• ই-পেপার

ব্যক্তির সম্পদে সমাজ ও পরিবারের অধিকার

আগে অর্ডার নিয়ে পরে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রির হুকুম

মুফতি ওমর বিন নাছির
আগে অর্ডার নিয়ে পরে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রির হুকুম
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করলেও এর ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা এবং ওয়াদা রক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।

বর্তমান যুগে অনেকেই মধ্যস্থতাকারী বা সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেন। তারা প্রথমে ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার গ্রহণ করেন, তারপর অন্য উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত মূল্যে ক্রেতার নিকট সরবরাহ করেন। যেমন—বালি, ইট, পাথর, নির্মাণসামগ্রী কিংবা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ ধরনের ব্যবসা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কি না, লাভের অর্থ হালাল কি না, অগ্রিম টাকা নেওয়া যাবে কি না?এসব প্রশ্নের উত্তর জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বৈধ ব্যবসা ইসলামে অনুমোদিত এবং সম্মানজনক উপার্জনের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

আগে অর্ডার নিয়ে পরে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করা
যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্রেতার কাছ থেকে নির্দিষ্ট মূল্যে অর্ডার গ্রহণ করে এবং পরে সরবরাহকারীর কাছ থেকে কম মূল্যে পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতার নিকট সরবরাহ করে, তাহলে এই ব্যবসা মূলত বৈধ। কারণ এখানে ব্যক্তি তার শ্রম, যোগাযোগ, ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকির বিনিময়ে লাভ করছে। 

উদাহরণস্বরূপ, একজন ক্রেতার সঙ্গে প্রতি ঘনফুট বালি ৬ টাকা দরে চুক্তি করা হলো এবং পরে ড্রেজার মালিকের কাছ থেকে ৪ টাকা দরে বালি সংগ্রহ করা হলো। অতিরিক্ত ২ টাকা ব্যবসায়িক লাভ হিসেবে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ। ক্রেতা বা বিক্রেতাকে লাভের পরিমাণ জানানো শরিয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক নয়, যদি কোনো প্রকার প্রতারণা বা মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়া হয়। ফিকহশাস্ত্রে এ ধরনের লেনদেনের সঙ্গে ‘ইস্তিসনা’ ও বৈধ বাণিজ্যিক চুক্তির মিল পাওয়া যায়। ইসলামী আইন অনুযায়ী, পণ্যের ধরন, পরিমাণ, গুণগত মান এবং মূল্য স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকলে এ ধরনের চুক্তি বৈধ বলে গণ্য হয়। (আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, ৩/২০৭, জাদিদ ৩/১৯৫)

অগ্রিম টাকা নেওয়ার বিধান
ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়াও বৈধ। ব্যবসায়িক নিরাপত্তা ও চুক্তির বাস্তবায়নের স্বার্থে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে শর্ত হলো, চুক্তির শর্তাবলি স্পষ্ট থাকতে হবে এবং উভয় পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে।

ব্যবসায় মিথ্যা বলা ও ওয়াদা ভঙ্গের বিধান
যদিও ব্যবসার মূল কাঠামো বৈধ, তবে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বা জেনেশুনে ভুল তথ্য দেওয়া গুরুতর গুনাহ। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসায়ী জানেন যে ৮ বা ১০ দিনের আগে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়, কিন্তু ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বলেন, ‘দুই দিনের মধ্যেই কাজ হয়ে যাবে।’ এটি স্পষ্ট মিথ্যাচার এবং ইসলামে হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩)

অতএব, ক্রেতাকে ধরে রাখার জন্য জেনেশুনে মিথ্যা বলা বা অবাস্তব সময়সীমা নির্ধারণ করা বৈধ নয়। তবে যদি বাস্তব ধারণা অনুযায়ী সময় বলা হয়, পরে অনিবার্য কারণে বিলম্ব ঘটে, তাহলে তা গুনাহ হবে না। এক্ষেত্রে ক্রেতার কাছে ক্ষমা চেয়ে অতিরিক্ত সময় নেওয়া উচিত।

