kalerkantho


চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সন্দেহ

নির্বাচনে নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে শিবির

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি নেই ছাত্রশিবিরের। জামায়াতে ইসলামীও তেমন কোনো কর্মসূচি দিচ্ছে না। তবে এরা পর্দার আড়ালে শক্তি বাড়াচ্ছে। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছাত্রশিবিরের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টির অগোচরেই। আড়ালে সাংগঠনিক তত্পরতা চালানোর পাশাপাশি সংগঠনটি নানা ধরনের ব্যানার ব্যবহার করে কর্মী সমাবেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন ছাত্রশিবিরের এমন তত্পরতাকে আগামী নির্বাচনের সময় নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি বলেই সন্দেহ করছেন নগর পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁদের ধারণা, গত সংসদ নির্বাচনে দলটি যেভাবে নাশকতা চালিয়েছিল, সেভাবেই নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবারও। এ কারণে নানা ব্যানারে কর্মীদের সমবেত করে চাঙা করার কৌশল অবলম্বন করছে।

গত ২৩ জুন নগরের কোতোয়ালী থানার মোটেল সৈকতের নিচতলার হলরুম ভাড়া করে ‘পারাবার’ এর নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখা। পারাবার হচ্ছে ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের নাম। এই ব্যানার ব্যবহার করেই সরকারি পর্যটন মোটেল ভবনে নিরাপদে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর নায়েবে আমির আ জ ম ওবায়দুল্লাহ।

ওই দিনই কোতোয়ালী থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। মামলার বাদী ও কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক মো. গোলাম ফারুক ভুঁইয়ার ভাষ্য, ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘পারাবার’ এর ব্যানারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও মূলত সেখানে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল। এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার পর জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম নগর শাখার নায়ের আমীর আ জ ম ওবায়দুল্লাহ ও ছাত্রশিবির মহানগরী দক্ষিণ শাখার সভাপতি রফিকুল হাসান লোদিসহ ৭ জনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মহসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে সব আসামিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর ও ছাত্রশিবির সভাপতি-সেক্রেটারিসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে তা এখন প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

জিজ্ঞাসাবাদকালে ছাত্রশিবির সভাপতি লোদি পুলিশকে জানিয়েছেন, মহানগরীতে ছাত্রশিবিরের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। নিয়মিত অনুষ্ঠান ও কর্মী সমাবেশ হচ্ছে। পুলিশের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, মহানগর ছাত্রশিবিরের দক্ষিণ শাখায় ৫০০ এবং উত্তর শাখায় ১০০০ সাথী পর্যায়ের নেতা রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিতভাবে নগরীতে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘গেল রমজান মাসে নগরীতে একাধিক ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে ছাত্রশিবির। এসব মাহফিলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁরা এসব কর্মসূচি ছাত্রশিবেরর কর্মী নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।’

ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ শাখার সভাপতি রফিকুল হাসান লোদির বাড়ি সিলেট জেলায়। সেখান থেকে তাঁকে চট্টগ্রামের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। ছাত্রশিবির দল পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘বদলি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের স্থানীয় কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে সিলেটের রফিকুল হাসান লোদিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রশিবিরের নেতারা পুলিশের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, তাঁরা এখন মোবাইল ফোনে কম যোগাযোগ করেন। অনলাইনে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইভার, ইমো, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখেন। তবে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয় ‘ভুয়া’ ফেসবুক আইডির মাধ্যমে। এসব আইডির মধ্যে কে কোনটি ব্যবহার করেন সেটা ছাত্রশিবিরের নেতারা জানেন। পর্যটন মোটেলে কেন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে লোদি জানিয়েছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাঁরা এটিকে নিরাপদ মনে করেছিলেন।

ছাত্রশিবিরের ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয়েও লোদিকে প্রশ্ন করেছিল পুলিশ। তবে তিনি ভবিষ্যত রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে পুলিশকে খুব বেশি তথ্য দেননি। তিনি দাবি করেছেন, ছাত্রশিবির শান্তিপূর্ণভাবে রাজনীতি করতে চায়। কিন্তু সরকার ও পুলিশ সেই সুযোগ ছাত্রশিবিরকে দিচ্ছে না। এ কারণে নানা কৌশল অবলম্বন করে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে হচ্ছে শিবিরকে।

ছাত্রশিবিরের বর্তমান কার্যক্রম বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর শিবিরের সেক্রেটারি মো. ইমরানুল হকও প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়েছেন পুলিশকে। তিনি জানিয়েছেন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্তেই ছাত্রশিবির কার্যক্রম চালাচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকার কারণে ছাত্রশিবির রাজনীতিতে কৌশল অবলম্বন করছে। নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এড়াতেই যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কৌশল বদল করতে হয়েছে। তবে পুরো নগরীতেই ছাত্রশিবির সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।

ছাত্রশিবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে অভিন্ন তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামী পর্দার আড়ালে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করছে। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে সরে গোপনে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। নিজেরা অনলাইনের বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে যোগাযোগ করছে। সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছদ্মাবরণে রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করছে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তার ভাষ্য, ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামী গোপনে তত্পরতা চালাচ্ছে এমন তথ্যের ভিত্তিতেই গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়। এরই অংশ হিসেবে মোটেল সৈকতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির পর্দার অন্তরালে থেকে দেশে নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তাই দেশের মানুষের জানমাল রক্ষার্থে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’



মন্তব্য