• ই-পেপার

ইসলাম-পূর্ব আরবের বিখ্যাত বাজার

ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের অবিস্মরণীয় কিছু শিক্ষা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের অবিস্মরণীয় কিছু শিক্ষা
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনে পরিবারই হলো ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয়। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন, নৈতিক বিকাশ এবং মানসিক প্রশান্তির মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কখনো কখনো পারিবারিক সংকট, ঈর্ষা, বিচ্ছেদ, দারিদ্র্য কিংবা ভৌগোলিক স্থানান্তরের কারণে এই বন্ধন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফ শুধু একজন নবীর জীবনের ইতিহাস নয়; এটি একটি পরিবারের উত্থান-পতন, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের জীবন্ত দলিল। 

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী শুরু হয় পরিবারের উষ্ণ পরিবেশে। একবার তিনি একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। তারপর তিনি নিজের স্বপ্ন অন্য কারও কাছে নয়, বরং প্রিয় পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছেই ব্যক্ত করেন। ‘যখন ইউসুফ তাঁর পিতাকে বললেন, 'হে আমার পিতা!......।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪)

ইউছুফ (আ.) একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখা মাত্র পরিবারের স্বরণাপন্ন হন। কেননা সন্তানের প্রথম ভরসার স্থান হলো পরিবার। সে তার আনন্দ, দুঃখ, স্বপ্ন ও আশঙ্কা সবচেয়ে আগে পরিবারের কাছেই প্রকাশ করতে চায়। ইয়াকুব (আ.) শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই দেননি; একজন আদর্শ পিতার মতো সন্তানের নিরাপত্তার কথাও ভেবেছেন। তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘হে আমার সন্তান! তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বলো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)
তাই যেকোনো বিষয়ে সন্তানের আবেগ, প্রতিভা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা অপরিসীম।

ঈর্ষা—পরিবার ভাঙনের সূচনা
যে পরিবার ভালোবাসার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেই পরিবারেই যখন ঈর্ষা ও হিংসা স্থান করে নেয়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইউসুফ (আ.)-এর ভায়েরা তাঁর এই সুন্দর স্বপ্নের কথা শোনে তাদের অন্তরে জন্ম নেওয়া ঈর্ষা তাদের এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা পুরো পরিবারের জন্য দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোরআনের ভাষায় ‘ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো দূর দেশে ফেলে আসো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯)

এটি শুধু ভাইদের ষড়যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল পারিবারিক ঐক্যের ভয়াবহ ভাঙন। এখান থেকেই শুরু হয় ইউসুফ (আ.)-এর দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পথ। আজও অসংখ্য পরিবার হিংসা, অহংকার, সম্পদের লোভ কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে ভেঙে যাচ্ছে। সুরা ইউসুফ আমাদের শেখায়—পারিবারিক সংকটের সূচনা বাইরে থেকে নয়, অনেক সময় পরিবারের ভেতর থেকেই হয়।

সংকটের মাঝেও আল্লাহ নতুন পথ খুলে দেন
ভাইদের ষড়যন্ত্রে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর ইউসুফ (আ.) মিশরে বিক্রি হন। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কিন্তু আল্লাহ সেই সংকটকেই তাঁর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার বানিয়ে দেন। নির্দেশ দেয়া হলো, ‘তাঁর থাকার ব্যবস্থা সম্মানজনকভাবে করো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২১)

ধৈর্য—সংকট মোকাবিলার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য। তিনি বললেন, ‘অতএব, উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

বহু বছর ধরে সন্তানহারা থাকার পরও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)
এই শিক্ষা আজও প্রতিটি ভেঙে পড়া পরিবারের জন্য আশার আলো। যত বড় সংকটই আসুক, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ধৈর্য পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক স্থানান্তর
দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের খাদ্যের সন্ধানে বারবার মিশরে যেতে হয়েছিল। এখানে আমরা দেখি, মানুষের অভিবাসনের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ নয়, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জীবিকার সন্ধানে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। সুরা ইউসুফ সেই বাস্তবতার এক প্রাচীন কিন্তু চিরন্তন উদাহরণ।

দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত করেন। কোরআনের ভাষায়, ‘যখন তারা ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন। (তারপর) তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে সম্মানের আসনে বসালেন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৯-১০০)
ইউসুফ (আ.) প্রতিশোধ নেননি; বরং ক্ষমা করেছেন। আর তাঁর সেই ক্ষমা, উদারতা ও ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া পরিবারকে আবার একত্রিত করেছিল।

