<p>বর্তমান বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে পথ চলছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যেন একের পর এক সংকট এসে রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়ছে। কখনো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠছে, কখনো হাওরাঞ্চলের কৃষক চোখের সামনে ডুবে যেতে দেখছেন বছরের একমাত্র ফসল। কোথাও হাসপাতালের বেডে হাম আক্রান্ত শিশুর নিস্তব্ধ মুখ, কোথাও সম্ভাব্য বন্যার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন জনপদ।</p> <p>এমন প্রেক্ষাপটে সরকারকে প্রতিদিনই লড়তে হচ্ছে—অর্থনীতির সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, সীমিত সম্পদের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক চাপের সঙ্গেও। তবু সব প্রতিকূলতার মাঝেও রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখা, মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা এবং সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যে ধারাবাহিক প্রয়াস সরকার চালিয়ে যাচ্ছে, সেটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।</p> <p>কারণ সংকটের সময়েই বোঝা যায়, একটি রাষ্ট্র কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং তার নেতৃত্ব কতটা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।</p> <p>বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার নাম। তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিই যখন জ্বালানি সংকটে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ওপর চাপ এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া।</p> <p>বাংলাদেশও সেই সংকটের বাইরে ছিল না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়, পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয়, জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দরকষাকষি, কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।</p> <p>বিশেষ করে প্রায় তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় চালুর উদ্যোগ পরিস্থিতিকে নতুন করে স্বস্তি দিয়েছে। এটি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর ঘটনা নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।</p> <p>তবে জ্বালানি সংকটের ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই প্রকৃতি যেন আরেকটি কঠিন পরীক্ষা নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি বোরো ফসল। আর সেই বোরো উৎপাদনের বড় অংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। কিন্তু এ বছর ধারাবাহিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।</p> <p>কৃষকের চোখের সামনে কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তে ভেসে গেছে। যে কৃষক ধানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি এখন দাঁড়িয়ে আছেন অনিশ্চয়তার সামনে।</p> <p>হাওরের এই ক্ষতি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ দেশে চালের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।</p> <p>বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বাস্তবতায় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। কৃষি সহায়তা, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। যদিও বাস্তবতার নিরিখে এই সহায়তা আরো বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন, তবু সংকটময় মুহূর্তে সরকারের দ্রুত সাড়া ইতিবাচক বলেই বিবেচিত হতে পারে।</p> <p>কিন্তু এখানেই উদ্বেগের শেষ নয়। প্রকৃতির আচরণ দেখে আবহাওয়াবিদ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এ বছর বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, বড় বন্যা কখনো একক সংকট হয়ে আসে না; এটি খাদ্য সংকট, রোগব্যাধি, কর্মসংস্থান সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতাকে একসঙ্গে ডেকে আনে। ফলে সরকারকে এখনই সম্ভাব্য বন্যা মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার ও ওষুধ মজুদ করা, নদী ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ত্রাণ ব্যবস্থাপনাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি।</p> <p>অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের জন্য কম কঠিন নয়। নতুন সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সংকটের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর একটি বক্তব্যে, সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে গজ ব্যান্ডেজ কেনার মতো টাকাও নেই। একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাতের এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।</p> <p>বিগত সরকারগুলোর এই দুর্বলতার সুযোগেই দেশে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে হাম। বছরের পর বছর স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অবহেলার ফল আজ সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। শত শত শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন হাসপাতালে সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা-মায়ের কান্না যেন পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে।</p> <p>তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সরকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ হামের টিকা আমদানি করা হয়েছে এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতের জরুরি সংস্কারের কথাও সরকার বলছে। যদিও এই সংকট রাতারাতি সমাধান হবে না, তবু অন্তত সমস্যাকে অস্বীকার না করে মোকাবেলার চেষ্টা শুরু হয়েছে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ।</p> <p>একইসঙ্গে সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরো সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ক্রীড়া কার্ড কর্মসূচি এবং আগামী মাসে চালু হতে যাওয়া স্বাস্থ্য কার্ড বা ই-হেলথ উদ্যোগ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি বড় স্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া।</p> <p>কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সংকট কেবল অর্থনীতি বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; রাজনৈতিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিয়মিত সভা-সমাবেশ, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপ সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।</p> <p>গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের আন্দোলন অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু যখন একটি সরকার একই সময়ে অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করছে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।</p> <p>এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই হবে পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়। একইসঙ্গে বিরোধী দলগুলোরও মনে রাখা উচিত, একটি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়।</p> <p>বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা তাই এক বহুমাত্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা; একদিকে স্বাস্থ্যখাতের বিপর্যয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ। এসবের মধ্যেই সরকারকে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সুতরাং সরকারের সামনে ভুল করার সুযোগ খুব কম, অথচ জনগণের প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি।</p> <p>তবু বাস্তবতা হলো—সংকটের মধ্যেই নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত ও ইতিবাচক পদক্ষেপ আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু সামনে পথ আরো কঠিন হতে পারে। </p> <p>বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য বন্যা মোকাবেলা, স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে।</p> <p>রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস বলে, বড় সংকট কখনো কেবল সরকার একা মোকাবেলা করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, কার্যকর প্রশাসন এবং জনগণের আস্থা। সেই আস্থা ধরে রাখাই হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে বড় সাফল্যের মাপকাঠি।</p> <p>লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক</p>