• ই-পেপার

গণিতশাস্ত্রে অবদান রাখা ১০ মুসলিম মনীষী

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তরুণদের উদাসীনতা কাম্য নয়

মুফতি তাহসীন শাকিল
বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে তরুণদের উদাসীনতা কাম্য নয়
সংগৃহীত ছবি

​সবুজ গালিচার উপর একটা সিন্থেটিক লেদারের তৈরি গোলকের পেছনে ২২ জোড়া পায়ের অবিরাম ছুটে চলা, গ্যালারির চারপাশে হাজারো দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার, আর রূপালী পর্দার সামনে উন্মুখ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা সহস্র কোটি তরুণ যুবকের কাটিয়ে দেয়া বিনিদ্র রাত— চার বছর অন্তর আয়োজিত বিশ্বকাপের বিশ্ব কাঁপানো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমনই এক বৈশ্বিক উন্মাদনায় মেতে ওঠে উম্মাহর হৃদপিণ্ড মুসলিম যুবতরুণ। অথচ চোখ বন্ধ করে ভাবনার জানালা খুললেই দেখা যায় এই অদ্ভুত নান্দনিক উন্মাদনা শরীয়ত সমর্থিত বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে সময়ের অপচয়, নৈতিক স্খলন ও কর্মমুখর জীবনের জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সময়ের অপচয় ও কর্মের প্রতি অবহেলা 
তারুণ্য হলো জীবনের বসন্তকাল। যেকোনো জাতি ও সভ্যতার ভাগ্য পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ সম্প্রদায়। তারুণ্যের এই সময়টা নিজেদের জীবন-ক্যারিয়ার, জ্ঞান-গবেষণা ও কর্মমুখর জীবনের ময়দানে ঈপ্সিত সাফল্যের উচ্চতায় আরোহনের জন্য ব্যয় করা উচিত। অথচ জীবনের সীমিত সময়ের এই সোনালী মুহুর্তগুলো করপোরেট দুনিয়ার বানিজ্যিক জুয়ার পেছনে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। অবচেতন তরুণদের মনোজগতে বাসা বেঁধেছে দূরবর্তী অমুসলিম জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি অসীম ভালোবাসা। যা তাদের খোদা প্রদত্ত সহজাত সুকুমারবৃত্তি নষ্ট করে অন্যায় অশ্লীলতার অবাধ স্রোতে ভাসিয়ে জীবনকে করছে কলুষিত। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ননা করতে গিয়ে বলেছেন, (আর যারা অনর্থক ও অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩) 

আত্মপরিচয়ের সংকট 
বিশ্বকাপ মওসুম এলে মুসলিম যুবক-তরুণদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা হলো—ভিনদেশী সংস্কৃতি, ভিনদেশী আদর্শ ও ভিনদেশী অমুসলিম সমাজ রীতিতে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দেরকে নিজেদের আইডল বানানো ও তাদের অনুরক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ ও নিজেদের আদর্শিক সীমা বহির্ভূত অমুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি এমন মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি মূলত আমাদের নতুন প্রজন্মের ঈমানী অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। এমনকি পোশাক পরিচ্ছেদে,  চুল কাটার স্টাইলে ও জীবনযাপনের পদ্ধতিতে তাদের অন্ধ অনুকরণ মুসলিম যুব তরুণদের চরম আত্মপরিচয়ের সংকট-ও আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বটে। 

মুসলিম যুব-তরুণদের এই অধঃপতিত অবস্থা গভীর উদ্বেগের বিষয়। একজন মুসলিমের সবচেয়ে গর্বের পরিচয় হলো সে আল্লাহর বান্দা ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সা. এর উম্মত। অথচ বিশ্বকাপে মওসুম আসলে দেখা যায় তারা অমুসলিম রাষ্ট্রের বিজয়ে উল্লাস করে, তাদের পতাকা গায়ে পেঁচিয়ে গর্ববোধ করে এবং তাদের জাতীয় প্রতীককে নিজেদের পরিচয়ের অংশ মনে করতেও দ্বিধা করে না। এ-সবই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ ও ঈমানী আত্নমর্যাদাবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। হাদিসের ভাষ্যে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ার বাণী উচ্চারিত হয়েছে। নবীজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং :  ৪০৩১)