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। এখানে রয়েছে সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা, ভাইদের ঈর্ষার পরিণতি, বিচ্ছেদের বেদনা, ধৈর্যের সৌন্দর্য, আল্লাহর অদৃশ্য পরিকল্পনা এবং ক্ষমার মাধ্যমে পুনর্মিলনের মহান শিক্ষা। এই কাহিনী আমাদের জানিয়ে দেয়—পরিবার কখনো নিখুঁত হয় না; কিন্তু ঈমান, ধৈর্য, ক্ষমা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা থাকলে সবচেয়ে ভেঙে পড়া পরিবারও আবার নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। তাই সুখী, স্থিতিশীল ও কল্যাণময় পরিবার গঠনের জন্য সুরা ইউসুফ এক চিরন্তন কোরআনিক দিকনির্দেশনা, যা যুগে যুগে মানবজাতিকে আলো দেখিয়ে যাবে।

টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান সময়ে তরুণদের কাছে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস বেশ জনপ্রিয়। ক্লান্তি দূর করা, কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সতেজ অনুভব করার উদ্দেশ্যে অনেকেই এসব পানীয় পান করে থাকেন। তবে সচেতন মুসলমানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—এসব এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ?

ইসলাম মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা যা হালাল করেছেন, তা বিনা প্রমাণে হারাম বলা যেমন বৈধ নয়; তেমনি যা হারাম করেছেন, তা হালাল বলাও গুরুতর অপরাধ। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহের মূলনীতির আলোকে।

ইসলামে খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে মূলনীতি হলো—সব কিছুই বৈধ, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন, সুন্নাহ বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে তা হারাম প্রমাণিত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)

আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, আমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তাতে আমি কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাদ্যকে হারাম পাই না; তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত কিংবা শূকরের গোশত হলে তা হারাম।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪৫)

এনার্জি ড্রিংকসের বিধান কী?
টাইগার, স্পিড, রেডবুল বা এ ধরনের অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণত ক্যাফেইন, চিনি, ভিটামিন ও অন্যান্য বৈধ উপাদান ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে এসব পানীয়তে হারাম কোনো উপাদান (যেমন—মাদক, নেশাজাতীয় অ্যালকোহল বা হারাম প্রাণীর উপাদান) ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে এসব পান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। শুধু গুজব, সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো খাদ্য বা পানীয়কে হারাম বলা বৈধ নয়।

অ্যালকোহল লেখা না থাকলে কী হবে?
বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসের গায়ে অ্যালকোহল উপাদান উল্লেখ থাকে না। যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত না হয় যে, এতে নেশাজাতীয় হারাম অ্যালকোহল রয়েছে, তাহলে শুধু সন্দেহের কারণে একে হারাম বলা যাবে না। ইসলামী ফিকহে একটি প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘যেকোনো বস্তুর মূল বিধান হলো বৈধতা।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৯)

অর্থাৎ কোনো বস্তু হারাম হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। দলিল না থাকলে সেটিকে হালাল হিসেবেই গণ্য করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, সেগুলো নষ্ট কোরো না; কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তা অতিক্রম কোরো না। আর কিছু বিষয় সম্পর্কে নীরব থেকেছেন—এটি তোমাদের প্রতি রহমতস্বরূপ, ভুলে যাওয়ার কারণে নয়। তাই সেসব বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ৪৩৯৬)

কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
১. যদি কোনো এনার্জি ড্রিংকসে নিশ্চিতভাবে হারাম উপাদান মিশ্রিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা পান করা বৈধ হবে না।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তা পরিহার করা জরুরি।
৩. যেসব পানীয় শরীরের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর বা চিকিৎসকের নিষেধ রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকাই ইসলামের শিক্ষা।

সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ প্রচলিত এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে যদি নিশ্চিতভাবে কোনো হারাম উপাদান বা নেশাজাতীয় বস্তু থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেগুলো পান করা জায়েজ। ইসলামের মূলনীতি হলো—কোনো বস্তুকে দলিল ছাড়া হারাম বলা যাবে না। একই সঙ্গে একজন মুসলিমের উচিত হালাল-হারামের ব্যাপারে সচেতন থাকা, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং সব ক্ষেত্রে পরিমিতি অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক গ্রহণ এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র সিলেটের দরগাহ। এখানেই শায়িত আছেন উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অন্যতম অগ্রদূত শাহজালাল ইয়ামেনি (রহ.)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দরগাহ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; বরং এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে পরিচিত।

