পরিবার মানবসমাজের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। একটি সুখী, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গঠনের ভিত্তি হলো একটি সুসংগঠিত পরিবার। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ, অবিশ্বাস, দায়িত্বহীনতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে পড়ছে। ইসলাম পরিবারকে শুধু রক্তের বন্ধন হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিশ্চিত করতে ইসলাম স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছে। এসব নির্দেশনা মেনে চললে পরিবারে সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরিবার পরিণত হয় জান্নাতের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবিতে। সেগুলো হলো-
১. পরিবারিক বন্ধন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহা নেয়ামত : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)
এই আয়াতে পরিবারকে তিনটি মূল ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হয়েছে : ১. মানসিক শান্তি, ২. ভালোবাসা, ৩. দয়া ও করুণা। তাই পরিবার শুধু সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা নেয়ামত।
২. দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের অবিচ্ছেদ্ধ অংশ : আল্লাহ বলেন : ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সুরক্ষা, মান-সম্মান ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতীক বানিয়েছেন। তাই তারা একে অপরের দুর্বলতা ও ভুল-ত্রুটির আবরণ স্বরুপ।
৩. ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক পরিবার গঠন : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
এই আয়াত পরিবার ব্যবস্থাপনার অন্যতম মৌলিক ভিত্তির কথা তুলে ধরে, যেমন- সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, উত্তম আচরণ ইত্যাদি। অন্যদিকে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ৩৮৯৫)। অর্থাৎ সমাজে ভালো হওয়ার প্রথম শর্ত হলো পরিবারে ভালো হওয়া।
৪. সন্তান প্রতিপালনে আমানতদারিতা রক্ষা করা : সন্তান শুধু পরিবার নয়, বরং সমাজ ও উম্মাহর ভবিষ্যৎ। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো। (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
৫. পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার উপায় : ইসলাম পরিবারে তিনটি মৌলিক বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে, ১. পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি, কোমলতা। ২. পরস্পরের অধিকার রক্ষা, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের অধিকার আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। ৩. ধৈর্য ও ক্ষমা, পারিবারিক জীবনে ভুল বোঝাবুঝি স্বাভাবিক, তবে ক্ষমা ও ধৈর্য সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১০)
৬. পরিবারে বৃদ্ধ মাতা-পিতার আনুগত্য : ইসলামে পিতামাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তুমি তাঁকে (আল্লাহ) ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)।
৭. পারিবারিক ভাঙন ও তার প্রতিকার : আধুনিক সমাজে পরিবার ভাঙনের কারণ অজস্র, যেমন- পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার, ধৈর্যের অভাব ও ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। তাই ইসলাম এসব সমস্যার সমাধান দিয়েছে, তা হলো- তাকওয়া ভিত্তিক জীবন-যাপন, পরস্পরের অধিকার জানা, নৈতিক শিক্ষা এবং দোয়া করা। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য পথ বের করে দেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২)
৮. পরিবারের সদস্যদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা : পরিবারের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের জন্য চোখের শীতলতা হবে।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৪)
সুতরাং পারিবারিক স্থিতিশীলতা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়; বরং এটি পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, ত্যাগ, সহমর্মিতা এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার ফল। ইসলামের নির্দেশিত নীতিমালা পরিবারকে শুধু ভাঙনের হাত থেকেই রক্ষা করে না, বরং সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। আজকের অস্থির সময়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের কল্যাণের জন্য ইসলামের এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। যখন পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করবে এবং ইসলামী মূল্যবোধকে জীবনের অংশ বানাবে, তখন পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, সমাজ হবে সুস্থ ও সুন্দর, আর আল্লাহ তাআলার রহমত ও বরকত নেমে আসবে সবার জীবনে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাকওয়ানির্ভর আদর্শ পরিবার গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।