ফরজ ইবাদতে উদাসীনতা 
খেলা দেখার সূচি রক্ষা করতে গিয়ে নামাজের সূচি বদলে ফেলার মতো স্পর্ধা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না তরুণদের বৃহৎ একটি অংশ। পছন্দের দলের খেলা দেখার বেপরোয়া নেশায় মোহগ্রস্ত হয়ে রাত জেগে থাকার পরে ফজরের নামাজে অবহেলা করে। কখনো নামাজ একেবারেই ছুটে যায়। অথচ ইসলামে নামাজ একটি ফরজ ইবাদত। নির্ধারিত সময়ে আদায় করা আবশ্যক। বিনা ওজরে কোনোভাবেই গাফলতি করার সুযোগ নেই। 

অবাক করার বিষয় হলো—যে তরুণ একটি গোল মিস হওয়ার আশঙ্কায় চোখের পলক ফেলে না, সেই একই তরুণ অবলীলায় ঈমানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ- নামাজ কাজা করে ফেলছে। অথচ নামা হলো মুমিনের জীবনের সফলতার চাবিকাঠি। সফল মুমিনদের গুণাবলি বর্ননা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম নামাজের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ। যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-২)

অর্থনৈতিক অপচয় ও অকৃতজ্ঞতা
পছন্দের দলের জার্সি, পতাকা ও ব্যানার বানানোর পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা, বাজি ধরা, রেলি করা ও খেলা দেখার জন্য অহেতুক বিভিন্ন  আয়োজন—ইত্যাদি সবই অর্থের অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। অথচ আর্থিক স্বচ্ছলতা আল্লাহর অন্যতম একটি অনুগ্রহ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে—জীবনের প্রয়োজনীয় খাতে এবং সামাজিক ও জাতীয় জীবনের অর্থবহ আয়োজনে অর্থ ব্যয় করাই শরীয়তের দাবি। এর বিপরীতে অন্যায় কর্মকাণ্ডের পেছনে অর্থ ব্যয় করা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ। অর্থ অপচয়কারীকে কোরআনে শয়তানের অনুসারী অভিধায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

সারকথা হলো, নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে ইসলাম বিনোদনের অনুমতি দেয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড কাপগুলো শরীয়তের নির্ধারিত সীমা থেকে যোজন যোজন দূরে। উপরন্তু এর সাথে জড়িত আছে নানান ক্যাটাগরির পাপাচার—নগ্নতা-অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ জুয়া, গান-বাজনা, নামাজে অবহেলা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণসহ অন্যান্য মুনকার কাজ এই আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সুতরাং একজন আত্মসচেতন মুসলিম তরুণের জন্য এজাতীয় আয়োজনে—যেকোনো অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুত তাক্বওয়া আল-ইউসুফিয়্যাহ 

সরাইল বি.বাড়িয়া। 

ডিজিটাল কনটেন্ট স্থানীয়করণে সৌদিতে কোডলেস ক্যাম্প চালু

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ডিজিটাল কনটেন্ট স্থানীয়করণে সৌদিতে কোডলেস ক্যাম্প চালু
সংগৃহীত ছবি

ডিজিটাল যুগের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরবি ভাষা ভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্টের মান উন্নয়ন এবং অনুবাদ খাতে জাতীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। এই লক্ষ্যে দেশটির সাহিত্য, প্রকাশনা ও অনুবাদ কমিশন ডিজিটাল কনটেন্ট স্থানীয়করণ বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ‘কোডলেস ক্যাম্প’ চালু করেছে।

কমিশন জানিয়েছে, এই ক্যাম্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো এমন দক্ষ সৌদি অনুবাদক তৈরি করা, যাঁরা পণ্য ও সেবার স্থানীয়করণ প্রকল্পে পেশাদারির সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। একই সঙ্গে আরবি ডিজিটাল কনটেন্টের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সৌদির বাজারে উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অনুবাদ ও ডিজিটাল কনটেন্ট উন্নয়নে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চালু হওয়া এই ক্যাম্পে অনুবাদক, ফ্রিল্যান্সার, ডিজিটাল কনটেন্ট খাতে আগ্রহী তরুণ-তরুণী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভিডিও গেম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্থানীয়করণ সম্পর্কিত বিশেষায়িত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ক্যাম্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর তাত্ত্বিক ও ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণের সমন্বয়। অংশগ্রহণকারীরা শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা নয়, বাস্তব প্রকল্পের ওপর কাজ করার সুযোগও পাচ্ছেন। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কর্মশালাগুলো তাঁদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনুবাদশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে এবং তরুণ প্রজন্ম আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবী হিসেবে গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে আরবি ভাষার ডিজিটাল উপস্থিতি আরো সমৃদ্ধ হবে এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল বাজারে সৌদি আরবের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।


বিশ্লেষকদের মতে, কোডলেস ক্যাম্প সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জাতীয় প্রতিভা বিকাশ, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই উদ্যোগ দেশটির ভবিষ্যৎ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