মিথ্যা বললে কি পুরো লাভ হারাম হয়ে যাবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মিথ্যা বলা হারাম এবং এর জন্য গুনাহ হবে; তবে শুধুমাত্র এই কারণে পুরো ব্যবসার লাভ হারাম হয়ে যাবে না, যদি মূল ব্যবসা ও পণ্যের লেনদেন বৈধ হয়। অর্থাৎ ব্যবসার উপার্জন হালাল থাকবে, কিন্তু মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা বা ওয়াদা ভঙ্গ করার কারণে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট গুনাহগার হবে এবং তাকে তওবা করতে হবে।


ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত রেখেছে এবং বৈধ উপার্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। আগে অর্ডার গ্রহণ করে পরে অন্য উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে লাভসহ বিক্রি করা মূলত বৈধ ও হালাল ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত। ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করাও শরিয়তসম্মত। তবে ব্যবসায়িক সফলতার জন্য মিথ্যা বলা, ভুল প্রতিশ্রুতি দেওয়া, প্রতারণা করা বা ওয়াদা ভঙ্গ করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর প্রকৃত পরিচয় হলো তার সততা, বিশ্বস্ততা এবং অঙ্গীকার রক্ষা।

তাই ব্যবসায় বরকত, আস্থা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইলে আমাদের উচিত সত্যবাদিতা অবলম্বন করা, বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ক্রেতার হক যথাযথভাবে আদায় করা। কেননা সততার উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাই দুনিয়ার সফলতা এবং আখিরাতের মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।

তথ্যসূত্র : (বাদাইউস সানাই, ৪/৯৩, কারতাশি ৫/২, তাবয়িনুল হাকাইক, ৪/৫২৬, রাদ্দুল-মুহতার, ৭/৪৭৫, আল-মাওসুআতুল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ৩/৩২৬)
 

শত্রুর বিরুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর শেখানো দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শত্রুর বিরুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর শেখানো দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনে এমন সময় আসে, যখন মানুষ অন্যায়, জুলুম, শত্রুতার আঘাত কিংবা অত্যাচারীদের ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়। কখনো ব্যক্তি, কখনো সমাজ, আবার কখনো সমগ্র মুসলিম উম্মাহ শত্রুদের অন্যায় আগ্রাসন ও নিপীড়নের শিকার হয়। এমন কঠিন মুহূর্তে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি অটল ভরসা এবং তাঁর দরবারে আন্তরিক দোয়া। কেননা শক্তি ও সামর্থ্যের সীমা শেষ হয়ে গেলেও আল্লাহর সাহায্যের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। ইতিহাস সাক্ষী যে, বহুবার সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বল মুমিনরা আল্লাহর সাহায্যে শক্তিশালী শত্রুদের পরাজিত করেছে। তাই বিপদ, শত্রুর আক্রমণ বা জুলুমের সময় মহানবী (সা.)-এর শিখানো দোয়া করা উচিত। দোয়াটি হলো-

اَللّٰهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ، سَرِيْعَ الْحِسَابِ، اِهْزِمِ الْأَحْزَابَ، اَللّٰهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা মুনজিলাল কিতাবি, সারিআল হিসাবি, ইহজিমিল আহজাব। আল্লাহুম্মাহজিমহুম ওয়া জালজিলহুম।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি কিতাব নাজিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আপনি শত্রুবাহিনীকে পরাজিত করুন। হে আল্লাহ! তাদের পরাভূত করুন এবং তাদের মধ্যে ভীতি, ত্রাস ও কম্পন সৃষ্টি করে দিন।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৭৪২)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জুলুম ও অত্যাচার থেকে হেফাজত করুন, সত্যের ওপর অটল রাখুন এবং সকল শত্রুর অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন। 

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.) যে সাত কাজের আদেশ ও নিষেধ করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.) যে সাত কাজের আদেশ ও নিষেধ করেছেন
সংগৃহীত ছবি

আবু ওমারাহ বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) আমাদের সাতটি কাজ করার আদেশ এবং সাতটি কাজ করতে বারণ করেছেন। 
আদেশকৃত কাজগুলো হলো-

১. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, ২. জানাজার অনুসরণ করা, ৩. হাঁচির জবাব দেওয়া, ৪. কসম রক্ষা করা, ৫. মাজলুমকে সাহায্য করা, ৬. দাওয়াত কবুল করা, ৭. সালামের প্রচার-প্রসার ঘটাতে আদেশ করেছেন।