আরব থেকে সিলেটে
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মহান আল্লাহর নির্দেশনা স্বপ্নে লাভ করার পর শাহজালাল (রহ.) সুদূর ইয়েমেন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আগমন করেন। সে সময় সিলেটে হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন চলছিল। নানা প্রতিরোধ, অগ্নিবাণ ও কৌশল ব্যর্থ করে শাহজালাল (রহ.) এবং তাঁর সাহসী সঙ্গীরা সিলেট বিজয় করেন।

এই বিজয়ের পর শ্রীহট্ট নতুন পরিচয়ে ‘জালালাবাদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে এবং এ অঞ্চলজুড়ে ইসলামের শিক্ষা, দাওয়াত ও নৈতিক আদর্শের প্রসার শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০ জনে উন্নীত হয়। তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন মুসলমানদের দ্বীনি প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ লাভে ছুটে আসতেন। এমনকি বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের ভ্রমণবৃত্তান্তে তাঁর প্রশংসা লিপিবদ্ধ করেন।

সিলেটকে খাজনামুক্ত ঘোষণা
সিলেট বিজয়ের পর দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ শাহজালাল (রহ.)-কে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ক্ষমতা ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতি অনাসক্ত এই মহান সাধক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সুলতান বিশেষ ফরমান জারি করে সিলেট শহরকে খাজনামুক্ত ঘোষণা করেন এবং শাহজালাল (রহ.)-এর সম্মানে এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই বিশেষ মর্যাদার প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।
সুলতানি যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভ পর্যন্ত এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল। দিল্লি থেকে যেসব শাসনকর্তা সিলেটে আসতেন, তাঁরা প্রথমে শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে উপস্থিত হয়ে জিয়ারত করতেন। এরপর দরগাহর খাদিমদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পাগড়ি গ্রহণ করার পরই জনগণ তাঁদের শাসক হিসেবে গ্রহণ করত। ঐতিহাসিক শামসুল আলম সি.এস.পি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই প্রথা সিলেটবাসীর হৃদয়ে শাহজালাল (রহ.)-এর গভীর সম্মান ও প্রভাবেরই প্রতিফলন।

যেভাবে নির্মিত হয়েছে শাহজালালের (রহ.) মাজার
বর্তমান দরগাহ টিলা বহু শতাব্দীর নির্মাণ ও সংস্কারের ফল। প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে চার কোণে চারটি উঁচু স্তম্ভবিশিষ্ট সমাধিটি নির্মিত হয়েছে। সমাধির পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি ছোট মসজিদ, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর উইলস পুনর্নির্মাণ করেন। সমাধির পূর্ব পাশে ইয়েমেনের যুবরাজ শেখ আলী এবং পশ্চিম পাশে গৌড়ের উজির মকবুল খানের কবর রয়েছে।

সুলতান ও মোগলদের নির্মাণে সমৃদ্ধ দরগাহ চত্বর
বর্তমান দরগাহ চত্বরের অধিকাংশ স্থাপনা বিভিন্ন সময়ে বাংলার সুলতান, মোগল সম্রাট এবং তৎকালীন শাসকদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ প্রবেশপথে রয়েছে চিল্লাখানা এবং শাহজালাল (রহ.)-এর কয়েকজন সঙ্গীর সমাধি। পাশেই শায়িত আছেন দরগাহর সাবেক মুতাওয়াল্লিরা। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খান নির্মাণ করেন বিশাল গম্বুজ ভবন, যা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে ‘ঘড়িঘর’ নামে পরিচিত আরেকটি স্থাপনা।

ছয় শতাব্দীর পুরোনো দরগাহ মসজিদ
দরগাহ চত্বরে অবস্থিত বৃহৎ মসজিদটি বাংলার সুলতান আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহের আমলে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রী মজলিশে আতার নির্মাণ করেন। পরে ১৭৪৪ সালে বাহারাম খান ফৌজদারের সময় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি সিলেট শহরের অন্যতম প্রধান জুমার মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

দরগাহ পুকুরের রহস্যময় গজার মাছ
দরগাহ টিলার নিচে অবস্থিত বড় পুকুরে আজও গজার মাছ অবাধে বিচরণ করে। দর্শনার্থীরা খাবার নিয়ে ডাক দিলে মাছগুলো তীরে ভিড় জমায়। লোককাহিনিতে প্রচলিত আছে, এই মাছগুলো শাহজালাল (রহ.)-এর সময় থেকেই সংরক্ষিত। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এটি সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