প্রচলিত জমি বন্ধক (কট) ব্যবস্থা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মুফতি দিদার হুসাইন
প্রচলিত জমি বন্ধক (কট) ব্যবস্থা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
সংগৃহীত ছবি

ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ কোনো জিনিস বন্ধক রাখার নিয়ম বেশ পুরনো। এতে ঋণদাতা নিশ্চিত থাকেন যে ঋণগ্রহীতা যদি কোনো কারণে তার ঋণ পরিশোধ না করে তাহলে প্রয়োজনে ঋণদাতা বন্ধক রাখা বস্তু থেকে নিজের পাওনা উসুল করে নিতে পারবেন।

নিরাপদ লেনদেনে জিনিস বন্ধক রাখার নিয়মকে ইসলামও অস্বীকার করেনি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা যদি প্রবাসে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তাহলে বন্ধকি বন্তু হস্তগত রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো! তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৩)

এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে ঋণদাতার জন্য বন্ধকি বস্তু থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ আছে কি না?

এ ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, বন্ধকি বস্তু থেকে বন্ধকগ্রহীতার কোনো সুবিধা গ্রহণ করা নাজায়েজ ও হারাম। এমনকি বন্ধকদাতা অনুমতি দিলেও তা জায়েজ হবে না। কারণ বন্ধকি বস্তু থেকে উপকার গ্রহণ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত।

ফিকহে ইসলামীর পরিভাষায় এটাকে রিবাল করদ্ব (ঋণের সুদ) বলা হয়। রিবাল করদ্ব হলো, কেউ কাউকে ঋণ দিয়ে ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণের বিনিময়ে কোনো বাড়তি উপকার গ্রহণ করা। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যেসব ঋণে উপকার ভোগ করা হয় তা রিবা (সুদ) বলে গণ্য হবে। (ইলাউস সুনান : ১৪/৫১৩)

মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাকের এক বর্ণনায় এসেছে, ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে এসে বললেন, এক লোক আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, অতঃপর আমি তাতে আরোহণ করেছি। তখন তিনি বলেন, তুমি উক্ত ঘোড়ার ওপর যে পরিমাণ আরোহণ করেছ তা সুদ হয়েছে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৫০৭১)

অতএব, ঋণের বিনিময়ে জমি বন্ধক রাখার পর ঋণদাতার জন্য সেই জমি থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ নেই। (আহকামুল কোরআন, জাসসাস : ১/৬৪৪, বাদায়েউস সানায়ে : ৫/২১১, আল বাহরুর রায়েক : ৮/৩৩৮, ফাতাওয়ায়ে কাজিখান : ৯/৪৪৩২, মাজমাউল আনহুর : ৪/২৭৩, শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসী : ২/৪১০, ৩/১৯৬, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৭/ ৫৮৮, ইমদাদুল আহকাম : ৬/৯৪, ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ : ১৭/৪৩৭)

এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে একটি ভুল প্রথা প্রচলিত আছে, তা হলো জমি বন্ধক রেখে টাকা গ্রহণের পর বন্ধকগ্রহীতা জমি ভোগ করে এবং তা হালাল করার জন্য জমির মালিককে সামান্য কিছু টাকা ফিরিয়ে দিয়ে সেটাকে জমির ভাড়া হিসেবে উপস্থাপন করে। বাস্তবে এটি এক ধরনের প্রতারণা। কেননা যে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়, তা সাধারণত জমির প্রকৃত ও প্রচলিত ভাড়ার সমপরিমাণ হয় না। ফলে নামমাত্র কিছু অর্থ প্রদান করে জমি ভোগ করাকে বৈধ ভাড়া বলা যায় না। বরং ঋণের বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণের কারণে তা সুদের অন্তর্ভুক্তই থেকে যায়। সুতরাং এ ধরনের লেনদেন শরিয়তসম্মত নয়।

জায়েজ বিকল্প পদ্ধতি
উল্লেখ্য, জায়েজ পন্থায় অন্যের জমি ভোগ করতে চাইলে ঋণ প্রদান ও বিনিময়ে বন্ধক হিসেবে জমি গ্রহণের চুক্তি না করে শুরু থেকেই পত্তন বা ভাড়া চুক্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকের একত্রে বেশি টাকার প্রয়োজন হলে জমির ভাড়া ধার্য করে একসঙ্গে কয়েক বছরের জন্য জমি ভাড়া দিয়ে অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে।