নিষেধকৃত কাজগুলো হলো-
 ১. স্বর্ণের আংটি পরিধান করতে, ২. রুপার পাত্র ব্যবহার করতে, ৩. রেশমের পোশাক, ৪. কাসসি, (এক ধরনের সিল্ক কাপড়) ৫. ইস্তাবরাক, (রেশম) ৬. দিবাজ (সর্বপ্রকার রেশমি পোশাক) ব্যবহার করতে বারণ করেছেন।
অন্য বর্ণনায় আছে-যে সাতটি জিনিস আদেশ করেছেন, তার মধ্যে একটি হলো, হারানো বস্তুর সন্ধান দেওয়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৬৩৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৩৮৮)

হাদিসের শিক্ষাসমূহ
এই হাদিসে মহানবী (সা.) একজন মুসলমানের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও নৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। হাদিসের শিক্ষা হলো- ইসলাম শুধুমাত্র কিছু ইবাদতের নাম নয়; বরং এটি মানবিকতা, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও উত্তম চরিত্রের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, জানাজার অনুসরণ করা, হাঁচির জবাব দেওয়া, দাওয়াত কবুল করা, সালামের প্রসার ঘটানো এবং মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও ঐক্য সুদৃঢ় হয়। একই সঙ্গে হারানো বস্তুর সন্ধান দেওয়ার নির্দেশ মানুষের মধ্যে সততা, আমানতদারিতা ও মানবকল্যাণের চেতনাকে জাগ্রত করে। অন্যদিকে স্বর্ণের আংটি, স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র এবং রেশমি পোশাক ব্যবহার থেকে পুরুষদের বিরত থাকার নির্দেশ ইসলামের সরলতা, বিনয় ও অপচয়বিরোধী আদর্শকে তুলে ধরে। এ হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে একজন প্রকৃত মুমিন শুধু নিজের ইবাদত নিয়েই ব্যস্ত থাকে না; বরং সমাজের সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ করে, মানুষের উপকারে আসে, অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ায় এবং অহংকার ও বিলাসিতা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। সর্বোপরি, এই হাদিস ইসলামী সমাজব্যবস্থার এমন এক সুন্দর চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ভালোবাসা, সহযোগিতা, মানবতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে ব্যক্তি ও সমাজ গড়ে ওঠে। 

মুমিনের নবী প্রেমে আলোকিত জীবন

মাওলানা আদনান জহির
মুমিনের নবী প্রেমে আলোকিত জীবন
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবী যখন জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, মানবতা যখন পথহারা, অত্যাচার আর নৈতিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.) প্রেরণ করেন। তাঁর আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী আলোকিত হয়, মূর্খতা ও কুসংস্কারের স্থান দখল করে জ্ঞান, ন্যায়, শান্তি ও মানবতার শিক্ষা। তিনি শুধু একজন নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সর্বোত্তম আদর্শ এবং আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। তাই একজন মুমিনের জীবনে ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করা। এ ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং এটি ঈমানের প্রাণ, হৃদয়ের স্পন্দন এবং জান্নাতের পথে চলার অন্যতম প্রধান পাথেয়।

নবী প্রেম ঈমানের অপরিহার্য শর্ত
মহান আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসাকে ঈমানের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের সবকিছুর চেয়ে নবীজিকে বেশি ভালোবাসতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫)

এ হাদিস আমাদের শেখায় যে নবীজির ভালোবাসা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসার নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করে বলেন, ‘বলুন, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তোমাদের পছন্দের বাসস্থান আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত।’ (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ২৪)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে একজন মুমিনের হৃদয়ে সর্বোচ্চ স্থানে থাকতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা।

ওমর (রা.)-এর ঈমান পূর্ণতার ঘটনা
একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘না, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় হই, ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না।’ তখন ওমর (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়।’ তখন (সা.) বললেন, ‘এখন, হে ওমর! (তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)।’ (সহিহ বুখারি)

এ ঘটনা আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ঈমান তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন নবীজির ভালোবাসা নিজের প্রাণের ভালোবাসাকেও অতিক্রম করে যায়।