বিশাল ডেগচি ও লঙ্গরখানার ইতিহাস
দরগাহ প্রাঙ্গণে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে তামার তৈরি দুটি বিশাল ডেগচি। ইতিহাস অনুযায়ী, একেকটিতে একসঙ্গে সাতটি গরু ও সাত মন চাল রান্না করা সম্ভব। ডেগচির গায়ে উৎকীর্ণ ফারসি লিপি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগরের (বর্তমান ঢাকা) শেখ আবু সায়িদ ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে এগুলো তৈরি করে মুরাদ বখশের মাধ্যমে দরগাহে পাঠিয়েছিলেন। একসময় এখানকার লঙ্গরখানায় ভ্রমণকারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক নিদর্শন
দরগাহে সংরক্ষিত রয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে প্রচলিত কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর তরবারি, কাঠের খড়ম, হরিণের চামড়ার তৈরি জায়নামাজ, তামার প্লেট ও বাটি। তামার একটি বাটিতে আরবি ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। অনেক মানুষ এটিকে বরকতের নিদর্শন হিসেবে মনে করেন। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রোগমুক্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে—এমন বিশ্বাস শরিয়তসম্মত নয়।

শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ বাংলায় ইসলামের ইতিহাস, সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শত শত বছরের ইতিহাস বহনকারী এই দরগাহ আজও দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। তবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ইসলামের আকীদা অনুযায়ী আল্লাহর একত্ববাদকে অটুট রাখা এবং যেকোনো প্রকার অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন বিশ্বাস থেকে বিরত থাকাও একজন মুসলিমের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলোর একটি হলো—‘ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল?’ অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আল্লাহ সবকিছু পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাই মানুষের চেষ্টা, দোয়া কিংবা সৎকর্মের কোনো প্রভাব নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলে। ইসলাম এ দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না।

ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদির তথা ভাগ্য হলো-আল্লাহ তাআলার সর্বজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের অংশ। তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছু লিখে রেখেছেন; তবে একই সঙ্গে মানুষকে ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং দোয়ার সুযোগও দিয়েছেন। তাই একজন মুমিন বিশ্বাস করে—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না, আবার আল্লাহর নির্দেশিত উপায় অবলম্বন করলে তিনি বান্দার অবস্থা ও নির্ধারিত অনেক বিষয় পরিবর্তনও করেন।

তাকদির বা ভাগ্য কী?
তাকদির অর্থ হলো—মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের সবকিছুর পরিমাণ, সময়, অবস্থা ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৩)

ভাগ্য কি পরিবর্তন হয়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, আল্লাহ যেসব বিষয় পরিবর্তনের সঙ্গে শর্তযুক্ত রেখেছেন, সেগুলো দোয়া, সৎকর্ম, তওবা ও আমলের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ও সর্বজ্ঞ সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।

১. চেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের অবস্থা পরিবর্তন করেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও কর্মের পরিবর্তনের সঙ্গে আল্লাহ তাদের অবস্থাও পরিবর্তন করেন।

২. দোয়া ভাগ্যের পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছুই তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ এমনভাবেই তাকদির নির্ধারণ করেছেন যে বান্দা দোয়া করলে বিপদ দূর হবে, আর দোয়া না করলে তা নেমে আসবে।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু বরকতময় হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)

তাকদিরের দুই স্তর
আলেমগণ তাকদিরকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন—
১. চূড়ান্ত তাকদির (যা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে সংরক্ষিত)। এটি লাওহে মাহফুজে লিখিত, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না।

২. শর্তযুক্ত তাকদীর
এটি ফেরেশতাদের নিকট লিখিত বিষয়, যা আল্লাহর নির্দেশে দোয়া, তওবা, সদকা, নেক আমল ইত্যাদির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুজ)।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩৯)

অতএব, মানুষের ভাগ্য নিয়ে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন এবং তাঁর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য এমন অনেক বিষয় শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করেছেন, যা দোয়া, তওবা, সৎকর্ম, তাকওয়া ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে’—এই অজুহাতে অলস বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়া করবে, নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে এবং সবশেষে ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবে।

আসুন, আমরা তাকদিরের ওপর দৃঢ় ঈমান রাখি, দোয়া ও সৎকর্মকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানাই এবং বিশ্বাস করি—যিনি তাকদিরের মালিক, তিনিই চাইলে আমাদের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয়, সংকট থেকে স্বস্তিতে এবং হতাশা থেকে সফলতায় পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

ইসলাম-পূর্ব আরবের বিখ্যাত বাজার | কালের কণ্ঠ