গুণগত মানের দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে।</p> <p style="text-align: justify;">এই পরিস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা মোকাবেলায় জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।</p> <p style="text-align: justify;">এদিকে, এই সংকটের মাঝেও আশার আলো দেখছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে ন্যাড়া পাহাড়গুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। ফলজ ও বনজ গাছের সমন্বয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ পুনরুদ্ধার হবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।</p> <p style="text-align: justify;">বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিকল্পিত বনায়ন হলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমবে, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার হবে, পানির উৎস ফিরে আসবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।  </p> <p style="text-align: justify;">বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আবু জাফর বলেন, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরে নির্বিচারে বন উজাড় হলেও পর্যাপ্ত বনায়ন হয়নি, ফলে পানি সংকট ও পাহাড় ধসসহ পরিবেশ বিপর্যয় বাড়ছে। তিনি মনে করেন, ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়ন করা হলে পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন হবে। অন্যদিকে প্রকৃতি দেখতে আসা পর্যটকদের চাহিদা পূরণ হবে এবং পর্যটন ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটবে। </p> <p style="text-align: justify;">পরিবেশবান্ধব তং রিসোর্টের নির্বাহী পরিচালক আব্দুর সত্তার বলেন, ন্যাড়া পাহাড়ে পরিকল্পিত বনায়ন হলে কৃষি, পর্যটন ও পরিবেশ- এই তিন খাতেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান, বাড়বে রাজস্ব আয়।</p> <p style="text-align: justify;">বান্দরবান পরিবেশবিষয়ক সংস্থা (তাজিংডং)-এর নির্বাহী পরিচালক চিং সিং প্রু মারমা বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা মূলত বন ও পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বন উজাড়ের ফলে তাদের জীবনযাত্রা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয়, পানি সংকট বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটছে।</p> <p style="text-align: justify;">চিং সিং প্রু মারমা এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে ন্যাড়া পাহাড়গুলোকে বনায়নের আওতায় আনার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।  তার মতে, বছরে পাঁচ  কোটি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা হলে পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যেই প্রাকৃতিক বন গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পের প্রসার ত্বরান্বিত হবে।</p> <p style="text-align: justify;">বান্দরবান মৃত্তিকাসম্পদ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, মাত্র এক ইঞ্চি উর্বর মাটি তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় ৩০০ বছর। অথচ প্রতিবছর পাহাড় থেকে ধুয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টন মাটি। তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত চাষাবাদ ও বন উজাড় বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন বনায়ন বাড়ালে মাটির আর্দ্রতা ফিরে আসবে, ঝিরি-ঝর্ণা টিকে থাকবে এবং পানির সংকট অনেকটাই কমে যাবে।</p> <p style="text-align: justify;">এদিকে গত ২১ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পার্বত্য অঞ্চলের পানি সংকট, বনায়ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী। তিনি বলেন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং পর্যটনের সমন্বিত উন্নয়ন হলে পার্বত্য এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার বড় পরিবর্তন সম্ভব।</p> <p style="text-align: justify;">এব্যাপারে স্থানীয় সাংসদ রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী কালের কণ্ঠকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আনারসসহ বিভিন্ন ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সারাদেশে। এসব ফল সংরক্ষণের জন্য এলাকাভিত্তিক হিমাগার নির্মাণ করা গেলে ন্যাড়া পাগাড়ে কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটবে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরো  শক্তিশালী হবে। এতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী স্বাবলম্বী হবে এবং তাদের মধ্যে শন্তি ও সম্প্রীতি জোরদার হবে।</p> <p style="text-align: justify;">সংসদ সদস্য বলেন, মহিপাল থেকে শুরু করে তিন পার্বত্য জেলা পেরিয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত পর্যটন করিডোর গড়ে তোলা গেলে তা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন রুটে পরিণত হতে পারে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।</p> <p style="text-align: justify;">বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, অবৈধ দখল ও কাঠ পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় সম্পৃক্ততা ও টেকসই কৃষি ও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন। </p>