<p>ভেঙে গেছে চারপাশের বেড়া ও বাঁশের খুঁটি। ছাউনির টিন ক্ষয়ে আকাশ দেখা যায়। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে দেওয়া হয়েছে পলিথিনের ছাউনি। দেখে মনে হয় দরজা-জালনাবিহীন জরাজীর্ণ ঘরটি একটুখানি বাতাস হলেই ভেঙে পড়তে পারে।</p> <p>এমন একটি ঘরে বসবাস জেসমিন বেগমের (৪২) পরিবার। জেসমিন বেগম নড়াইল সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের বিছালী গ্রামের তুফান মোল্যার স্ত্রী। </p> <p>জেসমিনের জরাজীর্ণ ঘরটি আলোকিত করতে বৈশাখ মাসে জন্ম হয়েছিল একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের। তাই তো মা-বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন বৈশাখী। শুধু মেয়ের নাম বৈশাখী রেখে থেমে যায়নি। জরাজীর্ণ ওই ঘরটির ও নাম রাখেন ‘বৈশাখী ভিলা’। বৈশাখ মাসে জন্ম নেওয়া মেয়ের নাম অনুসারে এ নামকরণ তাদের। </p> <p>কিন্তু বৈশাখ মাস এলে আতঙ্ক নেমে আসে তাদের জীবনে। আকাশের কালো মেঘ আর দক্ষিণা বাতাস বইলে ভয়ে কেঁপে উঠে ছোট্ট বৈশাখী। বাতাস শুরু হলে আশ্রয়ের খোঁজে পাশের বাড়িতে ছুটতে হয় পরিবারটিকে। </p> <p>সরেজমিনে দেখা যায়, মাটির মেঝেতে বসে মেয়ের চুলে চিরনি করছেন জেসমিন বেগম। কথা বলতে গেলে কষ্টের কথা জানান তিনি। </p> <p>এসময় জেসমিন বলেন, ‘স্বামীডা কাজ করতে পারে না। তিন বেলা তিনডা গ্যাসের বড়ি খায়। আমি আসে ধরে মানষির বাড়ি কাজ করি। জীবনে কোন দিন সুখই দেখতে পারিনি। অভাবের জন্য আগের পক্ষের দুইডা ছেলে মেয়ে একটা মাদরাসায় দিছি। অন্যটা পরের বাড়ি থাকে। আমার ছোট মাইয়াডা নিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘর, ও ঘর থেকে এ ঘরে যাই। আগের সংসারে ছেলে মেয়েডার জন্যি পরানডা কান্দে। কিন্তু তাদের কনে রাখব। তাদের ও তো বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে হয়। তাদের কনে শুতি দেব? তাদের ও মনডা কয় মার কাছে যায়ে থাকব। সব ছেলে মেয়ের তার বাব মার কাছে থাকতে চায়। আমারও রাখতি মবডা চায়। কিন্তু তাদের জাগা না থাকলি কনে থাকতি দেব?</p> <p>সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের একটা কার্ড ও করে দিনি। আমাদের ঘরের যদি টিন ও থাকত তা ও ছেলে মেয়ে নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম। কত মানুষ ৩০ কেজি করে চাল পায়, আমাদের কেউ দেয় না। ঈদের সময় মানুষরে সেমাই দেয়, চিনি দেয়, আমাদের কেউ দেয় না।’</p> <p>জেসমিন বেগম আরও বলেন, ‘স্বামী মাছ ধরে। যদি কোনো দিন মাছ পায় সেদিন দুই কেজি চাল আনে। যে দিন মাছ পায় না সেদিন চাল কিনা হয় না। এক সঙ্গে কোনো দিন পাঁচ কেজি চাল কিনা হয় না।’</p> <p>প্রতিবেশী টুকটুকি বেগম বলেন, ‘যখনই বৃষ্টি বা ঝড় আসে তখন ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে দৌড়ে এ বাড়ি ওবাড়ি যায় জেসমিন। রাতের বেলা ঘুমন্ত বৈশাখীকে নিয়ে কখনও কখনও আমাদের বাড়িতে চলে আসে। সরকার যদি তাদের একটু টিনের ব্যবস্থা ও করে দিত তাহলে অনন্ত রাতে নিশ্চিন্তে তারা একটু ঘুমাতে পারত।’</p> <p>বিছালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিমায়েত হুসাইন ফারুক বলেন, এমন একটি পরিবার আছে সেটি আমার জানা নাই। আমার কাছে কখনও তারা সাহায্যের জন্য আসেনি। যদি আসে তাহলে সরকারিভাবে সহায়তায় করার সুযোগ না থাকলে ও ব্যক্তিগতভাবে তাকে সহায়তা করা হবে।</p> <p>এ বিষয়ে নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবীর বলেন, ‘জেসমিন বেগমের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নিব। যদি তার জায়গাজমি না থাকে তাহলে আবাসন প্রকল্পের ঘর ফাঁকা রয়েছে আমরা সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিব। আর যদি স্বামীর ভিটায় থাকতে চায় তাহলে পরিবারটি আবেদন করলে আবেদনের প্রেক্ষিতে টিন বা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।</p>