সাওবান (রা.)-এর হৃদয়স্পর্শী নবী প্রেম
সাহাবি সাওবান (রা.) নবীজির বিচ্ছেদ কল্পনা করেও অস্থির হয়ে পড়তেন। তিনি একদিন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার জীবন, পরিবার ও সন্তানদের চেয়েও অধিক প্রিয়। যখন আমি আপনাকে দেখতে পাই না, তখন অস্থির হয়ে পড়ি। আর যখন আপনার ও আমার মৃত্যুর কথা চিন্তা করি, তখন ভাবি—আপনি তো জান্নাতে নবীদের সর্বোচ্চ মর্যাদায় থাকবেন, আমি যদি জান্নাতে প্রবেশও করি, তবে হয়তো আপনাকে দেখতে পাব না।’ তাঁর এ গভীর ভালোবাসার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও নেককারদের সঙ্গী হবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৯)

এ আয়াত নবীপ্রেমিকদের জন্য এক মহাসুসংবাদ।

খুবাইব (রা.)-এর বিস্ময়কর নবী প্রেম
ইসলামের ইতিহাসে নবী প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত খুবাইব (রা.)। শত্রুরা তাঁকে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত করেছিল। সেই মুহূর্তে আবু সুফিয়ান (তখনও মুসলিম হননি) তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি চাও, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ (সা.) এখানে থাকুন এবং তাঁকে হত্যা করা হোক, আর তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে নিরাপদে ফিরে যাও?’ খুবাইব (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার-পরিজনের মাঝে নিরাপদে থাকার বিনিময়েও এটা পছন্দ করি না যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।’ এই উত্তর শুনে কাফেররাও হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এমন নিখাদ ভালোবাসার নজির মানব ইতিহাসে বিরল।

নবী প্রেমের প্রকৃত আলামত
নবী প্রেম শুধু মুখের দাবি নয়; এর বাস্তব প্রমাণ থাকতে হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

১. সুন্নতের অনুসরণ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই নবী প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ। ইবাদত, আচার-আচরণ, লেনদেন, পরিবার ও সমাজ—সর্বত্র তাঁর সুন্নত অনুসরণ করতে হবে।
২. অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা : যে ভালোবাসে, সে প্রিয়জনকে বেশি স্মরণ করে। তাই নবীপ্রেমিকের জিহ্বা সর্বদা দরুদে সিক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)
৩. নবীজির সীরাত অধ্যয়ন করা : যত বেশি নবীজির জীবন জানব, তত বেশি তাঁকে ভালোবাসব। তাঁর জীবনচরিত, সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ অধ্যয়ন করা নবী প্রেমকে গভীর করে।
৪. তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা : নবীজির নাম শুনলে দরুদ পাঠ করা, তাঁর সুন্নতকে সম্মান করা এবং তাঁর কোনো নির্দেশকে অবহেলা না করা প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয়।
৫. দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করা : নবীজির আনা দ্বীনকে নিজে পালন করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা নবী প্রেমের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।
৬. আহলে বাইত ও সাহাবিদের ভালোবাসা পোষন করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার ও সাহাবিদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করাও নবী প্রেমের অংশ। কারণ প্রকৃত প্রেমিক প্রিয়জনের প্রিয়জনদেরও ভালোবাসে।


নবী প্রেমের সর্বোচ্চ পুরস্কার
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যার সঙ্গে ভালোবাসা রাখে, কিয়ামতের দিন সে তার সঙ্গেই থাকবে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস নবীপ্রেমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালোবাসবে, তাঁর সুন্নত অনুসরণ করবে এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়বে, আল্লাহর রহমতে সে কিয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গ লাভ করবে।

তাই নবী প্রেম কোনো আবেগঘন স্লোগানের নাম নয়; এটি ঈমানের প্রাণ, আত্মার খাদ্য এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। প্রকৃত নবীপ্রেমিক সেই ব্যক্তি, যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরে, তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে এবং তাঁর ভালোবাসাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। আসুন, আমরা শুধু মুখে ‘আমি নবীজিকে ভালোবাসি’ বলেই ক্ষান্ত না হই; বরং তাঁর নির্দেশিত পথে চলি, তাঁর সুন্নতকে জীবিত করি এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর আদর্শে রঙিন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সত্যিকার অর্থে আশেকে রাসুল হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য নসিব করুন।

লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুত্ ত্বাকওয়া আল ইউসুফিয়্যাহ সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

ব্যক্তির সম্পদে সমাজ ও পরিবারের অধিকার | কালের কণ্ঠ