<article> <p style="text-align: justify;">অন্তর্বর্তী সরকার একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল দুটি-পরিস্থিতির সামাল দেওয়া এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। দুটি কাজই তারা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এই অন্তর্বর্তী সময়ে দক্ষিণপন্থি ধর্মীয় দলগুলোর প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয় এবং সহনশীলতা প্রদর্শনের ফলে দেশের নানা স্থানে মব সন্ত্রাসরূপে অরাজকতার যে বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে, তার দায় ওই সরকারের ওপরই বর্তাবে।</p> <p style="text-align: justify;">সেই সঙ্গে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজও অনির্বাচিত সরকারটি সম্পন্ন করেছে; সেটি হলো আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন। এই চুক্তির মুখবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, উভয় দেশ যে সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিস্থাপক (resilient) সরবরাহ প্রবাহ রক্ষায় অঙ্গীকারে আবদ্ধ, তাদের গুরুত্ব দিয়েই চুক্তিটি করা হয়েছে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে কিন্তু যা ঘটেছে তা হলো বাণিজ্য চুক্তিটি যে কেবল অসম তা-ই নয়, বাংলাদেশের জন্য ওই তিন নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থিও বটে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তব্য বিষয়ে উল্লেখ আছে যৎসামান্য এবং প্রায় সবটাই বাংলাদেশের কর্তব্য পালনের অঙ্গীকারে ভরপুর। চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে বেশ কিছুদিন দেনদরবার করা হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু স্বাক্ষর করা হয়েছে অস্বাভাবিক দ্রুততায়, সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাক্ষরকারী বাণিজ্য উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, চুক্তিটির শর্তগুলো প্রকাশ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন হবে।</p> <p style="text-align: justify;">শেষ পর্যন্ত আমাদের সরকারের দিক থেকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের উৎস থেকেই শর্তগুলো প্রকাশ পেয়েছে। বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছিলেন যে আমরা যেন তাঁকে ভুলে যাই। তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর ওই কাজের জন্য তাঁর কথা তিনি আমাদের কিছুতেই ভুলতে দেবেন না। বহুকাল ধরে আমরা তাঁকে স্মরণে রাখতে বাধ্য হব, যদি না চুক্তি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি। চুক্তিতে বাংলাদেশের যা লাভ হয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ট্রাম্প কর্তৃক পূর্বারোপিত শতকরা ২০ ভাগ শুল্ককে ১ ভাগ কমিয়ে ১৯ ভাগে নিয়ে আসা। কিন্তু ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের কাজটিকেই সর্বাত্মকভাবে বেআইনি ঘোষণা করেছেন। যার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাঁর পূর্বারোপিত শুল্ক শতকরা ২০ থেকে ১০-১৫-এর স্তরে নামিয়ে এনেছেন। লাভের ব্যাপারটা তো গেলই চলে, কিন্তু যেসব শর্ত রয়ে গেছে, সে অনুযায়ী কাজ করতে গেলে বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, এমনকি চিকিৎসাও ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়বে।</p> <p style="text-align: justify;">ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একদা এ দেশে বাণিজ্যপথে প্রবেশ করেছিল এবং অবৈধ পথে উপনিবেশ স্থাপন সম্ভব করে তুলেছিল। শঙ্কা এই যে গোপন এই বৈধ চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নব্য ঔপনিবেশিক একটি ব্যবস্থার ভিতর নিতান্ত অসহায়ভাবে প্রবেশ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান বাতিল করে ক্ষমতায় বসেছিল না। সংবিধান জারি আছে এবং সংবিধানে এ ধরনের চুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার বলা আছে (ধারা ১৪৫ক) যে ‘ভিন দেশের সহিত চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করবেন।’ সত্য বটে চুক্তি সই করার সময় সংসদ কার্যকর ছিল না, কিন্তু তিন দিন পরেই তো নতুন একটি সংসদ গঠন নির্ধারিত ছিল; তা হলে চুক্তি সই করার জন্য অমন ব্যস্ততার হেতু কী এই শঙ্কা যে সংসদ গঠিত হলে চুক্তির ব্যাপারে আপত্তি উঠতে পারে? সে যা-ই হোক, নতুন সরকারের এখন অনিবার্য দেশপ্রেমিক কর্তব্য হবে আলোচনার জন্য অবিলম্বে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা। এ ব্যাপারে সরকার কতটা তৎপর হবে আমরা জানি না; তারা তো এ বিষয়ে ভালোমন্দ কোনো কথাই এখন পর্যন্ত বলেনি। বিরোধী দল সরকারের কাজের সমালোচনায় কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না। কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সরকারের একবিন্দু সমালোচনা করেনি। নতুন বন্দোবস্ত কায়েমের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ তরুণদের দল এনসিপির জন্যও এ ব্যাপারে প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ করা না-করাটা একটি অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে বলে আমাদের ধারণা। আশা করি সে পরীক্ষায় তারা অকৃতকার্য হবে না।</p> <p style="text-align: justify;">এ প্রসঙ্গেই উল্লেখযোগ্য যে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালের ব্যবস্থাপনার ভার একটি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শুধু তা-ই নয়, নতুন একটি টার্মিনাল তৈরির জন্য ভূমি, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার সমুদয় কর্তৃত্ব নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানিকে দেওয়ার চুক্তিও নাকি গত নভেম্বরে স্বাক্ষরিত হয়েছে। সব বৈদেশিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপনের দাবি তোলা দেশপ্রেমিকদের পক্ষে কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।</p> <p style="text-align: justify;">হৃদয়বান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদেরও কর্তব্য- অন্যের ওপর ভরসা না করে প্রতিবাদ জানানো। হৃদয়বান ও বুদ্ধিমান যে মানুষের কথা বলছি, তাঁদের এনজিওগুলোর ভিতর পাওয়া যাবে বলে আশা করাটা অন্যায়, কেননা এনজিওগুলোর জীবনদর্শনই হচ্ছে ছোটখাটো সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখা। হৃদয়বান ও বুদ্ধিমানদের খোঁজ পাওয়া যাওয়ার কথা বামপন্থিদের মধ্যে। তবে দুঃখজনক ও হতাশাব্যঞ্জক ঘটনা হলো এই যে অতীতে তাঁরা উষ্ণ হৃদয় বহনের যতটা প্রমাণ দিয়েছেন, বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ সে পরিমাণে দিতে সক্ষম হননি। বিশেষ করে গত নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাঁরা যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন, এমনটা বলার তো কোনো উপায়ই নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থার নির্বাচন হচ্ছে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে মল্লযুদ্ধ। বুর্জোয়াদের শক্তিশালী দল আওয়ামী লীগ বিদায় নিয়েছে। ক্ষমতার অনিবার্য লড়াইয়ে তাই আওয়ামী শাসনামলে একত্রে থাকা অন্য দুই দল বিএনপি এবং জামায়াত এখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের লড়াইটা বাধার কথা তাদের মধ্যেই এবং সেটাই ঘটেছে। এই লড়াইয়ের ভিতরে বামপন্থিদের ঢোকার চেষ্টা করা যে চরম নির্বুদ্ধিতার দৃষ্টান্ত, সেটা তাঁরা নিজেরা না বুঝলেও অন্যরা ঠিকই বুঝেছেন। এমনকি তাঁদের যাঁরা সমর্থক তাঁরাও বুঝতে ভুল করেননি। যেজন্য জামায়াত এসে পড়বে- এই শঙ্কায় দোদুল্যমানতা পরিহার করে ধানের শীষেই তাঁরা ছাপ বসিয়েছেন। মেহনতি মানুষের দল মেহনত করেই যাচ্ছে, কিন্তু ফলাফল ক্রমাগত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে হৃদয়ের ওপর সব ভার অর্পণ না করে বুদ্ধিকেও অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া দরকার।</p> <p style="text-align: justify;"><strong>লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়</strong></p> </article>