যেমন—কারো এক লাখ টাকার প্রয়োজন, এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া হয় ১০ হাজার টাকা। তখন সে ১০ বছরের জন্য জমিটি ভাড়া দিয়ে অগ্রিম এক লাখ টাকা ভাড়া হিসেবে নিতে পারবে। এরপর যে কয় বছর অর্থদাতা জমি ভোগ করবে, সে কয় বছরের ভাড়া ওই টাকা থেকে কর্তিত হবে। ১০ বছরের আগে জমি ফেরত দিলে আনুপাতিক হারে অবশিষ্ট টাকা জমিওয়ালা ভাড়াগ্রহীতাকে ফেরত দেবে।

আর কেউ যদি আগে থেকে ভাড়া চুক্তি না করে বন্ধকি চুক্তি করে, সে ক্ষেত্রে অর্থদাতা বন্ধকি জমি থেকে উপকৃত হতে চাইলে আগের বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে নতুনভাবে ভাড়া চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে জমির ভাড়া যুক্তিযুক্ত হতে হবে, এলাকার এই মানের জমির ভাড়া সাধারণত যে পরিমাণ, তার সমান বা কাছাকাছি হতে হবে। অর্থাৎ নামমাত্র ভাড়া ধরা চলবে না; বরং তা বাস্তবসম্মত হতে হবে।

শত প্রতিকূলতার মধ্যে মুসা (আ.)-এর ঐতিহাসিক বিয়ে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শত প্রতিকূলতার মধ্যে মুসা (আ.)-এর ঐতিহাসিক বিয়ে
সংগৃহীত ছবি

মানব ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা যুগে যুগে মানুষের জন্য শিক্ষা, প্রেরণা ও পথনির্দেশনা হয়ে আছে। মুসা (আ.)-এর বিবাহের ঘটনাও তেমনই এক অনুপম কাহিনি, যেখানে একদিকে বিপদগ্রস্ত এক যুবকের সংগ্রাম, অন্যদিকে লজ্জাশীলতা, সততা, বিশ্বস্ততা ও আল্লাহর রহমতের অপূর্ব প্রকাশ।

খ্রিষ্টপূর্ব বহু শতাব্দী আগে আরব উপদ্বীপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল মাদায়েন। ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হলেও এর অধিবাসীরা নানা অন্যায় ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়েছিল। তারা ওজনে কম দিত, মানুষের হক নষ্ট করত, ডাকাতি ও রাহাজানিতে লিপ্ত থাকত এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন করত। এমন অবস্থায় মহান আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য নবী শোয়াইব (আ.)-কে প্রেরণ করেন। তিনি এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান এবং মানুষকে অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকতে বলেন। কিন্তু জাতি তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে অহংকারে লিপ্ত হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, শোয়াইব (আ.) ছিলেন ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র মাদইয়ানের বংশধর। আবার কারও মতে, তিনি সালেহ (আ.)-এর বংশধর ছিলেন। (তাফসিরে কোরআনুল আজিম, ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ২৪৮)

মিসর থেকে মাদায়েনে
মুসা (আ.)-এর জন্ম হয় মিসরে। সে সময় মিসরের শাসক ছিল অত্যাচারী ফেরাউন, যাকে অনেক ইতিহাসবিদ দ্বিতীয় রামেসিস বলে উল্লেখ করেছেন। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সে বনি ইসরাইলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করত। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেই জন্ম নেন মুসা (আ.)। আল্লাহর নির্দেশে তার মা শিশুপুত্রকে নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর অশেষ কুদরতে সেই শিশুই ফেরাউনের প্রাসাদে আশ্রয় পায় এবং রাজকীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠে।

যৌবনে একদিন মুসা (আ.) দেখলেন, এক কিবতি (ফেরাউনের অনুসারী) ও এক ইসরাইলি বিবাদে লিপ্ত। তিনি মধ্যস্থতা করতে গেলে কিবতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে। তখন মুসা (আ.) তাকে একটি ঘুষি মারেন, আর তাতেই লোকটির মৃত্যু ঘটে। ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফেরাউনের দরবার থেকে মুসাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমন সময় এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে সতর্ক করে বলেন, দ্রুত শহর ত্যাগ করে মাদায়েনে চলে যেতে। সেখানে একজন নেককার ও সম্মানিত ব্যক্তির সান্নিধ্যে নিরাপদে থাকতে পারবেন। (কাসাসুল কোরআন, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১৫)

কূপের ধারে দুই বোনকে সাহায্য
দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ অতিক্রম করে মুসা (আ.) মাদায়েনে পৌঁছালেন। ক্লান্ত ও অবসন্ন অবস্থায় তিনি একটি কূপের কাছে গেলেন। সেখানে বহু লোক তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছিল। ভিড়ের একপাশে তিনি দুই তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তারা অপেক্ষা করছিলেন, যাতে পুরুষদের ভিড় কমে যায়। মুসা (আ.) তাদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন কেন তারা অপেক্ষা করছেন। তারা বললেন, তাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ। তাই বাধ্য হয়ে তারাই পশু চরান ও পানি পান করাতে আসেন। কিন্তু পুরুষদের ভিড়ের কারণে তারা আগে এগোতে পারেন না। মুসা (আ.) বিনা দ্বিধায় তাদের সাহায্য করলেন। তিনি নিজেই কূপ থেকে পানি তুলে তাদের পশুগুলোকে পান করিয়ে দিলেন। দুই বোন কৃতজ্ঞচিত্তে বাড়ি ফিরে গেলেন।

লজ্জাশীলতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত
ঘটনাটি শুনে তাদের পিতা বিস্মিত হলেন। কারণ, সাধারণত তারা অনেক দেরিতে বাড়ি ফিরতেন। তিনি জানতে পারলেন, এক অপরিচিত যুবক তাদের সাহায্য করেছেন। তখন তিনি সেই যুবককে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য তাঁর এক কন্যাকে পাঠালেন। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা : ১০১০)

যুবতী যখন মুসা (আ.)-কে বাড়ির পথ দেখাতে এলেন, তখন মুসা (আ.) তাকে সামনে না হেঁটে পেছনে চলতে বললেন। তিনি নিজে সামনে হাঁটতেন, আর মেয়েটি পেছন থেকে পথ নির্দেশনা দিত। নারীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টিপাত এড়ানোর জন্যই তিনি এমনটি করেছিলেন। পরে সেই কন্যা তার পিতার কাছে মুসা (আ.)-এর এই চারিত্রিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ১০১০)

বিশ্বস্ত যুবকের জন্য বিবাহের প্রস্তাব
মুসা (আ.) বাড়িতে পৌঁছে আতিথেয়তা গ্রহণ করলেন এবং নিজের পরিচয় ও পরিস্থিতি বর্ণনা করলেন। তখন শোয়াইব (আ.) তাকে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি জালিমদের হাত থেকে নিরাপদ স্থানে এসে পৌঁছেছেন। এদিকে দুই কন্যার একজন পিতাকে বললেন, ‘হে পিতা! আপনি তাকে মজুর হিসেবে নিযুক্ত করুন। কারণ আপনি যাদের মজুর হিসেবে নিযুক্ত করবেন, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ এরপর শোয়াইব (আ.) এমন এক প্রস্তাব দিলেন, যা মুসা (আ.) কল্পনাও করেননি। তিনি বললেন, ‘আমি আমার এ দুই কন্যার একজনকে তোমার কাছে বিয়ে দিতে চাই। শর্ত হলো, তুমি আমার কাছে আট বছর কাজ করবে। আর যদি দশ বছর পূর্ণ করো, তবে তা তোমার ইচ্ছা।’ মুসা (আ.) প্রস্তাবটি গ্রহণ করে বললেন, ‘আমার ও আপনার মধ্যে এ কথাই চূড়ান্ত রইল।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৬-২৮)

আল্লাহর রহমতে নতুন জীবন
এভাবেই এক পলাতক, নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন যুবকের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। আল্লাহ তাআলা তার জন্য নিরাপদ আশ্রয়, সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং একটি উত্তম পরিবার দান করেন। মুসা (আ.) শর্ত অনুযায়ী শোয়াইব (আ.)-এর অধীনে কাজ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর কনিষ্ঠ কন্যাকে বিয়ে করেন। বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে, বিদায়কালে শ্বশুরের পক্ষ থেকে তিনি একটি লাঠি উপহার পান। পরবর্তীতে সেই লাঠিই আল্লাহর কুদরতে তাঁর নবুয়তের অন্যতম মুজিজার বাহন হয়ে ওঠে।

মুসা (আ.)-এর এই বিবাহের ঘটনা আমাদের শেখায় যে বিপদের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা হারানো যাবে না। সততা, চরিত্র, লজ্জাশীলতা ও বিশ্বস্ততা এমন গুণ, যা মানুষের জন্য সম্মান ও কল্যাণের দ্বার খুলে দেয়। কূপের ধারে একটি ছোট্ট সাহায্যই মুসা (আ.)-এর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাই একজন মুমিন কখনো কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করে না। কারণ আল্লাহ কখন, কীভাবে এবং কোন কাজের মাধ্যমে তাঁর বান্দার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেবেন—তা একমাত্র তিনিই জানেন।

গণিতশাস্ত্রে অবদান রাখা ১০ মুসলিম মনীষী | কালের কণ্ঠ